ঢাকা, মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সারা বাংলার খবর

পিঁয়াজের পদোন্নতি

স্টালিন সরকার | প্রকাশের সময় : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, ৯:২৯ পিএম

বৈজ্ঞানিক নাম আলিম সেপা (Allium cepa)। ইংরেজীতে ‘অনিয়ন’ এবং বাংলায় পরিচিতি ‘পিঁয়াজ’ নামে। পিঁয়াজ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মসলা জাতীয় অর্থকরী ফসল। শীতকালের ফসল পিঁয়াজ রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর এমন দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে পিঁয়াজের ব্যবহার নেই। মসলা জাতীয় পণ্য পিঁয়াজ দিল্লীর নি¤œ আয়ের মানুষ রুটির সঙ্গে খায়। ঔষধি গুন থাকলেও বাংলাদেশে আলু-পটলের মতো চাষাবাদ হওয়া পিঁয়াজ তরকারির স্বাদ বৃদ্ধিতে মসলা হিসেবে কার্যত ব্যবহৃত হয়। আলু-পটলের মতোই সের-কেজি ধরে ভোক্তারা পিঁয়াজ কিনতে অভ্যস্ত। হাট-বাজারে পিঁয়াজের অবস্থান আলু-বেগুন-পটল বিক্রেতাদের দোকানেই শোভা পায়। হঠাৎ দাম বৃদ্ধির কারণে পিঁয়াজের যেন সামাজিক পদোন্নতি ঘটতে যাচ্ছে। দাম বাড়তে বাড়তে ৩০ টাকা কেজি দরের পিঁয়াজ এখন প্রতি কেজি ১৩০ টাকা ছাড়িয়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবেই এক বছরে পণ্যটির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২০৭.৬৯ শতাংশ। বাজারে এক কেজি দেশি পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকা দরে। আর আমদানি করা ভারতীয় পিয়াজ বিক্রী হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে।
ওজন করে দেখা যায় দেশি ৫০ থেকে ৬৫টি পিয়াজে (সাইজ ভেদে) হয় এক কেজি। আর ভারতীয় পিয়াজের আকার ভেদে এক কেজিতে ওঠে ৮ থেকে ২০টি। এ হিসেবে দেখা যায় এক পিস দেশি পিঁয়াজের বর্তমান মূল্য কমবেশি দুই টাকা। পিছ হিসেবে আমদানি করা প্রতি পিস পিয়াজের মূল্য দাঁড়ায় ৪ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। অংকের হিসেবে ৪ পিছে হয় এক হালি আর ১২ পিছে এক ডজন। এই হিসেবে দেখা যায় দেশি পিঁয়াজ এক হালির দাম ৮ টাকা (আকার-প্রকার ভেদে) এবং বিদেশী এক হালির দাম ১৬ টাকা থেকে ৪০ টাকা। হঠাৎ করে পিঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় নি¤œ বৃত্ত এবং সীমিত আয়ের মানুষ একশ গ্রাম, আড়াইশ গ্রাম করে পিয়াজ ক্রয় করে চাহিদা মেটাচ্ছেন।
দেশের সাধারণ ভোক্তরা আলু-পটলের মতোই কেজি দরে পিয়াজ ক্রয়ে অভ্যস্ত। আর ডিম, কমলা হালি-ডজন দরে ক্রয় করে। ডিমের দাম কমে যাওয়ায় বর্তমান বাজারে এক হালি ডিমের মূল্য ২৪ থেকে ২৫ টাকা। প্রতিপিছ ৬ টাকা। বর্তমান মূল্য বেশি হলেও মৌসুমের সময় প্রতি হালি (৪টি) কমলা প্রকার ভেদে ২০ টাকা থেকে ৮০ টাকা বিক্রী হয়। রাজধানীর কাঁচা বাজারের বিক্রেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে তারা ক্রেতাদের একশ-আড়াইশ গ্রাম পিঁয়াজ ক্রয়-বিক্রয়ের চিত্র তুলে ধরেন। বললেন, দাম না কমলে কয়েকদিনের মধ্যে হয়তো পিঁয়াজ ডিমের মতো হালি দরে বিক্রী হবে। দেশী পিঁয়াজ যেহেতু আকৃতিতে ছোট সেটা ডজন দরে বিক্রী হবে। এতে ভোক্তারা হালি-ডজন দরে পিঁয়াজ ক্রয় করে তরকারির স্বাধ ধরে রাখলেও সামাজিক মর্যাদায় পিঁয়াজের উদোন্নতি হবে। হালি-ডজন দরে বিক্রী হলে পিঁয়াজ আর বাজারে আলু-পটল-মুলা-বেগুনের দোকানে শোভাবর্ধন করবে না। দামের কারণে ক্রেতাদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ এড়াতে অনেক বিক্রেতা পিঁয়াজ বিক্রী বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন হয়তো পিঁয়াজ চলে যাবে ডিম ও কমলা বিক্রেতাদের দোকানে। তখনো পিঁয়াজের চাহিদা থাকবে। মধ্যবৃত্তরা তরকারির স্বাধ রক্ষায় হালি-ডজন দরে পিঁয়াজ কিনলেও নি¤œ আয়ের মানুষ ঔষুধ হিসেবে পিঁয়াজের ব্যবহার করবে। পৃথিবীর সব দেশেই রান্নায় পিঁয়াজের ব্যবহার হলেও পণ্যটির ঔধুষিগুন অনেক। ভিনিগারে ডুবিয়ে পিঁয়াজের সুস্বাদু আচার তৈরি করা হয়। পিঁয়াজ একদিকে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট অন্যদিকে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, এবং ভিটামিন এ-তে সমৃদ্ধ। শরীরের জেল্লা ধরে রাখতে পিঁয়াজ অনবদ্য। মেয়েদের ব্রুণ সমস্যায় এক চামচ পিয়াজের রসের সঙ্গে এক চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে মুখে মেখে ১৫ মিনিট পরে ধুয়ে ফেললে উপকার পাওয়া যায়। মাথায় খুসকি ও চুলের সমস্যায় গোসলের ১৫ মিনিট আগে মাথায় ভাল করে পিয়াজের রস মেখে পরে ধুয়ে ফেললে উপকার পাওয়া যায়। হারবাল-আযূবেদী তথা ভেজস চিকিৎসায় পিঁয়াজ নানা ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাচাবাজার হিসেবে পরিচিত কাওরানবাজার পাইকারি দোকানে দেশি পিঁয়াজ প্রতি পাল্লা (৫ কেজি) ৫৫০ টাকা বিক্রী হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি কেজির পাইকারী মূল্য ১১০ টাকা। অন্যদিকে আমদানি করা পিঁয়াজের পাইকারি দর প্রতি পাল্লা ৩৭০ থেকে ৪’শ টাকায় বিক্রী হচ্ছে। টিসিবি’র বাজারদরের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী ২০১৬ সালের এ সময়ে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) আমদানি করা ও দেশি পিঁয়াজের কেজি প্রতি দাম ছিল ২৫ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি কেজি পিঁয়াজ কিনতে হচ্ছে তিন-চার গুণ বেশি দরে। গত দুই মাসে বাজারে পিঁয়াজের দাম বেড়েছে প্রায় একশ ভাগ। ঈদুল আজহার আগে যে পিঁয়াজের কেজি ছিল ৩৫ টাকা; সেই পিঁয়াজই এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। ১৫ দিন আগেও দেশি পিঁয়াজের কেজি ছিল ৮০ টাকা; বিদেশী পিঁয়াজ বিক্রী হতে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে। সেই পিঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে গেছে যে সাধারণ মানুষকে কেজি দরে নয়; আগামীতে হালি-ডজন হিসেবে পিঁয়াজ কিনে নিজেদের চাহিদা মেটতে হবে। হাট-বাজারে বিক্রেতাদের উদ্দেশ্য করে ডিম-কমলা ক্রয়ের মতো ক্রেতাদের বলতে শোনা যাবে এক হালি বা এক ডজন পিঁয়াজ দিন তো। তখন পিঁয়াজের পদোন্নতিই ঘটবে বটে!

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন