শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৩ মুহাররম ১৪৪৪

ইসলামী জীবন

এক দুনিয়া বিমুখ আধ্যাত্মিক রাহবার

আল্লামা শাহ ছোলতান আহমদ নানুপুরী রহ.

মাওলানা দৌলত আলী খান | প্রকাশের সময় : ২৫ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে নবী আগমনের প্রক্রিয়া সমাপ্তি ঘটেছে ঠিক কিন্তু সমাজের সংস্কার সাধনের জন্য, মানবজাতিকে ধন্য করার জন্য যুগে যুগে এ ধরায় আগমন ঘটে এমন কিছু মানুষের, যাদের পদস্পর্শে এ পৃথিবী ধন্য হয়। জান্নাত হতে বিতাড়িত ক্ষুদ্ধ ইবলিশ যখন আল্লাহকে বলেছিলেন “নিশ্চয়ই আমি আপনার অধিকাংশ বান্দাকে পথভ্রষ্ট করবো”। আল্লাহ প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন “আমার আবেদের (প্রকৃত আল্লাহভক্ত) উপর তোমার কোনো আধিপত্য চলবে না”। যারা প্রকৃত ধার্মিক তাদেরকে শয়তান কিছুতেই পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে ধন্য সেই ক্ষুদ্র দলের অন্যতম কালজয়ী মনীষী, দ্বীনের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র ও হেরার আলোর বাহক আল্লামা শাহ্ ছোলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)। নবীজীর সুন্নাত দৃঢ়ভাবে পালনের মধ্য দিয়ে ছোলতান আহমদ (রহ.) নিছক একটি নাম নয়, সময়ের প্রেক্ষাপটে ফটিকছড়ির কিংবদন্তী, তিনি আলোর কণা যা দ্বারা জ্বলেছে অগনিত প্রদীপ, যার ইবাদতের মহিমায় শুধু ফটিকছড়ি নয় টলেছে বিশ্বজগৎ। ফটিকছড়িকে তিনি তার অনুকরণীয় কর্মকান্ড দিয়ে করেছেন ধন্য, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীনি শিক্ষাকে করেছেন গতিশীল, আধ্যাতিœক জগতকে করেছেন আরও মহিমাময় ও সমৃদ্ধতর। কত পথহারা পথিক এই পরশপাথরের স্পর্শে পথের দিশা পেয়েছে, কত অন্তরের কলুষতা হয়েছে দূরীভূত তার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। কারণ ছোলতান আহমদ (রহ.) জনসমক্ষে থেকেও ছিলেন আতœগোপনকারী আল্লাহভক্ত। 

জন্ম ও পরিচিতি: চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন ধর্মপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৩৩২ হিজরীর শাবান মাসের ২য় সপ্তাহে সুবহে সাদিকের নির্মল মূহুর্তে আজকের আলোচিত মনীষী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা, ফজলুর রহমান ও মাতা, ওমদা খাতুন। ফজলুর রহমানের প্রথম পুত্র জন্ম লাভের কয়েক ঘন্টা পরেই জান্নাতবাসী হন (ইন্না ........ রাজিউন)। শিশুপুত্র ছোলতানের পরেও ওমদা খাতুন আরো দুইটি পুত্র ও দুইটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। খোদার ইচ্ছায় একমাত্র শিশুপুত্র ছোলতান আহমদ ছাড়া সকলেই বাল্যকালে ইন্তিকাল করেন। ফজলুর রহমান দম্পতি এতে ধৈর্য্য ধারণ করছিলেন। শেষ রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে কাঁদতে কাঁদতে দু’আ করতেন “হে আল্লাহ! আমার সকল সন্তান মারা যাওয়ার পর আমার একটি পুত্র সন্তান জীবিত রেখেছ। তাকে তোমার রাস্তায় ছদকা করলাম। এলেম দাও, নেক হায়াত দাও। বলাবাহুল্য আল্লাহ তার দু’আ কবুল করলেন।
ছোলতান আহমদ (রহ.) এর বংশ পরিক্রমা : ছোলতান আহমদ বিন হামীদ আলী বিন কমর আলী বিন কালুগাজি বিন আকবর শাহ। শৈশবকালেই শিশু ছোলতান আহমদের মধ্যে আধ্যাত্মিকভাব পরিলক্ষিত হয়। শেষ রাত্রে তাঁর পিতা যখন জিকির করতেন তখন তিনি ঘুম হতে জেগে উঠতেন। অগত্যা তাঁর পিতা পুত্রকে কোলে বসিয়ে জিকির করতেন।
ধর্মপুর গ্রামে একবার কলেরা মহামারী আকার ধারণ করে। হজরতের আম্মাজানও এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ওপাড়ে পাড়ি জমান। হযরতের বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর। আল্লাহ তাআলা তাঁকে মায়ের স্নেহ-ছায়া সরিয়ে নিলেন। এর কিছুদিন পরে হজরতের পিতা আর একটি বিবাহ করেন। সৎমাও তাঁকে আদর-যতœ করতেন। সৎ মায়ের ঘরে কোনো ছেলে সন্তান বাঁচেনি।
প্রাথমিক শিক্ষা: ১৩৩৭/৩৮ হিজরীতে প্রাথমিক লেখাপড়া তথা মক্তবের লেখাপড়া আরম্ভ করেন। মক্তবের শিক্ষা শেষ করে তিনি গর্জ্জনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষায় তিনি ১ম স্থান লাভ করেন। কিছুদিন পর তাকে নানুপুর বাজারে অবস্থিত মওলানা ওবাইদুল হক (রহ.) এর মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেয়া হয়। সেখানে তিনি কৃতিত্তে¡র সহিত জামাতে শুশুম পর্যন্ত লেখাপড়া সমাপ্ত করেন। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ।
উচ্চ শিক্ষা : উচ্চশিক্ষা অর্জন করার নিমিত্তে ১৩৫৬ হিজরীতে ভারতের ঐতিহাসিক দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দের পথে পাড়ি জমান। হাজারো বাঁধা আর সঙ্কট অতিক্রম করে তিনি দীর্ঘ ৭ বছর অত্যন্ত সুনামের সহিত দেওবন্দ মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। তাঁর তাকওয়া যোগ্যতা অবলোকন করে দারুল উলূম দেওবন্দের জামে মসজিদের ইমামতির মহান দায়িত্বভার তাঁর ওপর অর্পন করা হয়।
তিনি ১৩৬২ হিজরীতে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর নিকট বোখারি পড়ার মতো সুভাগ্য লাভে ধন্য হন।
বায়আত গ্রহণ: দেওবন্দে থাকাবস্থায় হজরতের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন শায়খুল আরব ওয়াল আজম হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ হুছাইন আহমদ মাদানী (রহ.)। তিনি ছৈয়্যদ বংশীয় ছিলেন। রওজা মোবারকে ১৩ বছর চারি মাযহাবের ছাত্রদিগকে মুখস্ত হাদীস শরীফ পড়িয়েছেন। হিজরী ১৩৬৩ সালের জিলহজ্ব মাসের ২তারিখ বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাযের পর শায়খুল আরব ওয়াল আজম হযরত মাওলানা হোছাইন আহমদ মাদানী (রহ.) হজরতকে এবং তাঁর সঙ্গীগণকে বাইআত করে নেন। সঙ্গীগণসহ ১৩৬৩ হিজরী সনের ৫জিলহজ্ব দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
কর্ম ও পারিবারিক জীবন : তিনি ১৩৬৩হিজরী জিলহজ্ব মাসের ১৫ তারিখে নাজিরহাট বড় মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানে এ মহান মনীষীর নিকট যারা এলমে দ্বীন হাসিল করছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক’জন, ১. মাওলানা ওবাইদুর রহমান (রহ.), সাবেক শায়খুল হাদীস জামেয়া বাবুগনর, ২. মূফতী আবদুর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা-ঢাকা,৩. আল্লামা হাফেজ শামসুদ্দীন (রহ.), সাবেক মুহতামিম নাজিরহাট বড় মাদরাসা, ৪. মাওলানা মহিবুল্লাহ- মুহতামিম বাবুনগর মাদরাসা, ৫. মাওলানা হারুন (রহ.), সাবেক শায়খুল হাদীস নানুপুর মাদরাসা, ৬. মাওলানা এয়ার মুহাম্মদ, ৭. মাওলানা আনোয়ার, মুহতামিম- আমতলী মাদরাসা, ৮. মাওলানা আহমদ গণী, শিক্ষক শোলকবহর মাদরাসা, চট্টগ্রাম, ৯. মাওলানা সোলতান যওক নদভী, মুহতামিম- দারুল মা’আরিফ, চট্টগ্রাম।
১৩৬৪ হিজরীর সফর মাসের ৭ তারিখে নিজ গ্রামের হাদুর বাপের বাড়ির মরহুম মুন্সি আব্দুল খালেকের প্রথম কন্যা মোছাম্মৎ মোমেনা খাতুনের সাথে হুজুরের শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। ১৩৬৬ হিজরী সনে হজরত একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন। হজরত মাওলানা লাল মিয়া সাহেব তার নাম রাখেন মুহাম্মদ ইদ্রিস। কিন্তু দুঃখের বিষয় ২ বছর ৯মাস বয়সে সে মারা যায়। হজরত ও তাঁর ধর্মপ্রাণ স্ত্রী ছবর করলেন। ১৩৬৮ হিজরীতে ২২ ছফর হজরতের ২য় পুত্র হাফেজ মাওলানা হোসাইন আহমদ জন্ম গ্রহণ করেন। হজরতের ৩য় পুত্রের নাম মাওলানা এমদাদ। হজরতের কন্যা সন্তান ৬জন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে তখন মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের আন্দোলন তীব্রতর। মাদরাসার মুহতামিম সাহেব পরামর্শ সভা ডাকলেন। পরামর্শ সভায় তিনি মুসলিম লীগের সমর্থন হযরত মাওলানা জাফর আহমদ ওছমানী (রহ.) কে নাজিরহাট বড় মাদরাসায় আশার প্রস্তাব করেন। কিন্তু হজরত মাওলানা আবদুল আযীয, মাওলানা ইছহাক গাজী এবং হজরত ছোলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.) নিজে এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতি মুক্ত রাখা। কিন্তু মুহতামিম সাহেব বললেন“ তোমরা রাজী না হলেও আমি আনব ”। এর প্রতিবাদে হজরত মাওলানা আব্দুল আযীয সাহেব, গাজী সাহেব ও হজরত নানুপুরী (রহ.) পদত্যাগ করেন। জাফর আহমদ ওসমানী সাহেবকে পরবর্তীতে মাদরাসায় এনে সভা করার পরিপ্রেক্ষিতে মাদরাসায় আগুন দেয়া হয়েছিল।
হজরত পদত্যাগ করে ১৩৬৬হিজরীর শাওয়াল মাসে মুহাদ্দিস হিসেবে আযীযুল উলূম বাবুনগর মাদরাসায় যোগদান করেন।
জাপান ও বৃটিশের মধ্যে বিশ্বযুদ্ব চলছিল বলে হজরত হোসাইন আহমদ মাদানির সাথে (যাঁর হাতে তিনি বাইয়াত হন) যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। হজরত ছোলতান (রহ.) তখন রূহানী তরক্কীর জন্য অন্যকোন একজন স্থানীয় বুযুর্গের সাথে রূহানী সম্পর্ক গড়ে তোলার মনস্থ করলেন। তখন তিনি মাদানির (রহ.) নিকট পত্র লিখে এর অনুমতি চাইলেন। তাঁর অনুমতিক্রমে এবং মাওলানা হারুন সাহেব ও ছদরে মুদাররিস মাওলানা আমিন সাহেব (রহ.) এর পরামর্শক্রমে হজরত মুফতি আজিজুল হক (পটিয়া) এর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়েন। মুফতি সাহেব (রহ.) নানুপুরী হুজুরকে পরিপূর্নরূপে আত্মশুদ্ধির পর তাকে খেলাফত প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে মুফতী সাহেব (রহ.) ১৩৮০ হিজরীর ১৫ রমজানে ইন্তেকাল করেন (ইন্না.........রাজিউন)। তিনি সর্বপ্রথম স্বীয় মুর্র্শিদ কুতুবে আলম মুফতী আজিজুল হক (রহ.) এর সাথে ১৩৭৮ হিজরীতে (১৯৫৭ইং) পবিত্র হজব্রত পালন করেন।
১৩৭৯ হিজরী সনে হজরত ছোলতান আহমদ (রহ.) নানুপুর জামেয়া ওবাইদিয়ার মুহতামিমের পদ গ্রহণ করেন। নানুপুর ওবাইদিয়া মাদরাসার অবকাঠামো এবং দ্বীনি উন্নয়নে হজরতের এখালাস, রক্তঝরা মেহনত ও সুদক্ষ পরিচালনার বর্ণনা বর্ণনাতীত। নানুপুর ওবাইদিয়া মাদ্রাসার মুহতামিমের দায়িত্ব পালনকালে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের জন্য যা করেছেন তা যে কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের মুহতামিমের জন্য আদর্শ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। জীবন সন্ধ্যায় হজরত বার বার বলতেন এ দুনিয়া আর ভালো লাগে না। মহান স্রষ্টা যাকে চাইছে কাছে, দুনিয়াতে থেকে যিনি অবলোকন করছেন চির শান্তির বাগান, তাঁর কাছে দুনিয়া ভালো না লাগারই কথা। ১৬আগস্ট ১৯৯৭ইং, রোজ শনিবার সকাল ৮টা ১০মিনিটে তাঁর প্রিয় এবং স্মৃতি বিজড়িত জামিয়ার নিজ কক্ষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে না ফেরার জগতে পাড়ি জমান। চোখে নোনা পানির জোয়ার যারা এ পারে আছেন (হজরতের ইন্তেকালে) কিন্তু খুশির মহোৎসব ওপারে (হজরতের আগমনে)।
হজরত নানুপুরী সাহেব! আপনার প্রস্থানে কেঁদেছে সবাই। শুধু আপনি হেসে হেসে চলে গেলেন স্রষ্টার সাণিœধ্যে। আপনি নেই একথাটা সম্পূর্ন ঠিক নয়, মনীষীর মৃত্যু নেই। আপনি ছিলেন, আপনি আছেন, আপনি থাকবেন। আপনার রেখে যাওয়া স্মৃতি, কর্মকান্ড আর উত্তরসূরীদের আলো ছড়ানো কাজের মধ্যে যারা আল্লাহর বিরাগভাজন হতে চায় না তারা বারবার আপনাকে খুঁজে পাবে, খুঁজে নেবে।
হজরতের নির্বাচিত কয়েকটি মূল্যবান নছীহত : ১. কোন একজন ওলী বুজুর্গের জীবনকে সামনে রেখে চলবে, ২. সকল ওস্তাদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করবে যেন তোমার কথায় মনে কষ্ট না পায়, ৩. এলাকার মানুষের হেদায়াতের জন্য ফিকির করবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন