ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ভয়ঙ্কর গ্যাং কালচারে ডুবে যাচ্ছে তারুণ্য

| প্রকাশের সময় : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

বেশ কয়েকমাস ধরেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং কালচারের উপদ্রব সম্পর্কে সংবাদ ছাপা হচ্ছে। বরগুনায় নয়নবন্ডের নেতৃত্বে ০০৭ গ্রপের হাতে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের পর এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে সরব হতে দেখা যায়। শৈশব পেরিয়ে কৈশোর-তারুণ্যে প্রবেশের সময়টি সঠিকভাবে পার করার উপরই নির্ভর করে জাতির স্বপ্নময় সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ। এ সময় আবেগ-উদ্দীপনার, প্রাণোচ্ছাসে মাতিয়ে তোলবার। শিক্ষাঙ্গণের করিডোরে ফুটে উঠবে তাদের উদ্দীপনার আলো। এটাই যে কোনো সুসভ্য ও অগ্রসরমান জাতির প্রত্যাশা। আমরা যে সে প্রত্যাশা থেকে ক্রমে বিচ্চুত হয়ে পড়ছি। যদিও কিছু সংখ্যক কিশোর-তরুণের মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস ও অপরাধপ্রবণতার বাস্তবতাই বাংলাদেশের তারুণ্যের পূর্নাঙ্গ চিত্র নয়। লাখ লাখ কিশোর তরুণ শিক্ষাঙ্গণ ও বাড়ির চারদেয়ালের মধ্যে নিজেদের স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ নির্মানের নিরলস অধ্যাবসায়ে রয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। তবে কিছু সংখ্যক এবং ক্রমবর্ধমান হারে কিশোর-তরুনদের মাদকাসক্তি, গ্যাং কালচার এবং অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠার কারণ কি? এ থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা বা উত্তরণের পথই বা কি, তা আমাদের সমাজচিন্তক ও রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে। সামাজিক অবক্ষয় যে কোনো জাতির জন্য একটি বড় সংকট। আর তা যদি দেখা দেয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে তা যে কোনো সমাজের জন্য একটি অশনি সংকেত।

ঢাকা শহর থেকে প্রতিটি বিভাগীয়, জেলা ও মফস্বল শহর পর্যন্ত কিশোর-তরুণদের মাদকাসক্তি, স্কুল-কলেজের রাস্তা ও পাবলিক প্লেসে ইভ-টিজিং এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসে একেকটি আতংকের জনপদে পরিনত হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা এবং র‌্যাব-পুলিশের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গত কয়েক মাসে শুধুমাত্র ঢাকা মেট্টোপলিটান এলাকা থেকেই অন্তত কয়েক শত কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেককে কিশোর সংশোধনাগারেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়। এতকিছুর পরও খোদ ঢাকা শহরের অনেক স্থানে এখনো কিশোর-তরুণ গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়ে চলেছে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণের কোথায় কোথায় কার কার নেতৃত্বে গ্যাং গড়ে উঠেছে। এদের কারো কারো পৈতৃক পরিচয়সহ নাম ধাম জানা যাচ্ছে। কোনো গ্রপের নামের মধ্যেই ভয়ঙ্কর অপরাধ প্রবণতার পরিচয় পাওয়া যায়। পাশ্চাত্য স্টাইলের বিগ বস, পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েজ, এফএইচবি, বø্যাক রোজ, নাইন স্টার, ভাইপার ইত্যাদি নামের পাশাপাশি কোপাইয়া দে, লাড়া দে, দেখে ল, খাইয়ালামু প্রভৃতি এমন সব নামের শতাধিক গ্যাং গ্রপের অভয়ারণ্যে পরিনত হয়েছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তের জনপদ। উত্তরা থেকে মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ি, শ্যামপুর, শনির আখড়া -রায়েরবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত গ্যাং নেটওয়ার্কের উৎপাতে অতীষ্ট স্থানীয় জনসাধারণ। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ উদ্যোগ ও অভিযান দেখা গেলেও কোথাও কোথাও তাদের নিস্ক্রিয়তা ও দায়িত্বহীনতার চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে।

মাদকাসক্তি, খুন-ধর্ষণসহ অপরাধ বৃদ্ধি ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আলোচনা চলছেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও থেমে নেই। তবে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ ধরনের সামাজিক অবক্ষয় এবং কিশোর তরুণদের অপরাধ প্রবণ ও মাদকাসক্তির পেছনের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণগুলো আগে চিহ্নিত করে মূলে হাত দিতে হবে। দেশের কোটি কোটি মানুষ স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের অবাধ বিস্তারের হাত ধরে কিশোর-তরুণদের একটা অংশ পাশ্চাত্যের গ্যাং কালচার এবং মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এরা মোটর বাইক ও ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের প্রতি ঝুঁকছে। এসব সংঘবদ্ধ চক্রের অনেকেই ক্ষতাসীন দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। অতএব এসব গ্যাং সদস্যদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এটা নি:সন্দেহে একটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা। কোনো বিশেষ মন্ত্রনালয় বা বিভাগের উপর দায়িত্ব দিয়ে এ থেকে উত্তরণের পথ নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপকের মতে, শুধুমাত্র পুলিশ দিয়ে এ ধরনের অপরাধ দূর করা সম্ভব নয়। রাতারাতি তাদেরকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার মত প্রয়োজনীয় উপকরণও আমাদের নেই। গ্যাং কালচারসহ সামাজিক অপরাধ নির্মূল করতে হলে প্রথমেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি, কারিকুলাম এবং পরিবেশের দিকে নজর দিতে হবে। বিরক্তিকর কারিকুলামে শৈশব-কৈশোরের পুরোটা সময় ব্যয় করার বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। সেই সাথে সুষ্ঠু বিনোদন, স্কুল-কলেজে খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবারে পিতা-মাতা ও মুরুব্বীদের তাদের সন্তান ও পোষ্যদের উপর সচেতনভাবে নজরদারি ও খেয়াল রাখতে হবে। কিশোর গ্যাং কালচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাইবার এবং মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরো জোরদার করার পাশাপাশি এসব কিশোর তরুণদের পিতা-মাতা ও পৃষ্ঠপোষক বড়ভাইদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন