ঢাকা, বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

আমিরাতে এক বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত

সতর্ক বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০৩ এএম

চীনের মূল ভ‚খন্ডের সীমান অতিক্রম করে নতুন করোনাভাইরাস ইতোমধ্যে ছড়িয়েছে পড়েছে ২৯ দেশে। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে সাড়ে ৭৭ হাজারে। বিশ্বে এ ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৬০ জনে। যাদের মধ্যে ১৫ জন ছাড়া বাকি সবা মৃত্যু ঘটেছে চীনে। বাংলাদেশে এখনো এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোন রোগী পাওয়া যায়নি। উহান ফেরত ৩১২ জন ভাল আছে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।
ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চীনের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার দেশটির মূল ভূখন্ডে ৩৯৭ জনের শরীরে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ৮৮৯ জন। সব মিলিয়ে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ২৮৮ জনে। আর ২৯টি দেশ ও তিনটি অঞ্চল মিলিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৭ হাজার ৭৬৭ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সাউথ চায়না মরনিং পোস্ট। শুক্রবার চীনে মোট ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হুবেই প্রদেশেই মারা গেছেন ১০৬ জন। এতে চীনের মূল ভ‚খন্ডে মৃতুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৩৪৫ জনে। চীনের মূল ভখন্ডের বাইরে এ পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এ ভাইরাসে। তাদের মধ্যে ইরানে চারজন, জাপানে তিনজন, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দুজন করে এবং ফিলিপিন্স, ফ্রান্স, তাইওয়ান ও ইতালিতে একজন করে আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকং, ম্যাকাওয়, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্রে এ ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রথমদিকে নতুন করোনাভাইরাসের প্রকোপ চীনের মধ্যেই ছিল বেশি। কিন্তু গত কয়েক দিনে চীনের বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দ্রুত বাড়ছে নতুন রোগীর সংখ্যা। রয়টার্স জানিয়েছে, এ রোগ যাতে অন্যান্য দেশে মহামারি আকার না নেয় সেজন্য এখনই সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস। তার মতে, এখনও এই ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে যত সময় যাচ্ছে, সুযোগ ততই কমে আসছে। যদি আমরা ঠিকভাবে কাজ করি তাহলে গুরুতর সংকট এড়াতে পারব। তবে আমরা যদি সুযোগগুলো নষ্ট করি তাহলে আমাদের সামনে ভয়াবহ বিপদ।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি : আইইডিসিআর-এর ভাইরোলজি ল্যাবরেটরিতে সন্দেহজনক (ঈঙঠওউ-১৯) আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা করে এ যাবত কারো নমুনাতে এই ভাইরাস পাওয়া যায় নি। উহান ফেরত ৩১২ জন যাত্রীদের কোয়ারেন্টিন পরবর্তি আরো ১০ দিন ৩১২ জনকে সীমিত চলাচল ও নিজেদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অবহিত করতে আইইডিসিআর-এর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাদের প্রতি নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ হটলাইনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছেন। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকেও তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। তারা সবাই সুস্থ আছেন। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে, মোট ৫ জন বাংলাদেশের নাগরিক ঈঙঠওউ-১৯ সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে ১ জন আইসিইউ-তে আছেন। কোয়ারেন্টিনে আছেন ৫ জন বাংলাদেশের নাগরিক।
আমিরাতে এক বাংলাদেশি আক্রান্ত : সংযুক্ত আরব আমিরাতে আরও দুইজনের শরীরে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। যাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি। আমিরাতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে গালফ নিউজ শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়। সব মিলিয়ে দেশটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১১ জনে। গালফ নিউজ লিখেছে, নতুন দুই রোগীর মধ্যে একজন ৩৪ বছর বয়সী একজন ফিলিপিনো এবং অন্যজন ৩৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্বাস্থ্য রেগুলেশনস বিভাগের প্রধান ডা. ফাতিমা আল-আত্তারকে উদ্ধৃত করে আল-আরাবিয়া লিখেছে, যাদের মধ্যে নতুন করোনাভাইরাস ধরা পড়ছে, তাদের সবাইকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত তাদের সবাইকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
সতর্ক বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো : করোনাভাইরাস আতঙ্কে পুরো বিশ্বের সাথে বাংলাদেশও অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। দেশে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেও সতর্কতা অবলম্ব^ন করতে বলা হয়েছে। বিদেশিদের বাংলাদেশের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ করে সম্প্রতি চীন থেকে ফিরেছেন এমন ব্যক্তিদের ভিসা দেয়া থেকে বিরত থাকছে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো। দূতাবাসের কার্যক্রম ঠিক রেখে নিজেদের যতটা সম্ভব নিরাপদ রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। তাদেরকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে চীন, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ যেসব দেশে ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে সেসব দেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে এসব নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে বলা হয়েছে। চীনে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, স্বাভাবিকভাবেই আমরা এখানে এক ধরনের ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। তবে এ ভাইরাস প্রতিরোধে চীন সরকারের সব ধরনের নির্দেশনা আমরা মেনে চলছি। পাশাপাশি বাংলাদেশি কমিউনিটিকেও একই পরামর্শ মেনে চলতে অনুরোধ করে যাচ্ছি।
বিল গেটসের অনুদানের প্রশংসায় শি : প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সংস্থা ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’ এর অনুদানের প্রশংসা করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ১০ কোটি মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল বিল গেটসের সংস্থাটি। জবাবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের এমন আর্থিক অনুদানের কাজের গভীর প্রশংসা করছি। চীনের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনাদের এমন চিঠি, এদেশের জনগণের সঙ্গে আপনাদের সংহতির বহি:প্রকাশ। বিল গেটসের পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন, তারা চীনকে ১০ কোটি ইউএস ডলার দিতে চায় বিল গেটস। নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত করা, বিস্তার ঠেকানো, চিকিৎসা, ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের সহায়তা এবং এর ওষুধ উদ্ভাবন ও চিকিৎসার উন্নয়নে ওই অর্থ ব্যয় করা হবে। চীনে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের প্রতি সহানুভ‚তি দেখিয়ে জনসাধারণের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে তারা। বিল গেটসের চিঠির জবাবে শি জিনপিং বলেছেন, ‘চীনের কোভিড-১৯ এর প্রদুর্ভাব শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় একতা, বিজ্ঞান ভিত্তিক পদ্ধতিসহ এ থেকে পরিত্রাণের প্রয়োজনীয় বিষয়ে নির্দেশনা পাঠানোর জন্য আহবান করেছিলাম। আমরা গোটা জাতিকে এই মহামারির বিরুদ্ধে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছি।
অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব শুরু হতে পারে : শুধু করোনাভাইরাসের জন্য নয়, দীর্ঘ মেয়াদে প্রস্তুতি নিতে হবে অন্য ভাইরাসের জন্যেও। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগামী কয়েক বছরে আরো কি কি ভাইরাস আসতে পারে তা নিয়ে এখনই কাজ করতে হবে সরকারকে। তবে বর্তমানে চীনে করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব শুরু হতে পারে। চীনে করোনা ভাইরাস দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ নিজেদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিবে। বাংলাদেশকেও সেকারণে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। গতকাল শনিবার ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র আয়োজিত রাজধানীর এফডিসিতে অনুষ্ঠিত এক ছায়া সংসদ বিতর্ক অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে পোশাক শিল্প ১০ থেকে ২০ বছর থাকবে। উন্নত দেশগুলোতেও পোষাক প্রতিযোগিতামূলক দামে উৎপাদন করার মতো ক্ষমতায় চলে আসছে। কারিগরি পরিবর্তনের ফলে পোষাক শিল্পের প্রভাব বাংলাদেশ থেকে আস্তে আস্তে কমে যাবে। তাই পোষাক শিল্পের ভবিষৎ নিয়ে আমাদের সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। এ ধরণের ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারকে একটা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
বিস্তার ঠেকানোর সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে: বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের সঙ্গে চীনের দৃশ্যমান কোনও সংযোগ না থাকার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ড. তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস। তিনি বলেছেন, ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এখবর জানিয়েছে। ড. তেদ্রোস বলেছেন, চীনের বাইরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যা কম। কিন্তু যেভাবে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে তা উদ্বেগজনক। চীনে ভ্রমণ বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মতো স্পষ্ট মহামারীর সংযোগ না থাকার কারণে বিভিন্ন দেশে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। ইরানে মৃত্যু ও নতুন আক্রান্ত শনাক্ত হওয়া খুব উদ্বগজনক বলে উলে¬খ করেছেন স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান। তিনি মনে করেন, চীনসহ অপর দেশগুলো যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে এখনও ভাইরাসটির আরও বেশি ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর সুযোগ রয়েছে। তিনি সম্ভাব্য মহামারী ঠেকাতে আরও বেশি প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।#

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন