রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯, ২৫ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

শুরু হলো মধুমাস

আজ পহেলা জ্যৈষ্ঠ

রেজাউল করিম রাজু : | প্রকাশের সময় : ১৫ মে, ২০২২, ১২:০০ এএম

আজ পহেলা জ্যৈষ্ঠ। তীব্র তাপাদহ সয়ে গাছে গাছে থোকায় থোকায় কাঁচা পাকা আম, লিচু, জামরুল, কাঠাল, সৌরভ ছড়ানো বাঙ্গি আর কৃষ্ণচুড়া সোনালু, গগণচুড়ার বর্ণিল আবির ছড়িয়ে যাত্রা শুরু হলো গ্রীষ্ম দুহিতা মধুমাস জ্যৈষ্ঠের। শুধু চোখ ধাঁধানো ফুল নয়। চারিদিকে থরে বিথরে সাজানো নানা ফলের সমারোহ। বিশেষ করে ফলের রাজা আম। অন্য কোনো মাসে এক সাথে এত ফলের আধিক্য নজরে পড়ে না। আর সেজন্য জ্যৈষ্ঠেকে মধুমাস হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। চৈত্র বৈশাখের খরতাপের মাঝে চলে আসে অনেক ফল ফলারী। আর জ্যৈষ্ঠে আম লিচুর আগমন দিয়ে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। গ্রীষ্ম মওসুমে খরাক্লিষ্ট মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য আল্লাহর নেয়ামতের ঝুড়ি থেকে চলে নানা রকমের রসালো শাঁসালো ফল ফলারি। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু হয় আম লিচুকে ঘিরে নানা রকম উৎসব। এখন তো আম লিচুর আবাদ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। বিদেশেও যাচ্ছে। ফলে আগামী দু’তিন মাস আম্র উৎসবে মেতে উঠবে সবাই। এবারে মধুমাস এসেছে খানিকটা ভিন্ন রূপ নিয়ে। বিগত তিনটা বছর মহামারি করোনার প্রভাব পড়েছিল আম উৎসবে। করোনা আর লকডাউন, শাটডাউনের কবলে মানুষ খুব একটা বেরুতে পারেনি। জমেনি হাটতলা বটতলার আম বাজার। অনেকে ভয়ে আম খাননি। আম চাষিদের গেছে দুর্দিন। পরিবহন বন্ধ থাকায় রেল কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এসেছিল। তারা আমের রাজা চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত ‘ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন’ চালু করে। যাতে আম চাষিরা তাদের আম বাজারজাত করতে পারে। যদিও সব আমচাষি এর সুফল নিতে পারেনি। আম বাণিজ্যিকভাবে আবাদ হওয়ায় বাগানের বিস্তৃতি বেড়েছে অনেক। রাজশাহী চাঁপাইনবাগঞ্জ নয়, আমের ব্যাপক আবাদ হচ্ছে ধান উৎপন্ন এলাকা নওগাঁয়। এখানকার আবাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ছাড়িয়ে যাবার পথে। করোনার কারণে আমের জন্য মেয়ে জামাইকে নাইওরে নিয়ে আসা। বাইরে থাকা আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে আম পাঠানো সব কিছুতে ছন্দপতন ঘটিয়েছিল। এবার সে করোনার ভয় কেটেছে। আশা করা যাচ্ছে ফের জেগে উঠবে আম্রকানন আর আম বেচাকেনার হাট।

চলতি মওসুমে গাছে গাছে মুকুল এলেও বৈশাখের শেষ দিকে তীব্র ও মাঝারি তাপাদহ বয়ে যায় এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে। চারমাস ছিল বৃষ্টিহীন। ফলে খরতাপ থেকে আম লিচু বাঁচাতে প্রচুর সেচ দিতে হয়েছে। আর তাতে উৎপাদন খরচ আরো বেড়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, খরতাপের দাপটে চল্লিশ শতাংশ আম, লিচু ঝরে পড়েছে। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় আম লিচু। আম চাষিরা তাকিয়ে আছে আবহাওয়ার মতিগতির দিকে। কদিন আগে ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’ শঙ্কা জাগালেও তা কেটে যাওয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। এখন আর কটাদিন ঝড় বৃষ্টি না হলেই ভালো। মধু মাস শুরু হলেও রসালো শাসালো ও বনেদী জাতের আমের স্বাদ নিতে হলে আরো কটাদিন সবুর করতে হবে আম রসিকদের। ভোক্তাদের পরিপক্ত ও বিষমুক্ত আম উপহার দেবার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আম পাড়ার সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এখন যাত্রা শুরু হয়েছে গুটি আম দিয়ে। আর বনেদী জাতের মধ্যে এসেছে গুটি গোপাল দিয়ে।

এবার জ্যৈষ্ঠের প্রথমদিন থেকে শুরু হচ্ছে আম পাড়া। শুরুতেই নানা জাতের গুটি আম দিয়ে যাত্রা শুরু করছে। এরপর পর্যায়ক্রমে আসতে থাকবে বনেদী জাতের গোপালভোগ, রানীপছন্দ, ক্ষিরসাপাতি, ল্যাংড়া, আম্রপালিসহ নানা নামের আম। বউ সোহাগী, বউভোলানা, নবাবপছন্দ, বেগম পছন্দ, হাড়িভাঙ্গা কত নামের আম তার ঠিক নেই।

এবার খরতাপের মাত্রা একটু বেশি বলে আগেভাগে কিছু কিছু গাছে আমের রং হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। গরমে আম পেকে গেছে বলে তা নামানোর প্রস্তুতি চলছে। টক মিষ্ট স্বাদের গুটি আম সাধারণত নিম্নআয়ের মানুষের তৃষ্ণা মেটায়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে বেশকটি জুস, জ্যাম, জেলি কোম্পানি তাদের শাখা কারখানা চালু করেছে। ফলে এসব কোম্পানির লোকজন কমদামে সব কিনে নিচ্ছে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষ আমের স্বাদ খুব একটা নিতে পারছে না। মধুমাস শুরু হওয়ায় এ অঞ্চলের আম অর্থনীতির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আম আবাদ হচ্ছে বাণিজ্যিকভিত্তিতে। বাড়ছে বাগান। আড়তগুলো ঝেড়ে মুছে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ক্যারেট, খাঁচি, টুকরি তৈরি হচ্ছে। আম পাড়া, পরিবহন, প্যাকিংসহ সংশ্লিষ্ট কাজের প্রস্তুতি চলছে। মাস চারেকের জন্য এখানকার আম অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। লাখো মানুষ প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে ব্যাস্ত থাকবে মধুমাস নিয়ে। এবার আশা করা হচ্ছে ১০ লাখ টনের বেশি আম উৎপন্ন হবে।

বাণিজ্য হবে পাঁচ হাজার কোটি টাকার। আম পরিবহনের জন্য বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস প্রস্তুতি নিয়েছে। আম নিয়ে অনেক মজার মজার গল্প কবিতা রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসিম উদ্দিন, জীবনানন্দ দাস, মাইকেল মধুসুদন দত্ত তাদের কবিতায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন। আম আমাদের শিল্প সাহিত্যে এক বিশাল স্থান দখল করে আছে। কবিরা আম নিয়ে যত গল্প, কবিতা, কৌতুক লিখেছেন এমনটি আর অন্য ফলের ভাগ্যে জোটেনি। আমাদের জাতীয় সংগীতে ঠাঁই পেয়েছে আম। ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে...। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম জ্যৈষ্ঠের এগারো তারিখে। জাতীয় কবির জন্মমাস হিসাবেও জ্যৈষ্ঠ পেয়েছে অন্যরকম মর্যাদা। আম সত্যি সত্যিই ফলের রাজা। আম শুধু গল্প কবিতায় নয়। বিশ্বজুড়েই আমের জনপ্রিয়তা বৈচিত্রপূর্ণ ব্যবহার স্বাদ গন্ধ ও পুষ্টিমানের বিবেচনায় এটি আদর্শ ফল। আম নিয়ে লিখতে গেলে কলেবর অনেক বেড়ে যাবে। কথা না বাড়িয়ে শুধু এটা বলা যায় মধুমাস উপভোগ করতে চলে আসা যায় আমের রাজধানীতে। রাজা নেই, শাহী নেই, রাজশাহী নাম। হাতি ঘোড়া কিছু নেই, আছে শুধু আম। এর যথার্থতা মিলবে এখানে এলেই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps