ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

পরিবার গঠনে আমরা ক্রমেই ব্যর্থ হচ্ছি

মোহাম্মদ শাহজালাল | প্রকাশের সময় : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের আগমনের একমাত্র মাধ্যম হলো পিতা মাতা। সন্তান জন্মদান, লালন পালনের আগেই নারী ও পুরুষকে বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে একটি পরিবার গঠন করতে হয়। পরিবার গঠন ছাড়া কোনো সন্তানের পরিচয় বহন করা সম্ভব হয় না। জীবনধারনের জন্য এই পারিবারিক প্রথা চলে আসছে সৃষ্টির আদি যুগ থেকে। স্বামী-স্ত্রী, এক বা একাধিক সন্তান নিয়ে একত্রে বসবাস করাকে সাধারণত পরিবার বলা হয়ে থাকে। সাধারণত পরিবারে দুই বা তিন পুরুষের একসাথে বসবাস হয়ে থাকে। দেশ ও জাতি, ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভেদে পরিবারের ধরণ একেক রকম হয়ে থাকে। কালক্রমে বদলে যাচ্ছে পরিবারের আকার আয়তন ও কাঠামো। মূলত পারিবারিক এই পরিবর্তন চলছে বিশ্বব্যাপী। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে গঠন হচ্ছে একক পরিবার।
পরিবার গঠন পদ্ধতি একেক দেশে একেক রকম হলেও পারিবারিক বন্ধন সব পরিবারে একই। পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গায় পুরুষ কর্তৃক পরিচালিত পরিবার লক্ষণীয় হলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় মাতৃতান্ত্রিক পরিবার গড়ে উঠেছে। পরিবার গঠন করার মূল লক্ষ্য থাকে পারস্পারিক সম্মান শ্রদ্ধা ভালবাসার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করা। ছোট বড়, নারী পুরুষ সবার অধিকার নিশ্চিত এবং জীবনমান উন্নয়নের জন্য তৈরি হয় পারিবারিক বন্ধন। একজনের সুখে অন্যরা সুখী, একজনের দুঃখে সবাই দুঃখী এই বন্ধন পাওয়া যায় শুধু পরিবার গঠনের মধ্যেই। অন্যান্য দেশের তুলনায় বিশেষ করে পাশ্চাত্য সভ্যতার তুলনায় আমাদের দেশের পারিবারিক বন্ধন অনেক সুদৃঢ়। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল পরিবারের মধ্যেই সম্প্রীতি আর ভালবাসা শ্রদ্ধাবোধ এখানে বিরাজমান।
একজন ব্যক্তির জন্য পরিবার হলো আদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক বা পারিপার্শিক শিক্ষা অর্জনের পূর্বে মানুষ তার প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করে পরিবার থেকে। আদব-কায়দা থেকে শুরু করে ব্যবহারিক জীবন, ধর্ম, সভ্যতা সংস্কৃতি সবকিছুরই শিক্ষা পেয়ে থাকে পরিবার থেকে। পরিবার হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলভিত্তি। সামাজিক স্থিতিশীলতা, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি যত্নবান, নারীর অগ্রযাত্রা, নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ, এগুলো মানুষের মন মস্তিস্কে প্রতিষ্ঠা লাভ করে মূলত সমাজ থেকেই। সুতরাং একজন শিশু থেকে সকল পর্যায়ের মানুষের জীবনে পরিবারের প্রভাব কিরূপ তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। এক কথায় বলতে গেলে একজন সুনাগরিক, একটি আদর্শ সমাজ বা রাষ্ট্রের মূল কারিগর হলো পরিবার।
সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনের বাইরে একজন মানুষের জীবনে পরিবারের প্রভাব কতটুকু তা আমরা আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি পর্যায়ে লক্ষ্য করে থাকি। পরিবার পিতৃপ্রধান হোক বা মাতৃপ্রধান হোক, সন্তান লালন পালন এবং গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উভয়ের প্রভাব ও ভুমিকা অনস্বীকার্য। নেপোলিয়ন বলেছেন, ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেবো।’ সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো পরিবারের সদস্যরা। পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে বা পরিবারকে উপেক্ষা করে কখনো ভাল কিছু করা যায় না। আমাদের দেশের চলমান অপরাধ কর্মের পেছনে দেখা যায় বেশির ভাগ অপরাধী তার পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে এ পথে পা বাড়িয়েছে।
আমাদের দেশের বর্তমান পারিবারিক চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পারিক সৌহার্দ্য এবং শ্রদ্ধাবোধ গাণিতিক হারে হ্রাস পাচ্ছে। সামাজিক সকল অবক্ষয়ের পেছনেই রয়েছে পারিবারিক অশান্তি এবং কলহ। অনেকেই পাশ্চাত্য সভ্যতার দাবিদার হয়ে পারিবারিক বন্ধন ভুলে উদাসীন জীবনযাপনকে বেছে নিচ্ছেন। ফলে এ ধরনের পরিবার থেকে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা থেকে শুরু করে নানাবিধ অপরাধ র্কমকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। অসৎ সঙ্গ গ্রহণ, আড্ডা , মাদকসেবনসহ নানা বাজে কাজে অর্থের জন্য অনেক সময় পরিাবারের সাথে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করতেও দেখা যায়। শুধু সন্তানের কাছে নয়, সমাজের কাছেও পিতামাতাকে হতে হচ্ছে অপমানিত, লাঞ্চিত। একক পরিবার গঠনের মানসিতা এখন অধিকাংশ মানুষই লালন করে। যার কারণে বড়দের প্রতি সম্মানবোধ এবং ছোটদের প্রতি স্নেহ, মায়া, মমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। পারিবারিক এই বন্ধন সুদৃঢ় না থাকায় এবং শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়াতে বাড়ছে হতাশা, মাদক, ইভটিজিং, বিবাহ বিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা। কিশোর অপরাধ মারাত্মক আকার ধারণ করার পেছনেও পারিবারিক এই দুরাবস্থা কম দায়ী নয়।
আদর্শ পরিবার গঠন এবং সুষ্ঠভাবে পরিচালনায় ব্যর্থতার বহুবিধ কারণ থাকলেও মূলত পরিবার গঠনে অনীহা আমাদের দেশ শুধু নয়, বিশ্বব্যাপী পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংসের অন্যতম কারণ। কিশোর বয়স থেকে শুরু করে বিবাহ উপযুক্ত ছেলে মেয়েদের অবাধ মেলামেশা, যৌনাচার, লিভ টুগেদার ইত্যাদির কারণে পুরুষ এবং নারী উভয়েরই বিবাহ এবং পারিবারিক জীবনের প্রতি দিন দিন অনীহা বাড়ছে। আয়ের উৎস নেই বলে পরিণত বয়সেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছে না হাজার হাজার তরুণ। যার কারণে এক সময় সে বেছে নিচ্ছে পর্ণোগ্রাফী থেকে শুরু করে অবাধ ও অনৈতিক যৌন সম্পর্ক যা পরিবার গঠনের অন্যতম অন্তরায়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে বিবাহ এবং পরিবার গঠনের জন্য নানাভাবে উৎসাহ মুলক কর্মসূচী পালন হচ্ছে সরকারীভাবে। অনুদান দেওয়া হচ্ছে সন্তান লালন পালনসহ সংসার জীবন গঠন করার জন্য।
যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গঠন হওয়ার প্রবণতার কারণেও তৈরি হচ্ছে পারিবারিক দুরাবস্থা। একক পরিবারের পিতামাতা অধিকাংশ সময় নিজেদের নানামুখী কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে সন্তানকে নিজেদের মত করে তৈরি করতে পারছেন না। নির্ভর করতে হচ্ছে কাজের লোক, ড্রাইভার, বা ভাড়াটে কোন ব্যক্তির উপর।
বিবাহ বিচ্ছেদ আমাদের দেশের সর্বত্র একটি মারাত্মক সমস্যা। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল সর্বত্রই জ্যামিতিক হাড়ে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ। বিবাহ বিচ্ছেদ সংশ্লিষ্ট সকল জরিপে দেখা যায় উচ্চ বিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা সবচেয় বেশী। এসকল পরিাবরের সন্তান বেড়ে উঠছে শুধু মা অথবা শুধু বাবার কাছে। যেকোন একজনের কাছে বেড়ে ওঠার কারণে সামাজিকভাবে যথাযোগ্য সম্মান নিয়ে চলতে পারে না।
সন্তানের সামনে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য বা ঝগড়া বর্তমান সময়ে খুবই লক্ষণীয়। সাংসারিক নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর দ্বিমত, আর্থিক অভাব অনটন, যৌতুকের মত জঘন্য দাবীকে সামনে নিয়েও অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী সন্তানের সামনে মনোমালিন্য, মারধর, ঝগড়া ইত্যাদির কারণে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর। মন মানসিকতা হয়ে উঠছে উগ্র প্রকৃতির।
ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি অধিক আকর্ষণ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং উদাসীনতার কারণে পারিবারিক ভাঙন বাড়ছে প্রতিনিয়ত। টিভি সিরিয়াল, নাটক সিনেমার মধ্য দিয়ে একধরনের যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠছে তার দীর্ঘমেয়াদী ফল ভোগ করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। এমনকি শুধু মাত্র সিরিয়াল বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে সংসার ভাঙ্গন এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হত্যা প্রবণতাও আমাদের সমাজে লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে।
একটি শিশু যখন তার বেড়ে ওঠার জন্য শুধুমাত্র পিতামাতা বা পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি থাকে তখনই দেখা যায় সন্তানকে খেলা করানো বা খাওয়ানোর ছলে তাকে মোবাইল ফোনে দেখানো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গান বাজনা, গেমস সহ নানা ভিডিওি। যার প্রভাবে শিশু সন্তানরা বেড়ে উঠছে তথ্য প্রযুক্তির এই অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এর বিরূপ প্রভাব তাকে পরবর্তী জীবনে নিয়ে যাচ্ছে শিশু অপরাধসহ নানা কুপথে। পরবর্তীতে এই সন্তানেরাই তাদের পিতামাতাকে গালমন্দ, অসাচরণ, এমনকি বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতেও সংকোচবোধ করছে না।
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরাই অন্তরে। সুতরাং একজন শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য একটি সুন্দর ও সুষ্ঠ পারিবারিক ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরী। একটি সুস্থ সংস্কৃতির অবয়বে এবং চিন্তাশীল একটি প্যারেন্টিং ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে আমাদের পারিবারিক প্রথার সুদৃঢ়করণ করতে পারলে আগামী প্রজন্মের জন্য হতে পারে একটি সুন্দর ও সুখী সমাজ, যা বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত জরুরী।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন