ঢাকা, বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বেড়ে চলেছে ধর্ষণ জড়িতরা অধরাই

ভালোবাসা কমে গেছে : অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক . অস্থিরতা ও রাজনীতিতে হিংসার বহিঃপ্রকাশে অপরাধ বাড়ে : নূর খান

সাখাওয়াত হোসেন | প্রকাশের সময় : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে খেলা থেকে তুলে নিয়ে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করেছে তার পরিবার। গতকাল শুক্রবার সকালে ওই শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের প্রথম মাসে ধর্ষণের শিকার হয়ে ২১১ জন নারী ও শিশু ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি হয়। যা গত বছর প্রথম মাসের তুলনায় দ্বিগুণ। তবে ধর্ষণের শিকার সবাই ওসিসিতে আসে না। পত্রিকা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি।

গত বুধবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ধর্ষণের শিকার ১০ নারী ও শিশুকে চিকিৎসাধীন পাওয়া যায়। যাদের ৯ জনের বয়সই ১০ থেকে ১৯ বছর। গত এক সপ্তাহে ঢাকায় ৮টি পৃথক গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮ কিশোরী। এসব ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত চার আসামিকে গ্রেফতার করেছে।
সমাজে অসামাজিক কার্যক্রম বেড়ে গেছে উল্লেখ করে লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে, বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে। সন্তানদের প্রতিও যতœ কমে গেছে। সর্বপরি ধর্ষণ বেড়ে গেছে, ভালোবাসা কমে গেছে।
গত ৫ জানুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী কুর্মিটোলা এলাকায় ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের শিকার ওই ছ্ত্রাী ওসিসিতে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ঘটনার পর ধর্ষকের বিচারের দাবিতে উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। প্রতিবাদকারীরা আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না। তারা এ ধরনের ঘটনার জন্য দোষারোপ করেন পুলিশ প্রশাসনের অবহেলা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে। এটাই ছিল ধর্ষণ নিয়ে এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিবাদের ঘটনা। কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হলে কিংবা ঘটনার নৃশংসতা ভয়াবহ হলে কেবল প্রতিবাদের ঘটনা বড়ভাবে দেখা যায়। এর বাইরে আর কোনো ঘটনায় বড় প্রতিবাদ দেখা যায়নি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, সমাজে অস্থিরতা, রাজনীতিতে হিংসার বহিঃপ্রকাশ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ যখন তৈরি হয়, তখন এধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। আমাদের মধ্যে বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে, এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যাওয়া সেটিরই প্রতিফলন। এ পরিস্থিতিতে নানা অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, যে সংখ্যাটা আমরা বলছি, সেটা প্রকৃত সংখ্যা না, প্রকৃত সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এ বিষয়ে করণীয় উল্লেখ করতে গিয়ে নূর খান লিটন বলেন, আইনের শাসন কায়েম করা প্রথম এবং শেষ কাজ। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে এবং জনগণকে সচেতন করে তুলে এ পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মাসওয়ারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর মোট ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ছিল ৩২৭টি। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ নারী ও মেয়েশিশুকে। ৯টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র এমন প্রতিবেদন তৈরি করে।
আসকের উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, ধর্ষণ ঠেকাতে দ্রæত বিচার ও শাস্তি দৃশ্যমান করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সরকারকে আরও আন্তরিক হতে হবে। এ জন্য সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি।
গত ১২ ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী এসেছে ঢাকা মেডিক্যালের ওসিসিতে। এই সংখ্যা ১১৫। এদের ৭৪ জন ভর্তি হয়েছে জানুয়ারিতে। তাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ৪৬ জন। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ৫০-এর নিচে।
ঢাকা মেডিক্যাল ওসিসির সমন্বয়ক বিলকিস বেগম সাংবাদিকদের জানান, ধর্ষণের শিকার হয়ে কিশোরীরাই মূলত ওসিসিতে আসছে। বেশির ভাগই পরিচিত, নিকট স্বজন এবং প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ধর্ষণের শিকার হয়। কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ধামরাই, সাভার, গাজীপুর এলাকা থেকে ভুক্তভোগী বেশি আসে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে খেলা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষিত সাত বছরের শিশুকে গতকাল দুপুর ২টার দিকে জন্য ঢাকা মেডিক্যালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। এর আগে সকালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
শিশুটির মা-বাবার অভিযোগ, তারা ওই এলাকার একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ভাড়া থাকেন। সকালে শিশুটির বাবা বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। আর মা রান্না ঘরে কাজ করছিলেন। এসময় শিশুটি দু’তলাতেই খেলাধুলা করছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে দ্বিতীয় তলায় তাদের পাশের বাসায় গেলে ওইখানের এক কিশোর তাকে ফাঁকা বাসায় নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে শিশুটি বাসায় ফিরে বাথরুমে যায়। তখন কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বাথরুমে শিশুটিকে দেখতে যায় তার মা। এবং দেখেন শিশুটির রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তখন জিজ্ঞেস করলে ঘটনা বলে সে। এরপর তার পরিবার দ্রæত তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে।
অভিযোগে শিশুটির পরিবার জানায়, তাদের পাশের বাসায় নানা-নানির সঙ্গে থাকে ১৭ বছরের এক কিশোর। তাকে সবাই মার্বেল বলে ডাকে। সে ছেলেই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া বলেন, শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে আসা হয়েছে। চিকিৎসকরা তাকে ওসিসিতে ভর্তি করেছেন। বিষয়টি দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মোহাম্মদপুর থানায় জানানো হয়েছে।
গত ৭ ফেব্রæয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সামাদনগর এলাকায় সন্ধ্যা ৭টার দিকে গার্মেন্টেসের কাজ শেষে বাসায় ফিরছিল ১৫ বছরের এক কিশোরী। তখন চার ব্যক্তি অস্ত্রের মুখে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে সামাদনগর কবরস্থানের কাছে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে গণধর্ষণ করেন। এ ঘটনায় ওই কিশোরীর খালা বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। পুলিশ এখন পর্যন্ত জাকির হোসেন (২২) নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে। পলাতক তিন আসামি হলো-যাত্রাবাড়ীর সামাদনগর এলাকার শান্ত (২৪), কাজলা এলাকার শাকিল আহম্মেদ (২৫) ও মো. হানিফ (২৭)।
গত ফেব্রæয়ারি রাত একটা থেকে ভোররাত পর্যন্ত বাড্ডার একটি গোডাউনে দুই কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। এদের বয়স ১৩ ও ১৪। ওসিসিতে চিকিৎসা শেষে এখন তাদের পরামর্শসেবা দেয়া হচ্ছে। এক কিশোরীর স্বজন জানান, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলে। তখন রাত হয়ে গেলে রাস্তা দেখানোর কথা বলে দুই কিশোরীকে বাড্ডার ডিআইটি রোডের গোডাউনে নিয়ে গণধর্ষণ করে তিন লোক। তিন আসামির মধ্যে পুলিশ ইমন নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন