ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

মৃত্যুফাঁদে বসবাস

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর : পুরান ঢাকায় অর্ধকোটি মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০৭ এএম

রাজধানীতে সাড়ে ১২ লাখ ভবন ঝুঁঁকিতে রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার 

রাজধানী ঢাকার বয়স ৪০০ বছর। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে উঠা পুরান ঢাকার অলিগলিতে শত শত বিল্ডিংয়ের বয়স ২০০ থেকে ৩০০ বছর। ছয়টি সংসদীয় আসন (এর মধ্যে দুটি আসনের আংশিক) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অর্ধেক এলাকা জুড়ে বিস্তৃত পুরান ঢাকায় অর্ধকোটি লোকের বসবাস। এর মধ্যে তিনটি সংসদীয় আসনের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অসংখ্য ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। 

‘বইপাড়া’ হিসেবে পরিচিত বাংলা বাজার, বংশাল থানা এলাকার আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, ওয়ারির টিপু সুলতান রোড, লালবাগ থানা এলাকার শহীদনগর ও ইসলামবাগ এবং চকবাজার থানা এলাকায় ৪০০ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের অধিকাংশতেই গিøসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোজ, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোপাইল, টলুইনের মতো দাহ্য পদার্থ। এমনিতেই অননুমোদিত মান্ধাতার আমলের জরজীর্ণ ভবন; সেখানে কেমিক্যাল গোডাউন, প্লাস্টিক কারখানা। প্রতিমুহূর্তে মহাদুর্ঘটনার শঙ্কা। এই মৃত্যুফাঁদেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ।
২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাÐে ঝরে গেছে ১২০ প্রাণ। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাÐের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছিল। গতকাল পেরুলো চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর। গত বছরের ২০ ফেব্রæয়ারি চুড়িহাট্টার ‘ওয়াহেদ ম্যানশন’ অগ্নিকাÐে ঝরে যায় ৭১টি তাজা প্রাণ।
নিমতলী থেকে চকবাজার ট্র্যাজেডি। এর বাইরেও প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি ও কেমিক্যালের আগুনে বার বার পুড়েছে পুরান ঢাকা। ঝরে যাচ্ছে তাজাপ্রাণ। প্রতিটি অগ্নিকাÐের পরপরই পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন ও অবৈধ কারখানা সরানোর ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। কার্যত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণে প্রশাসনের সেসব উদ্যোগ ভাটা পড়েছে। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েই যাচ্ছে।
গত ১০ বছরেও নিমতলী এলাকার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বসবাসরত মানুষের জীবনকে ঝুঁকিমুক্ত করতে কোনো পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি। ঝুঁঁকিপূর্ণ চিহ্নিত হওয়ার পর কয়েক দফা অভিযান চালিয়েও পুরান ঢাকা থেকে এসব অবৈধভাবে গড়ে উঠা কেমিক্যাল গোডাউন অপসারণ করা হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তার মতে, এসব কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ শতাংশই অনুমোদনহীন। অগ্নিদুর্ঘটনার বড় ধরনের ঝুঁঁকি তৈরি করছে এসব গোডাউন।
গতকালও চকবাজারে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এক বছর আগে আগুনে পোড়া চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশনটি এখনো পোড়া ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ভাঙা দেয়াল কালসিটে দাগ দেখলেই মনে হয় যেন এক ভ‚তুড়ে বাড়ি। ট্র্যাজেডির বছর পূর্তিতে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে টানানো হয়েছে ব্যানার। আগুনে ভবনের প্রায় পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সংস্কার করা হয়েছে কেবলমাত্র নিচতলা।
রাজধানী ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা কত তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। ২০১৪ সালের ১৫ জুন জাতীয় সংসদে সে সময়ের র্গহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন জানান, রাজউক রাজধানীতে মাত্র ৩২১টি ভবন ভয়াবহ ঝুঁঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাজউক সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীর ৫৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শহরেই আছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ভবন। আর হ্যারিটেজ বা ঐতিহ্যবাহী ভবন আছে ২২৯টি। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ৩২১টি।
রাজউকের ওই তালিকায় ৩২১টি ঝুঁঁকিপূর্ণ ভবনের বেশিরভাগই পুরান ঢাকায়। সুত্রাপুরে ১৪৬টি, কোতোয়ালিতে ১২৬টি ও লালবাগে ২৮টি ভবন রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে ৬টি, ডেমরায় ৩টি, মিরপুরে ৭টি, রমনায় ১টি, তেজগাঁওয়ে ১টি, মতিঝিলে ২টি ও ধানমন্ডিতে ১টি ঝুঁঁকিপূর্ণ ভবন আছে।
তবে প্রায় ৭০ হাজার ভবন ঝুঁঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। ভ‚গর্ভস্থ নরম মাটি, বিল্ডিং কোড না মানা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ নানা কারণে ঝুঁঁকিপূর্ণ থাকা এসব ভবন চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়া হলেও অপসারণের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা জানান, পুরান ঢাকার শুধু শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, টিপু সুলতান রোড, নারিন্দা, নবাবপুর রোড, লালবাগ, চকবাজার, সুত্রাপুর এলাকায় জরাজীর্ণ, ঝুঁঁকিপূর্ণ, পরিত্যক্ত ভবন রয়েছে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি। ভবনগুলোতে এখনো বসবাস করছে লাখ লাখ মানুষ।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ডিএসসিসি জিওডেসেক কনসালট্যান্টস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নামে এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তালিকা করে পুরান ঢাকার ৫৭৩টি ভবনকে ঝুঁঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৪৫টিকে অধিক ঝুঁঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়। যার মধ্যে ২১টি হাজারীবাগে, ৭৩টি লালবাগে ও ৯১টি শাঁখারীবাজারে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে পুরান ঢাকার ২০০-২৫০ বছরের পুরনো ভবনের সংখ্যা পঁচিশটিরও বেশি রয়েছে।
সত্যিই যেন পুরান ঢাকা মৃত্যু উপত্যাকা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে অর্ধকোটি মানুষ। যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ যেতে পারে এটা বুঝেও ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছে মানুষ বছরের পর বছর যুগের পর যুগ ধরে। অনুসন্ধান করে এবং খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, পুরান ঢাকার ১০টি থানা এলাকাজুড়ে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ২৫ হাজার কল-কারখানা ও গুদাম রয়েছে।
এলাকার অলিগলি সরু হওয়ায় ৭০ ভাগ বাড়িঘরে অ্যাম্বুলেন্স এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। অলিগলির মুখে এবং বাসার গেটের সামনেই বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকে বৈদ্যুতিক তার। জনবহুল রাস্তার মাঝেই খোলা আছে জোড়াতালির বিদ্যুৎ সংযোগ, ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। এমন হাজারো বিপদ যেন পদে পদে। ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করা হয়েছে সাভারে। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি হাজারীবাগ এলাকার।
এখনো হাজারীবাগের ট্যানারির বিষাক্ত পরিবেশের সাথে রয়েছে ঝুঁঁকিপূর্ণ দুই সহস্রাধিক বাড়িতে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষ। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সীমাহীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আবার প্রায় দু’পাশ ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা নদী এখন বিষাক্ত কেমিক্যালের ভাগাড়। হাজারীবাগ ও লালবাগের ট্যানারির কঠিন ও তরল বর্জ্যেরে দূষণে ওই বিস্তীর্ণ এলাকাসহ সমগ্র অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে।
পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় হাজার হাজার মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত। বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাসের প্রভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে নিত্যব্যবহার্য আসবাবপত্র। কাঁসা, পিতল, অ্যালুমিনিয়াম এমনকি অলঙ্কারও ক্ষয়ে যাচ্ছে দিন দিন। হাজারীবাগ এলাকার টিনের ঘরের বেড়া, চালাগুলো অসংখ্য ছিদ্র ও বিবর্ণ হয়ে আছে।
গতকাল চকবাজারের ওয়াহেদ ম্যানশনের আশেপাশে চুড়িহাট্টা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরো এলাকাজুড়ে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল এবং কেমিক্যাল গোডাউন। সরু গলিপথের দোকানে দোকানে প্রকাশ্যে প্লাস্টিক সমাগ্রী বিক্রি হচ্ছে। চুড়িহাট্টাবাসী যেন ভুলতেই বসেছে এক বছর আগে ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্মৃতি।
পুরান ঢাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ আবাসিক ভবনগুলোর নিচতলার সামনের অংশের দোকানগুলোতে প্লাস্টিক কাঁচামালের দানা, বিভিন্ন কেমিক্যালের বিক্রির দোকান। কোনো কোনো ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থাৎ পার্কিং প্লেসে রয়েছে সেসব মরণঘাতি কেমিক্যালের গোডাউন। আগের মতো কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার ছাড়াই কর্মীরা সেগুলো ভেতরে-বাইরে আনা নেওয়া করছেন। বিভিন্ন গাড়ি থেকে মালামাল উঠানামা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রশাসনের উদাসীনতায় স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের স্বার্থেই ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল, প্লাস্টিক কাঁচামাল এখান থেকে সরানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের ঘর ভাড়া দেওয়া হলে জামানত এবং মোটা অঙ্কের মাসিক ভাড়া পাওয়া যায়। কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় তার অর্ধেক পরিমাণও আবাসিক ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। ফলে কেমিক্যালের ঝুঁঁকির বিষয়টি জেনেও বাড়ির মালিকরা ব্যবসায়ীদের ঘর ভাড়া দেন।
ওয়াহেদ ম্যানশনের আগুনে নিহত ওয়াসির উদ্দীনের বাবা বৃদ্ধ নাসির উদ্দীন জানান, তিনি মৃত ছেলের স্মৃতি হিসেবে নাতি-নাতনিদের নিয়েই বেঁচে আছেন। চকবাজারের বাসিন্দা আকরাম বলেন, সবাই জানে বাড়িগুলোতে কেমিক্যাল গোডাউন বিপদজনক। তারপরও বাড়ির মালিকরা জায়গা দেয়। কারণ একটাই, বেশি ভাড়া।
ঢাকা বার এসোসিয়েশনের সদস্য অ্যাডভোকেট মু. মিজানুর রহমান বলেন, আমি প্রতিদিন রিকশায় কোর্টে যাই। যখন যাই তখন মনে হয় এখনই বিল্ডিং ভেড়ে পড়লো। এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটলো। কিন্তু প্রশাসনের কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই চলাফেরা করতে হচ্ছে।

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
** হতদরিদ্র দীনমজুর কহে ** ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:৪৩ পিএম says : 0
এই মরন ফাদ থেকে বাচাঁন!
Total Reply(0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন