ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭, ২৯ মুহাররম ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

অর্থনীতির সঙ্কট এবং সম্ভাবনার নানা দিক

মো. আশিকুর রহমান | প্রকাশের সময় : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

বিশ্বায়নের এই তুমুল প্রতিযোগিতার যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর গবেষণায় পৃথিবী বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পুরো বিশ্ব রাজনীতির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অস্ত্র এবং বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বণিজ্যযুদ্ধ, ইরান সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের নানা অস্থিরতা, পুঁজিবাদী শক্তির আগ্রাসন, প্যারিসের জলবায়ু চুক্তিসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অবাধ বিস্তার পুরো বিশ্ব অর্থনীতির মোড় পরিবর্তন করছে, যার প্রভাব এশিয়াসহ পুরো পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্যভাবে পড়ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের উত্থান বিশ্ব বাণিজ্যের মেরুকরণে অনেক চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। তবুও স্বল্প ভূমি আর মাত্রাতিরিক্ত জনগণের এই দেশ হাজারো সমস্যাকে মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নত বিশ্বে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে। তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা ঝেড়ে ফেলে অনেক দূর এগিয়েছে দেশটি, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। আয় বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। নারীর ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
মানবসম্পদ ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের সূচেকে ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ছে। পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, মেট্রোরেল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দরিদ্র হৃাসকরণ, তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করেছে। দরিদ্র দেশ হিসেবে বিশ^ব্যাপী বাংলাদেশের যে পরিচয় একসময় ছিল সেই পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নত হয়েছে গত কয়েক দশকে। যে স্বাধীন বাংলাদেশের মাত্র কয়েক কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই দেশের বাজেট আজ পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ছোট্ট অর্থনীতির দেশটি আজ পরিচিতি পেয়েছে এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি’ হিসেবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশে্বর বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে, যার বর্তমান অবস্থান ৪১তম। এক দশক ধরে বাংলাদেশ গড়ে ৬.৩ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এশিয়া-প্যাসিপিক অঞ্চলের ৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। এর নেপথ্যে কারণ হলো অভ্যন্তরীণ ভোগ চাহিদা, সরকারি ব্যয়, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অপার সম্ভাবনাময়।
এ আশাবাদ তখনই কার্যকর হবে, যখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বস্তুত, একটি দেশ সর্বস্তরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হলে, তাকে ভালো অর্থনীতির দেশ বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ধনী-গরীবের বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। ধনীদের সম্পদ ক্রমেই বাড়ছে, আর গরিব হচ্ছে আরোও গরিব। এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে হলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এসব মানুষের খাদ্য জোগাতে ও কর্মক্ষম মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেতে সরকারকে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। জাতীয় বাজেটে বর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সরাসরিই পড়ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় প্রতিবছরই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে হয়, যা সরকারের রাজস্ব নীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
একটি দেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে তার আর্থিক ও বিশেষ খাতের উপরে। কিন্তু গত এক দশকে আর্থিক খাতে পিছিয়েছে বাংলাদেশ। সোনালি ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারি দিয়ে শুরু, এরপর বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট গ্রুপ কেলেঙ্কারি এবং শেষে ফারমার্স ব্যাংকের ঘটনার কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এক দশকের এসব কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রকৃত আত্মসাৎকৃত টাকার হিসাব না পেলেও ধারণা করা হয়, ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কেবল ব্যাংক নয়, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও কেলেঙ্কারির অনেক ঘটনা ঘটেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি এবং আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। খেলাপি ঋণের পরিমান কমাতে সরকার নানাবিধ উদ্যেগ নিলেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয় ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এবং ঋণ আদায়ের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখানো হয়। তাই ব্যাংকগুলোকে যদি রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা না যায় তাহলে এ সমস্যার সমাধান খুব সহজ হবে না। এছাড়া বিশ^ব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যেটি কারোরই অজানা নয়। রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ৮১০ কোটি টাকা চুরি হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত পুরো ফেরত পাওয়া যায়নি, যেটি অর্থনীতির জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার নেপথ্যে শেয়ারবাজার বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর বর্তমান শেয়ারবাজার সবচেয়ে সঙ্গিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এর বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। যা ১৩ জানুয়ারি ২০২০ এ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। শেয়ারবাজারের এই ‘অস্বাভাবিক’ দরপতনের ফলে বিনোয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে দেউলিয়া হয়ে পথে বসছে কেউবা আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিক বাজারে সুশাসনের অভাব ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের ফলে এমন নেক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। বর্তমান শেয়ারবাজার অনেকটা মকড়সার জালের মত, যা ছোট ছোট পতঙ্গদের ফাঁদে ফেলছে, কিন্তু বড় পোকাদের ঠেকাতে পারছে না। একটি দেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা যখন এমন; নিঃসন্দেহে এটি অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। সুতরাং এখানে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণসহ বিএসইসি’কে আরোও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রপ্তানি খাত। এদেশের প্রায় ৮৩ শতাংশ রপ্তানি আয় তৈরি পোশাক থেকে অর্জিত হওয়ায় আমাদের রপ্তানি মোটামুটি এটির ওপরই নির্ভরশীল। এছাড়া বর্তমান তৈরি পোশাক শিল্প বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও বৈশি্বক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চীন ও ভিয়েতনাম বিশ্ব বাজারে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কাজেই রপ্তানির বৈচিত্র্যকরণ এবং বাজারের বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অক্সিজেনের মতো গুরুত্ব বহন করা খাতটি হলো রেমিট্যান্স। আমদের বেশিরভাগ রেমিটেন্স যেহেতু মধ্যপ্রচ্যের দেশ থেকে আসে সেক্ষেত্রে নয়া একটি চ্যালেঞ্জের আবির্ভাব হয়েছে। কারণ বিশ^বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের জালে আড়ষ্ট হয়ে তাদের অর্থনীতি বহুমুখি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া মধ্য এশিয়ার দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সম্ভামনাময় রাষ্ট্রে শ্রমিকের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। তাই আমাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠিকে দক্ষ করে গড়ে তুলে এই সুযোগটির যথাপোযুক্ত কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতি আরোও বেগবান হবে। কিন্তু সমস্যা হলো আজকের রাজনীতিবিদ্গণ অর্থনৈতিক সমস্যার অর্থনৈতিক সমাধান না করে রাজনৈতিক সমাধান দিতে চান আর রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না করে অর্থনৈতিক সমাধান দিতে চান।
অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বেসরকারী খাত। কিন্তু এ খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে ২০-২২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে যে হারে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, সেই হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। বাংলাদেশে অর্থনীতি দ্রুত বিকাশ লাভ করলেও সহজ ব্যবসার সূচকে অনেক পিছিয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার সূচকে এবার ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আর্থিক খাতের সুশাসন ব্যাহত করছে। সবকিছু মিলিয়ে উদ্যোক্তারা দেশে নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এক্ষেত্রে আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সার্বিক ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার কোন বিকল্প নেই। তবে আশার কথা হলো, ব্যবসা সহজীকরণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন