ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

স্বাস্থ্য

হাঁপানি আক্রান্ত শিশুদের জন্য নিয়ম

ডাঃ আহাদ আদনান | প্রকাশের সময় : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

পুরো শীতকাল এবং বসন্তকালে অনেক মায়েদের আতঙ্কে থাকতে হয়, বিশেষ করে যেসব বাচ্চার হাঁপানি বা অ্যালার্জি’র সমস্যা আছে, এই বুঝি ঠান্ডা লেগে গেল। এই মায়েরা মোটামুটি জেনে যায়, ঠান্ডা লাগলেই হাঁচি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া শুরু হয়ে যায়। ভাগ্য খারাপ হলে শ্বাসকষ্টের জন্য চিকিৎসকের কাছে কিংবা হাসপাতালে ভর্তির জন্য যাওয়া লাগে। আসলে, অ্যালার্জি জিনিসটা কী? এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় অতি-সংবেদনশীলতা। আমাদের শরীরে যেকোনো বাইরের বস্তু প্রবেশ করলে (শ্বাস, খাদ্য, রক্তের মাধ্যমে) সৃষ্টিকর্তার দেওয়া শারীরিক নিয়ম চেষ্টা করে একে বের করে দিতে, কিংবা নিষ্ক্রিয় করে দিতে। এটি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে অনেক সময় ত্বরান্বিত কিংবা অতিরিক্ত ধাপের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে অ্যালার্জি। যেমন, রাস্তায় ধুলার মধ্যে গেলে অনেকের কিছুই হয় না। কারও কারও হাঁচি-কাশি দেখা দেয়। আবার কেও কেও শ্বাসকষ্ট অনুভব করে। আবার একই পরিবারের একজন চিংড়ি, বেগুন, গরুর মাংস একসাথে খেয়ে ফেলছে সমস্যা ছাড়াই। আরেকজন হয়ত একটু চিংড়ি মুখে দিয়েই সারা শরীর লাল ছোপে ভরে যায়। অর্থাৎ, তার অ্যালার্জি আছে। 

এই অ্যালার্জি অনেক রূপে প্রকাশ পেতে পারে। চুলকানি, লাল ছোপ, শরীরে পানি আসা, নাকে পানি, হাঁচি-কাশি, শ্বাসকষ্ট এসবই অ্যালার্জির জন্য হতে পারে। হাঁপানি (অ্যাজমা) হচ্ছে এমনই একটি অ্যালার্জি-জনিত সমস্যা, যেখানে কাশি, বুকে ব্যাথা এবং শোঁ-শোঁ করা, শ্বাসকষ্ট একসাথে থাকতে পারে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদের সমস্যা। নিয়ন্ত্রণে রাখলে বাচ্চারা ভালো থাকে, এমনকি বড় হলে কোন লক্ষণও থাকে না। আবার ওষুধের অনিয়ম, কিংবা নিয়মের ব্যাত্যয় হলে জীবন নিয়ে সঙ্কটও দেখা দিতে পারে।
হাঁপানির ওষুধ নির্ধারণ চিকিৎসকদের কাছেও একটি জটিল প্রক্রিয়া। বড়দের এবং ছোটদের ওষুধে ব্যপক ভিন্নতা আছে। আমি এই লেখাতে ওষুধের ব্যাপারে কিছু বলব না। আমি মায়েদের জন্য কিছু নিয়মের কথা বলব, যেগুলো পালন করলে শুধু হাঁপানির শিশু নয়, শুধু ছোটরা নয়, ঘরের সবাই উপকার পাবে।
- ঘরে মশার কয়েল/ স্প্রে করবেন না (অন্তত শিশুর ঘরে)। মশারির ব্যাবহার বাড়ান।
- ধূমপান পরিহার করুন। শিশুদের পরোক্ষ ধূমপানের হাত থেকে বাঁচান।
- শীতকালে কম্বল ব্যবহার না করে কাভার সহ লেপ ব্যবহার করবেন। কম্বলের সূ² আঁশ শ্বাসনালীতে সমস্যা করে।
- আঁশযুক্ত খেলনা, কার্পেট, কুশন পরিহার করবেন।
- ঘর ঝাড় দেওয়ার সময় বাচ্চাকে সরিয়ে রাখুন।
- কোন বিশেষ খাবারে এলার্জি আছে কিনা বের করতে হবে। একই খাবারে সবার সমস্যা নাও হতে পারে। প্রমাণিত অ্যালার্জিযুক্ত খাবার (গরুর মাংস, গরু/ছাগলের দুধ, ইলিশ, চিংড়ি, বেগুন, পুঁইশাক, হাঁসের ডিম ইত্যাদি), যে কোন একটি খুব অল্প পরিমাণে দিয়ে দেখতে হবে সমস্যা হচ্ছে কিনা। সমস্যা হলে ঐ বিশেষ খাবার বাদ দিতে হবে। সমস্যা না হলে সতর্কতার সাথে খাওয়া যেতে পারে। লক্ষ্য রাখবেন, একাধিক অ্যালার্জিযুক্ত খাবার একই দিন না দেওয়াই ভালো।
- কৃত্রিম রঙযুক্ত খাবার (প্যাকেটের জুস, চকোলেট, চিপস), কেমিক্যাল দেওয়া ফল, সবজি (বিশেষ করে মাল্টা, আঙুর পরিহার করবেন।
- দেশি মৌসুমি ফল (আম, জাম, পেয়ারা, আমড়া, লেবু, কামরাঙা, কলা, কমলা, পেপে, গাব, সফেদা, আতা, লটকন, আমলকী ) বেশি করে খাওয়ার অভ্যাস করুন।
- টিভি, মোবাইল, ট্যাব দেখা কমিয়ে ঘরের বাইরে খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটির চেষ্টা করুন।
- বাচ্চার স্কুলে ধুলাবালিতে মুখোশ (মাস্ক) পড়ার অভ্যাস করুন। অন্য অভিভাবকদের সহায়তায় মুখোশ ব্যাবহারের সংস্কৃতি চালু করুন।
- বাজারে, রাস্তায় অনেক সময় শ্বাসকষ্ট ‘নির্মূলের’ টোটকা চিকিৎসা দেওয়া হয়, যেখানে উচ্চমাত্রার হাঁপানির ওষুধ, এবং অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ রাসায়নিক থাকে। এগুলো সাময়িক ভালো লাগার অনুভূতিও করে। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য এগুলো ভয়ংকর ক্ষতির কারণ।
ইদানিং শহরের বাতাস প্রতিনিয়ত বিষিয়ে উঠছে। গ্রামের ফসল তোলার সময়টাও হাঁপানির জন্য খারাপ। হাঁপানি আক্রান্ত শিশুদের মায়েরা দিনের পর দিন হাঁপানির ওষুধ খাওয়াতে খাওয়াতে রীতিমত অসহায় বোধ করেন। তাই আসুন, চেষ্টা করি, যতটা সম্ভব নিয়ম মেনে হাঁপানি’র প্রকোপ, কিংবা মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখি।

রেজিস্ট্রার (শিশু বিভাগ), আইসিএমএইচ, মাতুয়াইল, ঢাকা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন