ঢাকা, রোববার, ০৯ মে ২০২১, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮, ২৬ রমজান ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বামপন্থী আমেরিকানদের একটি গ্রুপ শান্তির জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত

দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট | প্রকাশের সময় : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১:১৪ এএম, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭


বহুদিন ধরেই আমেরিকা একটি সহিংসতার দেশ, এ সহিংসতা অধিকারের উপর কর্তৃত্ব করেছে। এমনটিই বলেছেন বামপন্থী আমেরিকান কর্মীদের একটি বিকাশমান গ্রুপ যারা শান্তির জন্য লড়াই করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত।
অ্যান্টি রেসিস্ট অ্যাকশন লস এঞ্জেলেস-এর সদস্য মাইকেল নভিক দি ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, এ সমাজে সর্বত্রই সহিংসতা। দারিদ্র সহিংসতা, উৎখাত করা সহিংসতা, পুলিশি বর্বরতা ও বর্ণবাদী হত্যা সহিংসতা। যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশী সহিংস।
নোভিক একজন অ্যান্টিফা কর্মী। অ্যান্টিফা হচ্ছে শিথিল সংগঠিত এক দল লোকের একটি সংগঠন। তারা যুক্তরাষ্ট্র থেেেক ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টটুকুও নির্র্মূল করতে চায় যদি তার জন্য যদি শক্তি প্রয়োগ করতে হয় তবু।
নোভিক বলেন, সাধারণ ভাবে ফ্যাসিস্ট বিরোধী এবং নির্দিষ্ট ভাবে অ্যান্টিফা স্বীকার করে যে মানবাধিকার ও মানুষের জীবন রক্ষার জন্য দৈহিক লড়াইসহ  এখন যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে।
অরিগন, ক্যালিফোর্নিয়া ও বোস্টনের চরম ডানপন্থী গ্রæপগুলোর সাথে ক্রমবর্ধমান ভাবে ব্যাপক মাত্রায় লড়াইয়ে লিপ্ত অ্যান্টিফা এ গ্রীষ্মে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। আগস্টে চার্লোটসভিলে শে^তাঙ্গ কর্তৃত্ববাদী সমাবেশের বিরুদ্ধে অ্যান্টিফা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, এমনকি তারা প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ট্রাম্প এক সমাবেশে চিৎকার করে বলেন, হেলমেট ও কালো মুখোশ পরে তারা দেখা দেয় , তাদের কাছে লাঠি ও সবকিছু ছিলÑ  তারা অ্যান্টিফা।
অ্যান্টিফা সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিষয় নয়।  হিটলার ও মুসোলিনির মত ফ্যাসিবাদী নেতাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার জবাবে ১৯২০-এর দশকে ইউরোপে এ আন্দোলনের উদ্ভব হয়। ঐতিহাসিক মার্ক ব্রের মতে, জাপানি সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনাদের ও ল্যাটিন আমেরিকায় বিভিন্ন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তারা কৌশল গ্রহণ করে।
১৯৮০-র দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নিও নাজি গ্রæপের ক্রমবর্ধমান ভাবে বিশিষ্ট হয়ে ওঠার জবাবে অ্যান্টিফা জোরালো হয়। তারা ঘন ঘন পাংক শো ও বিকল্প রক কনসার্টের আয়োজন করে যেখানে স্কিনহেডদের জড়ো হতে দেখা যায় এবং তাদের নিজেদের সাহিত্য দিয়ে গ্রæপের বর্ণবাদী বার্তার মোকাবেলা করে। ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর গোড়ার দিকে বিশ^ায়ন ও অবাধ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।
অ্যান্টিফা কর্মীরা বলছেন, এখন তারা বর্ণবাদী, যৌনতাবাদী, চরম ডানপন্থী সহিংসতার নতুন ঢেউয়ের জবাব দিচ্ছেন যা ক্রমবর্ধমান ভাবে সরকারের নিকট থেকে সুরক্ষা পাচ্ছে। নোভিকের মতে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে একটি নতুন, অধিকতর নগ্ন শে^তাঙ্গ ও পুরুষ প্রাধান্য যা কিনা এখনকার নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
পরিসংখ্যানে চরম ডানপন্থীদের সহিংসতার বাড়ন্ত অবস্থা দেখা যাচ্ছে।  দি অ্যান্টি ডিফেমেশন লীগ নামে একটি ইহুদি চ্যারিটি ২০১৭ সালের প্রথম তিন মাসে সেমিটিক বিরোধী ঘটনা ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা জানিয়েছে। দি কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স জানায়, এ গ্রীষ্মে মুসলিম বিরোধী ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ৯১ শতাংশ। সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের তথ্যমতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের পর সপ্তাহে কৃষ্ণাঙ্গ বিরোধী, মুসলিম বিরোধী, অভিবাসন বিরোধী, নারী বিরোধী অথবা এলজিবিটিকিউ বিরোধী সহিংসতা সংঘটিত হয়।
মার্চে এক শে^তাঙ্গ অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক নিউ ইয়র্কের রাস্তায় এক কালো অচেনা লোককে ছুরিকাঘাত করে মারাত্মক আহত করে। পুলিশকে সে বলে, কালো লোকদের সে ঘৃণা করে। দু’মাস পর অরিগনের পোর্টল্যান্ডে একটি ট্রেনে এক ব্যক্তি দু’ কালো মহিলাকে অপমান করে। অন্য তিন যাত্রী এর প্রতিবাদ করলে লোকটি ছুরি মেরে তাদের দু’জনকে হত্যা ও একজনকে আহত করে।
সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঘটনার প্রেক্ষিতে অ্যান্টিফা বলে, প্রতিরোধের জন্য তাদের কোনো সরকারী অবলম্বন নেই।   
নোভিক বলেন, অ্যান্টিফা শিখেছে ও ঘটনা থেকে দেখেছে যে নিপীড়িত ও শোষিত সম্প্রদায়গুলো এবং জনপ্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন সমূহ নাজিদের কাছ থেকে আমাদের রক্ষার ব্যাপারে পুলিশ বা আদালতের উপর নির্ভর করতে পারে না। কারণ, পুলিশ ও আইন ব্যবস্থা নিজেরাই প্রায়শই বর্ণবাদী ও যৌন সহিংসতার দায়ে দোষী বা তার সাথে সম্পৃক্ত।
ট্রাম্পের নির্বাচনের পর বহু অ্যাক্টিভিস্টই মনে করেন যে সরকারের কাছে তাদের জন্য কোনো সান্ত¡না নেই।  জেমস অ্যান্ডারসন নামে নৈরাজ্যবাদীদের ওয়েবসাইট ইট’স গোয়িং ডাউন-এ  লিখে থাকেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন নিশ্চিতই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী, উগ্র ডানপন্থী ও নিও-নাজিদের কভার দিচ্ছে।
আগস্টের এক উত্তপ্ত সপ্তাহান্তে চার্লোটসভিলে যখন শত শত শে^তাঙ্গ  শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিক্ষোভকারীরা ‘ইউনাইট দি রাইট’-এর পক্ষে সমবেত হয় তখন এ মনোভাবের জোরালো প্রকাশ ঘটে। বিক্ষোভকারীরা বন্দুক হাতে মিলিশিয়া রূপে আবির্ভূত হয়, পক্ষান্তরে বিক্ষোভকারী-বিরোধীরা পিপার স্প্রে ও প্র¯্রাব ভরা পানির বোতল নিয়ে তাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ কার্যত দাঁড়িয়ে থাকে।
এ সংঘর্ষে কয়েক ডজন লোক আহত হয়। এক নিও-নাজি বিক্ষোভকারী-বিরোধীদের মধ্য দিয়ে তার গাড়ি চালিয়ে দিলে হিদার  হেয়ার নামে ৩৪ বছর বয়স্ক এক নারী নিহত হন।
সমাবেশের ছবি সংবাদে প্রধান হয়ে ওঠে।  সাবেক প্রেসিডেন্টরা এর নিন্দা করেন। ট্রাম্প এ সমাবেশে দু’পক্ষেরই সহিংসতা ও ঘৃণার নিন্দা করেন।
শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা তাদের অ্যান্টিফা প্রতিপক্ষের সাথে আলোয় উঠে আসে। বহু আমেরিকানই যখন কি ঘটে গেল বলে বিস্ময় কবলিত তখন অ্যান্ডারসন বলেন, তাদের এটা আসতে দেখা উচিত ছিল।  তিনি বলেন, এগুলো (আগের হত্যাগুলো) সবই হুঁশিয়ারি লক্ষণ , ঠিক হিদার হেয়ারের হত্যার মত। কিন্তু কিছু কারণে নিউইয়র্কে একজন আফ্রিকান আমেরিকান এক ব্যক্তির হাতে নিহত হল, কন্তু তার মৃত্যু হিদার হেয়ারের মত একই হুঁশিয়ারি সংকেত নয়।
তিনি আরো বলেন, লোকজন যদি আগের এই হত্যাগুলো গুরুত্বের সাথে নিত  যা তাদের করা উচিত ছিল, তাহলে আমরা চার্লোটসভিলের এ হত্যাকান্ড রোধ করতে পারতাম।  
একই ধরনের উপলব্ধি ক্রমেই বেশী সংখ্যক আমেরিকানকে অ্যান্টিফার ব্যাপারে নিজেদের অঙ্গীকারবদ্ধ করতে ঠেলে দিচ্ছে। অ্যান্ডারসনের ওয়েবসাইট যেখানে রোজ ৩শ’টি মতামত পেত এখন সেখানে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার মতামত পাচ্ছে। অ্যান্টিফা নিউইয়র্ক সিটি শাখার মতে, এ বছরের প্রথম তিন মাসে গ্রæপের ট্ইুটার ফলোয়ার চারগুণ হয়েছে। এখন তাদের ফলোয়ার সংখ্যা ২১ হাজারেরও বেশী।
নববলে বলীয়ান অ্যান্টিফা তাদের কৌশলের ব্যাপারে লাজুক নয়। চার্লোটসভিলের সমাবেশের কয়েক সপ্তাহ পর ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কেলেতে ১শ’ কালো পোশাক পরা অ্যান্টিফা অ্যাক্টিভিস্ট বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সমাবেশের ভিডিও থেকে দেখা যায়, অ্যান্টিফা অ্যাক্টিভিস্টরা ্রাম্প সমর্থকদের মাটিতে ফেলে চড় থাপ্পড় মারছে , পানি বোতল ছুঁড়ছে, পিপার স্প্রে ছুঁড়ছে এবং এমনকি একা ব্যক্তির উপর হামলা করছে।       
এ রূপ সহিংসতার প্রদর্শনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে অ্যন্টিফ্যাসিস্ট আটলান্টা শাখার এক কর্মী দি ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, চরম ডানপন্থী ও ফ্যাসিস্টরা যখন লাগামহীন হয়ে ওঠে তখন অনিবার্য ভাবে ব্যাপক সহিংসতা, স্থানচ্যুতি ও খুনের পথে অগ্রসর হয়। তিনি বলেন, চরম ডানপন্থীদের হুমকি ও হামলার বিরুদ্ধে কম্যুনিটি ও প্রান্তিকীকৃত লোকদের আত্মরক্ষা করা শতভাগ যুক্তিসঙ্গত।  
বহু স্ব-ঘোষিত লিবারেলসহ মূলধারার অনেকেরই এটা অভিমত নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার এক ডেমোক্র্যাটিক প্রতিিিধ ও হাউসের সংখ্যালঘু নেতা ন্যান্সি পেলোসি বার্কলে ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার ও বিচারের আহবান জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। তিনি বলেন, আমাদের গণতন্ত্রে সহিংসতা উস্কে দেয়া বা জনগণের জীবন বিপদাপন্ন করার কোনো সুযোগ নেই তা সে যে আদর্শের লোকই এ ধরনের কাজ করুন না কেন।
সাবেক ওবামা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা অ্যান্ডি ¯øাভিট অ্যান্টিফা অ্যাক্টিভিস্টদের ‘ইডিয়ট’ ও ‘জন্তু’ বলে আখ্যায়িত করেন। বার্কেলের মেয়র অ্যান্ডি ¯øাভিট বলেন, তাদের চক্র হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা উচিত।
অ্যান্ডারসন ও বহু অ্যান্টিফা অ্যাক্টিভিস্টের কাছে এ ধরনের মন্তব্য হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি শক্তির কার্যকর ক্ষমতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে অনিবার্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।  
অ্যান্টিফার অনেকেই মনে করেন, ক্রমশ জঙ্গি হয়ে ওঠা এ বিশে^ সহিংসতা হচ্ছে আত্মরক্ষার একমাত্র পন্থা। অন্যরা মনে করেন, এ লড়াইয়ের ঝুঁকি মনে হয় খুব বেশী।
নোভিক বলেন, সম্প্রতি আমি প্রপিতামহ হয়েছি। তার নিজের পিতা হলোকাস্ট থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমার পিতামহ-পিতামহীরা ও পিতা-মাতার প্রজন্মরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন , আমি চাই না আমার সন্তান, নাতি অথবা তাদের সন্তানরা সেই পৃথিবীতে বাস করুক।  

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন