বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যত্র সরাতে হবে

প্রকাশের সময় : ১৯ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

দেশের নাগরিক সমাজ এবং ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনের আপত্তি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সুন্দরবনের পরিবেশগত বিপদসীমার মধ্যে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা কমিটি নামের একটি সংগঠন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে তার দ্বিতীয় লংমার্চ কর্মসূচি এই সপ্তাহে পালিত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন গোটা দেশের মানুষ। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে এবার সোচ্চার প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন ভারতের পরিবেশবাদীরাও। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মীয়মাণ বাংলাদেশের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে অনেক বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের সুযোগ বৃদ্ধির ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে দেশের কোনো নাগরিকের দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের বিশালায়তন তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সুন্দরবনের স্পর্শকাতর অঞ্চলটিকেই বেছে নেয়া হলো কেন? বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সরকার ইতোমধ্যে বেশ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রেন্টাল, কুইকরেন্টাল, বার্জমাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্র জরুরি চাহিদা পূরণে অনেক অবদান রাখছে। দেশের দরিদ্র মানুষের কষ্ট হলেও এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের জন্য বাড়তি অর্থ দিতেও জনগণ কার্পণ্য করছে না। তবে সুন্দরবনকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের কোনো পরিকল্পনাকে দেশের কোনো বিবেকবান মানুষই মেনে নিতে পারে না।
আমাদের দেশে যেমন বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে, পর্যায়ক্রমে তা পূরণের পথেও এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। ইতোমধ্যে কক্সবাজার সমুদ্রোপকূলীয় কয়েকটি জোনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সম্পদের হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব উদ্যোগ এগিয়ে নেয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ইমপ্যাক্ট নিয়ে আরো বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও আমরা সংশ্লিষ্টদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তবে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের অজুহাতে সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার উদ্যোগ কোনো বিবেচনায়ই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের মানুষ দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি মেনে নিতে রাজি আছে, তবে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সুন্দরবনের কোনো দূরবর্তী ক্ষতির আশঙ্কাও মেনে নিতে রাজি নয়। ভারতের সাথে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে তা বাস্তবায়নে সরকার যতই অনড় ভূমিকায় রয়েছে, দেশের মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্ব নিয়ে ততই বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে আসছে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে সরকারের দিক থেকে যতই সাফাই গাওয়া হোক, সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক বৃহদাকার বিদ্যুৎকেন্দ্র অথবা যে কোনো ভারী শিল্পের অনুমোদন যে কী ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সুন্দরবনের শেলা নদীতে জ্বালানি তেল ও বিষাক্ত ও ভারী কেমিকেলবাহী ট্রলারডুবির কারণে পানিদূষণ, নানা ধরনের জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টির পরও আমাদের নীতিনির্ধারকদের সম্বিত না ফেরা এবং সেখানে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অটল থাকার বিষয়টি বিস্ময়কর।
পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় লাগামহীন ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের অপরিণামদর্শী প্রতিক্রিয়ায় একবিংশ শতকে এসে আমাদের বিশ্ব এখন বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে তথাকথিত উন্নয়নের সাবেকি মানদ- বিশ্বের কোথাও এখন আর খাটছে না। বিশ্বসংস্থাগুলো এখন এমডিজির স্থলে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নতুন মানদ- নির্ধারণ করছে। সুপেয় পানি, বনভূমি, নির্মল বাতাস, উর্বর মাটি, পাহাড় এবং জীববৈচিত্র্য যে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য সম্পদ। বিশ্বের অনেক দেশই চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে। আগামী দশকের মধ্যে আমরাও হয়তো বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সক্ষম হব। গ্যাসভিত্তিক, আমদানি করা জ্বালানিনির্ভর, কয়লাভিত্তিক এমনকি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনেক উদ্যোগ আমাদের রয়েছে। তবে বিশ্বের কোনো শিল্পোন্নত দেশ তার সব সম্পদ দিয়েও আরেকটি সুন্দরবন সৃষ্টি করতে পারবে না। সুন্দরবনের সন্নিহিত রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে এর আগে ইউনেস্কা, রামসারসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট দিয়েছে। এমনকি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক নৌপরিবহন বন্ধেরও সুপারিশ করা হয়েছে। সরকার এসব অকাট্য যুক্তিকে আমলে নেয়নি। এবার ভারতীয় পরিবেশবাদীরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ভারতে কিছু এলাকায় পরিবেশগত বিপর্যয় ও নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে সুন্দরবনে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে এ থেকে বছরে ৭৯ লাখ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি হবে, যা পরিবেশের ওপর ৩৪ কোটি গাছ কেটে ফেলার সমান বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি মানুষের ভাগ্যে বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে, এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে সরকারের অবশ্যই সরে আসা উচিত। পরিবেশ এবং জননিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আদালতের নির্দেশে অথবা সরকারি সিদ্ধান্তে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার অনেক নজির রয়েছে। সে ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগেই এ বিষয়ে সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন