ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

স্বাস্থ্য

কনজেনিটাল বা জন্মগত হাইপোথায়রয়েডিজম

ডাঃ শাহজাদা সেলিম | প্রকাশের সময় : ১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৪৮ এএম

কনজেনিটাল বা জন্মগত হাইপোথায়রয়েডিজম বলতে থায়রয়েডের হরমোনজনিত সমস্যাকে বুঝায়, যা নবজাতকের জন্মের সময়ই উপস্থিত থাকে। জন্মের পর থেকে নবজাতকটি পর্যাপ্ত পরিমাণে থায়রয়েড হরমোন উৎপাদন করতে ব্যর্থ হয়। 

থায়রয়েড হরমোনের ঘাটতিতে অনেকগুলো সুস্পষ্ট এবং অনেকগুলো অস্পষ্ট শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে, নবজাতকের ক্ষেত্রে হাইপোথায়রয়েডিজমের লক্ষণ অন্য রকম হবেঃ দৈহিক বৃদ্ধি মন্থর হবে, নড়াচড়া ধীর স্থির হবে ইত্যাদি।
কারণ সমূহ:
১। থায়রয়েড গ্রন্থির অনুপস্থিতি
২। থায়রয়েড গ্রন্থির অ-স্থানে উপস্থিতি (এটি গলার সামনের এবং নীচের দিকে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি)। অন্য জাগায়
গ্রন্থিটি স্থাপিত থাকলে তা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে পারে না এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণে হরমোন উৎপাদনে ব্যর্থ হয়।
৩। থায়রয়েড গ্রন্থিটি অস্বাভাবিক ক্ষুদ্রাকার হলে।
৪। জীনগত ত্রুটিঃ বংশধারাগত ভাবে থায়রয়েড গ্রন্থির ত্রুটি থাকতে পারে। কনজেনিটাল হাইপোথায়রয়েডিজমের রোগীদের ১৫ শতাংশ এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে।
৫। মায়ের আয়োডিন ঘাটতি জনিত সমস্যাঃ গর্ভধারণ করার আগে থেকেই বা গর্ভকালীন সময়ে মা যদি আয়োডিনের ঘাটতিতে ভোগেন তবে, গর্ভস্থ শিশুটির থায়রয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি ব্যাহত হবেই। ফলশ্রুতিতে নবজাতকটি থায়রয়েডের হরমোনের ঘাটতিতে আক্রান্ত হবে।
৬। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের গৃহিত কিছু কিছু ওষুধ গর্ভস্থ শিশুটির থায়রয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হলো নবজাতকের হাইপোথায়রয়েডিজম।
নবজাতরেক হাইপোথায়রয়েডিজম যথা সময়ে এবং যথাযথভাবে চিকিৎসা করা না হলে পরিপূর্ণভাবে থায়রয়েডের হরমোনের ঘাটতিজনিত লক্ষণসমূহ দেখা যেতে পারে। জন্মগ্রহণের অব্যবহিত পরে নবজাতকটি মায়ের দেহ থেকে প্রাপ্ত থায়রয়েডের হরমোনের উৎসই ব্যবহার করতে থাকে। ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে নবজাতকটি নিজের থায়রয়েড গ্রন্থি থেকে অবশ্যই পর্যাপ্ত থায়রয়েড হরমোন উৎপাদন করতে হবে। যদি এতে ব্যর্থ হয়, তবে নবজাতকটির দেহে থায়রয়েড হরমোনের ঘাটতি জনিত লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকবে।
লক্ষণ সমূহ:
কিছু কিছু নবজাতকের দেহ কমলা রং এর হয়ে যায়। চোখের সাদা অংশ হলুদাভ লাগে। যাকে অনেক সময় জন্ডিস হিসেবে ধরা হয়।
অন্যান্য লক্ষণ সমূহ হলো-
শিশুর দৈহিক নড়াচড়া অস্বাভাবিক রকম কম হওয়া- অস্বাভাবিক রকমের বেশি সময় ধরে নবজাতকটি ঘুমাতে থাকা।
খাদ্য গ্রহণে অনাশক্তি বা শুষে দুধ খেতে না পারা।
খাদ্যনালির নড়াচড়া কমে যাওয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া।
মাংশপেশি খুবই নরম-শরম থাকা।
চোখের আশে-পাশে ফোলা ফোলা ভাব।
ফোলা বৃহদাকার জিহ্বা।
শীতল পাংশুটে ত্বক।
মাথার উপরের দিকে বড় ধরণের গর্ত।
পেট বড় হয়ে আসা ও বৃহদাকার নাভী দেখা যাওয়া।
যদি দ্রুত শিশুটিকে হাইপোথায়রয়েডিজমের চিকিৎসা করা না হয়, তবে ঃ নি¤œলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিবে-
হাবাগোবা মুখাবয়ব।
ঘন ঘন শ^াসকষ্ট।
ক্ষীণস্বরে কাঁদা, যা অনেক সময় বিড়ালের ডাকের মতো শোনা যেতে পারে।
দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে।
মোটা, ছোট হাত-পা হবে।
দৈহিক বৃদ্ধি কম হবে এবং হালকা পাতলা হবে।
গলগন্ড বা ঘ্যাগ দেখা দিবে।
রক্ত স্বল্পতা হবে।
হৃদ স্পন্দন ধীর হবে।
বধীরতা দেখা দিতে পারে।
ত্বকের নীচে তরল জমে ক্রমশ: ফাঁপা আকৃতির হতে পারে।

যে সব শিশু এর পরও চিকিৎসা পায় না, তাদের মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে থাকে। এদের শারীরিক নড়াচড়া অস্বাভাবিক হয়, কথা বলা শুরু করতে বেশি সময় লাগে এবং কারো কারো স্থায়ীভাবে মানসিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসা:
রোগ নির্ণয়-
উপরের লক্ষণগুলো কোন নবজাতকের দেহে থাকলে তার থায়রয়েডের হরমোনের পরীক্ষা করতে হবে। শুধু ঞঝঐ এর পরিমাণ দেখেই অনেক সময় চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে থায়রয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা দেখার জন্য অন্যান্য পরীক্ষা ও গ্রন্থির আকার, আয়তন, অবস্থান জেনে নেবার জন্য গলার আল্ট্রাসনোগ্রাম করাও জরুরী।
ওষুধপত্র:
থায়রক্সিন (খবাড় ঞযুৎড়ীরহব), যা ট্যাবলেট হিসেবে পাওয়া যায়, এটি প্রধানতম চিকিৎসা পদ্ধতি। নবজাতকের দৈহিক ওজন হিসাব করে হরমোন বিশেষজ্ঞ ট্যাবলেটটির পরিমাণ ঠিক করে দিবেন।
ফলোআপ:
সাধারণত দেড় থেকে দুই মাস পর পর ঞঝঐ পরিমাপ করে থায়রয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরিমাপের চেষ্টা করা হয়। তবে শিশুটির দৈহিক বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা, আচরণ স্বাভাবিক হয়েছে কিনা, মানসিক বৃদ্ধি সুসংহত হয়েছে কিনা, তা পরিমাপ করা অতিব জরুরী।
প্রতিরোধ:
বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহুদেশেই প্রায় দুই শতাংশ মহিলা হাইপোথায়রয়েডিজমে ভুগছে। এদের অনেকেরই আয়োডিনের ঘাটতিজনিত সমস্যা থাকতে পারে। যা গর্ভস্থ শিশুটির কনজেনিটাল হাইপোথায়রয়েডিজমের কারণ হতে পারে। আবার গর্ভকালীন সময়ে সেবনকৃত কিছু কিছু ওষুধও এর কারণ হতে পারে। সমস্যাটি যেহেতু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করছে, গর্ভবতী মহিলা, গর্ভস্থ শিশু পুরা পরিবার ও সমাজকে আক্রান্ত করছে, তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপকভিত্তিক কর্মকান্ড না নিয়ে কোন উপায় নেই।

সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা
মোবাঃ ০১৭৩১৯৫৬০৩৩, ০১৫৫২৪৬৮৩৭৭

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন