ঢাকা শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ০২ মাঘ ১৪২৭, ০২ জামাদিউল সানী ১৪৪২ হিজরী

সারা বাংলার খবর

রাজশাহী অঞ্চলে বাড়ছে মানসিক রোগী

রেজাউল করিম রাজু : | প্রকাশের সময় : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

রাজশাহী অঞ্চলে বাড়ছে মানসিক রোগীর সংখ্যা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোর ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের প্রাইভেট চেম্বার লক্ষ্য করলে দেখা যায় ভীড়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায় বিগত ২০১৮ সালে বহিঃবিভাগের মানসিক বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন পনের হাজারের বেশী মানুষ। এর বাইরেও রয়েছে চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা করতে আসা বিপুল সংখ্যক রোগী। যার পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। রোগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা বলে দেয় অবস্থার ভয়াবহতার কথা। রাজশাহী ছাড়াও আশেপাশের জেলা থেকে মানসিক রোগী আসে। চিকিৎসার জন্য রয়েছেন চারজন চিকিৎসক। এরমধ্যে তিনজন বিশেষজ্ঞ আর একজন মেডিকেল অফিসার।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন বহিঃবিভাগে গড়ে শতাধিক রোগী চিকিৎসা নেয়। যাদের আর্থিক অবস্থা একটু ভাল তারা যান চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় গুরুতর রোগীদের পাবনার মানসিক হাসপাতালে যাবার পরামর্শ দেয়া হয়। যারা নিয়মিত যোগাযোগ করে তাদের পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব যাচ্ছেনা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইক্রিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দিন জানান, মানসিক অসুস্থতা নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বেশী। যা উদ্বেগজনক বটে। সাধারনত চৌদ্দ বছর থেকে পঞ্চাশ বছর বয়েসীরা মানসিকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে অভিভাবকরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন। এদের বেশীর ভাগই সামাজিক, পারিবারিক ও মাদকাসক্ত সমস্যায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ও চেম্বারে আসাদের বেশীর ভাগের মধ্যে রয়েছে মাদকাসক্তি, বিষন্নতা, উদাসীনতা, অস্থিরতা, হঠাৎ করে রেগে যাওয়ার প্রবণতা, বিরক্তিবোধ, অমনোযোগীতা, অতিচঞ্চলতা, মনোব্যাধি, নিজের ক্ষতি ও আত্মহত্যা, অবাধ যৌনাচার ও ভায়ালেন্সের প্রস্তুতি। যারা মানসিক বিষন্নতায় ভুগছেন তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশী কাজ করে। ফলশ্রুতিতে দেখা যাচ্ছে এ অঞ্চলে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। যা উদ্বেগজনক বটে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এনামুল হকের দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিত আকাশ সংস্কৃতি, পর্ণ, পারিবারিক বন্ধন আলগা হওয়া চরম বেকারত্ব, মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, মাদকের সহজলভ্যতা সর্বোপরি ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাবার জন্য চারদিকে ভর করেছে অস্থিরতা, হতাশা, বিষন্নতা। আইনের শাসন না থাকা, নগরায়ন, আর্থ সামাজিক অবস্থা, মানসিক চাপের কারণে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এখন দেশে দুটো শ্রেণী এক দরিদ্র আর অতি ধনী। এদের মধ্যে ফারাক আকাশ পাতাল। দেশে আশি লাখেরও বেশী মানসিক রোগী রয়েছে।
একজন এনজিও কর্মকর্তা রাজশাহীর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, শিক্ষা নগরী রাজশাহীতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসছে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। বেশীর ভাগ উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে ডিগ্রীতে ভর্তি হবার জন্য। গ্রাম থেকে আসছে নগরে। আশ্রয় নিচ্ছে মেসে ছাত্রাবাস ছাত্রীনিবাসে। পরিবারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলেছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মিশে যাচ্ছে। চোখে মুখে তারুণ্যের উম্মাদনা নিয়ে ছুটে চলা। তবে এ পথ খুব একটা মসৃন নয়। বন্ধু বান্ধব প্রেমিক প্রেমিকা নিয়ে হৈ হুল্লোড়। বিনোদন কেন্দ্র আর পদ্মা তীরে খুনসুটি করতে করতে জীবনের আসল লক্ষ্য হতে সরে যাচ্ছে। আবার লেখাপড়া শেষ করলেও মিলছেনা চাকুরী নামের সোনার হরিণ। একটা সামান্য চাকুরী পেতে খুটির জোর ছাড়াও লাগে দশ বিশ লাখ টাকা। যার কোনটিও নেই দরখাস্ত করতে করতে ভর করছে হতাশা। অন্যদিকে গ্রামের স্বজনরা স্বপ্ন দেখছে এই বুঝি তাদের কষ্টের দিন শেষ হলো। ফলে উভয় পক্ষে বাড়ছে হতাশা, দুলছে আশা নিরাশার দোলাচলে । সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সেটি কখন যে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করেছে তা টের পাওয়া যায়নি।
একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বলেন, দেশে এখন সবচেয়ে বেশী বিষন্নতায় রয়েছে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। হামলা, মামলা, কারাগার, আদালত পাড়া আর পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে পাগল হবার দশা। ব্যবসা বানিজ্য সব গেছে। মামলার খরচ আর নিজেদের দু’মুঠো অন্ন সংস্থান করতে হিমসিম খাচ্ছে। অস্থিরতা আর বিষন্নতা ভর করেছে। অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।
চিৎিসকরা বলছেন এসব রোগে আক্রান্তদের পাশে সামাজিক ভাবে দাড়াতে হবে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবার ও সমাজ থেকে তাদের প্রতি খারাপ আচরণ করা হয়। এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। তাদের সর্বক্ষণ নজরে রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। তিনি বলেন, এধরনের রোগীকে একেবারে শেষ মুহুর্তে চিকিৎসকের নিকট আনা হয়্ তাদের প্রথম অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করলে দ্রুত সুস্থ করে তোলা সম্ভব। তাছাড়াও মানসিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। যাতে খুব সহজে যথাযথ চিকিৎসা লাভ করা যায়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন