বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

জাতীয় সংবাদ

সহসাই কাটছে না ডলার সঙ্কট

একদিকে পাচার অন্যদিকে মজুত এলসি খুলতে ব্যাংকে ডলার সঙ্কট চাপে পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা প্রভাব পড়েছে পোশাক খাতেও ৪ মাসেই ৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

মো. জাহিদুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ৭ নভেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

বাজারের অস্থিরতা কমাতে রিজার্ভ থেকে মার্কিন ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবুও ডলার সঙ্কট কমছে না। পাশাপাশি রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কমায় দিন দিন রিজার্ভে চাপ বাড়ছে। বর্তমানে জ্বালানি তেল, সারসহ অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কেবল ডলার দেয়া হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার পাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলার সঙ্কটের আরও কারণ হলো অতিধনী লোকেরা ডলার পাচার করছে, অনেকে আবার দাম বাড়ার আশায় মজুত করছে।
এদিকে ডলারের উচ্চ দাম ও সঙ্কটের কারণে চাপে পড়েছে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা। ডলারের খরচ বাড়ায় অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসার পরিধি কমিয়ে ফেলছেন। আবার চাইলে অনেকে চাহিদামতো আমদানি ঋণপত্রও খুলতে পারছেন না। ঋণপত্র খুলতে না পেরে সঙ্কটে পড়েছেন তারা।

জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথম চার মাস (জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর) রিজার্ভ থেকে ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের বেশি বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে দিন দিন রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ছে। গত সপ্তাহের বুধবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ গত বছর একই সময়ে রিজার্ভ ছিল ৪৬ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে গত বছরের আগস্ট মাসে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল।

এদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা রিজার্ভের বড় দুই উৎস রফতানি ও প্রবাসী আয় টানা দুই মাস ধরে কমছে। এতে ডলার সঙ্কট আরও প্রকট হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সবশেষ হিসেব অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে, তা গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ কম। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) অথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে রফতানি আয় গত বছর একই মাসের তুলনায় কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরেও কমেছে রফতানি আয়। এর আগে টানা ১৩ মাস রফতানি আয় বেড়েছিল।

ডলার সঙ্কটে ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না। শুধু যাদের রফতানি আয় আছে ও বড় ব্যবসায়ী, ব্যাংক শুধু তাদের ঋণপত্রই খুলছে বলে অভিযোগ। আমদানি দায় কমানোর জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি ঋণপত্রের দেনা মেটাতে নিয়মিতভাবে ডলার বিক্রিও করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি ২০২২ সালের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে দেশের শীর্ষ রফতানির খাত পোশাক শিল্পেও পড়েছে ডলার সঙ্কটের প্রভাব। একাধিক পোশাক রফতানিকারক বলেন, ডলারসঙ্কটে আমদানির উদ্দেশ্যে কোনো ঋণপত্র খোলা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিলেও এলসি খুলছে না। ভালো ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করতে গেলে অনেক ধরনের সার্টিফিকেট দরকার পড়ে। সার্টিফিকেট নবায়ন করতে গেলেও ডলারে পেমেন্ট করতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের এক্সেসরিজ বাইরে থেকে আনতে হয়, কিন্তু ডলারসঙ্কটে ব্যাংক আমাদের নিরুৎসাহিত করছে। আগে দুই লাখ ডলার চাইলে পাওয়া যেত। এখন এ পরিমাণ চাইলে ব্যাংক ৬০ থেকে ৭০ হাজারের বেশি ডলার দিচ্ছে না। ব্যাংকগুলো চাহিদার ৫০ শতাংশ ডলারও দিতে পারছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রফতানিকারকদের বেশির ভাগকেই আমদানিও করতে হয়। এতদিন অনেকেই সেই রফতানি আয় দিয়েই আমদানি ব্যয় মেটাতেন, কিন্তু এখন রফতানিতেও কালো মেঘের ঘনঘটা। ফলে রফতানি আয় দিয়ে আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
একাধিক ব্যাংকের ট্রেজারিপ্রধান জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার সহায়তা পাচ্ছে না বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ফলে এলসি খোলার জন্য প্রতিদিন আমদানিকারকরা এলেও অতি প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া তা হচ্ছে না।

নিট পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ীরা কাপড়ের এলসি খুলতে পারছেন না। রফতানি বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আনা জরুরি, কিন্তু এ জন্যও ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। বস্ত্রশিল্পের জন্য দেশের বাইরে থেকে তুলা আমদানি করতে হয়। তুলা আমদানি করা না গেলে সুতা তৈরি হবে না। সুতা তৈরি না হলে কাপড়শিল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হবে, কিন্তু তুলা আমদানিতেও এলসি খোলা যাচ্ছে না।

এদিকে আগামী সপ্তাহেই এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। তখন রিজার্ভ আরও কমে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে।
মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক রাখতে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ৭৬২ কোটি (৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে বাজার থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো তুলে নেয়া হয়। অথচ তার আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় দর ধরে রাখতে রেকর্ড প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ৯৭ টাকা দরে ডলার বিক্রি করছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতি ডলার বিক্রি হয় ৮৫ টাকা ৮০ পয়সায়। শুধু সরকারি এলসির দায় মেটাতে এখন ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্সে সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা এবং রফতানি বিল নগদায়নে ৯৯ টাকা ৫০ পয়সা দর দিচ্ছে।

এদিকে নানা পদক্ষেপের পরও আমদানির চেয়ে রফতানি অনেক কম হওয়ায় এই তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, বাজারে ডলার নেই বলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশি মুদ্রার মান ধরে রাখতে ডলার বিক্রি করছে। তবে রিজার্ভ কিন্তু দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাদের যতদিন সক্ষমতা থাকবে ততদিন বিক্রি করবে। আমাদের ডলারের প্রধান উৎস হচ্ছে রেমিট্যান্স আর রফতানি আয়। এগুলো কমছে। এছাড়া অতি ধনী লোকরা বিদেশে ডলার নিয়ে নিচ্ছে। এদেশ থেকেও পাচার হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেখা গেলো অনেকেই ঠিকাদারি করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। তারাই তো এদেশ থেকে টাকা পাচার করছে। আবার ধরেন অনেকে বিদেশ গিয়ে অর্থ নিয়ে নিচ্ছে। আর বাংলাদেশে তাদের পরিবারকে বাংলাদেশি টাকা দেওয়া হচ্ছে। এখানে বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে আসলো না।

অনেকে ডলার মজুত করছে মন্তব্য করে আবু আহমেদ বলেন, তারা মনে করছে ডলার মজুত করলেই দাম বাড়বে। আগেও কিন্তু আমাদের সবকিছুই আমদানি করতে হতো। কিন্তু এখন কেন সঙ্কট। এই লোক লোকগুলো কোথাও যাচ্ছে না। কিন্তু মজুত করে রাখছে। ডলার হলো গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি। বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য অনেকেই ডলার পাচার করছে। আবার অনেকে মজুত করছে। সব মিলিয়ে ডলার সঙ্কট হচ্ছে।

আমাদের আমদানি কমাতে হবে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এখন বিষয়টা হল আমাদের পাচার বন্ধ করা কঠিন। আমদানি কমাতে হবে। হুন্ডির সাথে কমপিটিশনে গিয়ে হলেও রেমিট্যান্স বৈধ উপায়ে আনতে হবে। আমাদের শিল্প-কারখানার কাচাঁমাল, ওষুধের কাচাঁমাল আনতে হবে। নইলে কর্মসংস্থানে সঙ্কট হবে। এখন আমাদের সবাইকে একটু মিতব্যায়ী হতে হবে।

আমাদের রফতানিটা আরও বাড়ানোর জন্য আরও উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, অতি ধনী লোকগুলোর টাকা পাচার আটকাতে হবে। রিজার্ভে চাপ পড়ছে। আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইনকামের বেশি খরচ বেশি হয়ে গেছে। এছাড়া সামনে আমাদের ঋণ পরিশোধের সময় আসছে। আমাদের হিসেব করে এগোতে হবে।
বিমানের বিজনেস ক্লাসের সিট খালি থাকে না এ বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে আবু আহমেদ বলেন, বৈধ-অবৈধ বিভিন্ন উপায়ে টাকা ইনকাম করে কিছু লোক বিদেশ যায়। ডলার নিয়ে যায়। তাদের কাছে এতো টাকা হয়েছে যে, বর্তমানে বিমানের বিজনেস ক্লাসে সিট পাওয়া যায় না। নরমাল সিট খালি থাকে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানিতে এখনও যে গতি রয়েছে, সেটা যদি অব্যাহত থাকে, রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স যেভাবে কমছে, সেভাবে কমলে রিজার্ভ আরও নিচে নেমে আসবে। এবারও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ঘাটতি নিয়ে অর্থবছর শেষ হবে। তাতে অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন