ঢাকা, শনিবার ২০ জুলাই ২০১৯, ০৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

সরকারের প্রথম ১০০ দিন ও আগামীর পথচলা

| প্রকাশের সময় : ১৮ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার তার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০দিন পার করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে এটি খুব বেশী সময় না হলেও যে কোনো সরকারের দায়িত্ব পালনে সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে প্রথম ১০০দিন গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। দশম সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বিগত সরকারের প্রথম একশ দিনের কার্যক্রম নিয়ে বেশ আলোচনা ও মূল্যায়ণ দেখা গেলেও এবার তা তেমন একটা দেখা যায়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকেও প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম বা কর্মপরিকল্পনার কোনো সুনির্দ্দিষ্ট লক্ষ্য তুলে ধরা হয়নি। তবে সরকারের প্রথম ১০০ দিন পেরিয়ে আসায় এ সময়ের সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়ন হতেই পারে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে নতুন সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রী যে অভাবনীয় চমক দেখিয়েছেন, বিশেষত পুরনো বিতর্কিতদের মন্ত্রী পরিষদের বাইরে রেখে একঝাঁক নতুন মুখের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন, তাতে এই সরকারের কাজের ধারা কি হবে তার একটি ধারণাপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল বলে অনেকে মনে করেছিলেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতি বিরোধী কর্মতৎপরতা বাস্তবায়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নতুন সরকারে অর্ধেকের বেশী নতুন মুখের সমাবেশকে তারই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। 

পর পর তিন মেয়াদে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অনন্য কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। এ সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশকে অর্থনৈতিভাবে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে দাবী সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়নে সে বিষয়টিই মূখ্য বিবেচ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। পরিসংখ্যানগত প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন কোনো সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার একক মানদন্ড হতে পারে না। উন্নয়ন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকারের অবনমন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, জননিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বহুদলীয় গণতন্ত্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানমূলক রাজনীতি ইত্যাদি ইস্যুগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অপরপক্ষে, উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হার, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং আমদানি-রফতানি খাতে যে সব প্রতিক’ল বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে, নতুন সরকারের প্রথম একশ দিনে তার ইতিবাচক পরিবর্তনের কোনো আলামত দেখা যায়নি। উপরন্তু এ সময়ে সামাজিক অবক্ষয়, নিষ্ঠুরতা, অপমৃত্যু ও একের পর এক নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটে চলেছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দ্বারা নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ৪ সন্তানের জননীর ধর্ষিত হওয়া থেকে শুরু করে সোনাগাজীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা পর্যন্ত বেশ কিছু রোমহর্ষক ঘটনার সাথে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাকর্র্মীদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। এ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার হাল অবস্থা বোঝা যায়, যা মোটেও সুখকর নয়। সরকারের প্রথম মেয়াদ থেকে শুরু হওয়া গুম-খুন ও বিচারবর্হিভ’ত হত্যাকান্ডের পাশাপাশি মাদকের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়নে সরকারের সাফল্য খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মত ইস্যুগুলো আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এসব কারণে জনমনে যে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে তা দূর করার কোনো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকার যে প্রশ্নের সম্মুখীন, তা কেবলমাত্র অবকাঠামো উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে দূর করা যাবে না। সরকার তার প্রথম ১০০দিনে অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সেক্টরে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে। সিঙ্গেল ডিজিটের সুদহার বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের সংঘটিত আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার যে প্রতিশ্রুতি অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন মানুষ তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই নতুন মন্ত্রীসভার সদস্যদের কার্যক্রমের উপর নজর রাখার কথা বলেছিলেন। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন এবং জনগণের প্রত্যাশা পুরণ করতে হলে মন্ত্রী পরিষদ এবং বিভিন্ন প্রকল্পের সাথে জড়িতদের যথাযোগ্য দক্ষতা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে প্রধানমন্ত্রীকেই। উন্নয়ণের লক্ষ্য অর্জনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি সাফল্য-ব্যর্থতার আনুপুঙ্খ মূল্যায়ণ করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রকল্পের পরিচালকদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার মনোভাব তৈরী হতে পারে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক মনোভাব ও দিক নির্দেশনা থাকলেও সে সব নির্দেশনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে একদল সুযোগ্য মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রয়োজন। জনপ্রত্যাশা ও সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মন্ত্রীপরিষদ, আমলাতন্ত্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও দক্ষতার উপর নির্ভর করছে। রাজনৈতিক সমঝোতা ও সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজে নেমে পড়ার এখনি সময়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন