সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯, ১৪ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

মহানগর

‘ক্রসফায়ারে’ নবী-রাশেদ মূল হোতা মুছা কোথায়?

প্রকাশের সময় : ১০ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

 

রফিকুল ইসলাম সেলিম : পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মিশনে অংশ নেয়া নূর নবী ও নূরুল ইসলাম ওরফে রাশেদ ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার পর মূল হোতা কামরুল শিকদার ওরফে আবু মুছার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ রাশেদ ও নূর নবীর পরিবারের মতো মুছার পরিবারও দাবি করেছে মুছা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। নবীকে দিয়ে ফাঁদ পেতে ২২ জুন মুছাকে নগরীর বন্দর এলাকার বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশÑ এমন অভিযোগ করে তাকে আদালতে হাজির করার দাবিও জানিয়েছেন মুছার স্ত্রী।
স্ত্রী পান্নার অভিযোগ, মুছাকে ধরার পর আরো কয়েকজন আসামিসহ তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাবুল আক্তারের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাদের। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অন্যদের চট্টগ্রাম ফিরিয়ে আনা হলেও মুছাকে ফিরিয়ে আনা হয়নি। সে ঢাকায় না চট্টগ্রামে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে সে বিষয়টিও জানেন না বলে অভিযোগ করেন পান্না। তবে এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) শীর্ষ কর্মকর্তারা। যেমনটি তারা নবী ও রাশেদের ক্ষেত্রেও অস্বীকার করেছিলেন।
তাদের গ্রেফতার করা হয়নি, এমন দাবির মধ্যেই ঈদের ২ দিন আগে পুলিশ স্বীকার করল তাদের ধরতে গিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়েছে। আর তাতে ‘ক্রসফায়ারে’ পড়ে মারা গেছে নবী ও রাশেদ। ওই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিন উপ-পরিদর্শক আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন মিতু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার (দক্ষিণ) মো: কামরুজ্জামান। পুলিশের দাবি মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টায় রাঙ্গুনিয়ার উপজেলার রানীরহাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।
আইও মো: কামরুজ্জামান বলেন, মিতু হত্যাকা-ে অংশ নেয়া মুছা, রাশেদ, নবীসহ কয়েকজন রানীরহাট এলাকায় অবস্থান করছিল। গোপন সূত্রে এই সংবাদ পেয়ে আমরা অভিযানে যাই। আমরা যখন তাদের চার দিক থেকে ঘিরে ফেলি তখন তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আমরাও পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকি। একপর্যায়ে তারা পিছু হটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। বন্দুকযুদ্ধে আহত নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক আজহার, ইমাম ও সিকান্দারকে নগরীর দামপাড়ায় পুলিশ লাইন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কামরুজ্জামান।
এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে দু’টি পিস্তল, একটি এলজি, ২টি কিরিচ ও ৫ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি হুমায়ন কবির। ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত নবী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সোনারগাঁও নতুন পাড়ার বাসিন্দা মুন্সী মিয়ার ছেলে। রাশেদ একই উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা  সোনামিয়ার ছেলে।
নবী এবং রাশেদের পরিবারের দাবি অনুযায়ী তাদের পুলিশ আগেই গ্রেফতার করেছে। এমনকি তাদের ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বাবুল আক্তারের মুখোমুখিও করা হয়েছিল। রাশেদের পিতা সংবাদ সম্মেলন করে তাকে পুলিশ আগেই ধরে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেন। তিনি তার সন্তানকে আদালতে হাজির করারও আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ এ আবেদনে সাড়া দেয়নি। অবশেষে ঈদের ৪৮ ঘণ্টা আগে পরিবারের সদস্যরা চমেক হাসপাতাল মর্গ থেকে রাশেদের লাশ বুঝে নেন। তবে পুলিশ বরাবরই গ্রেতারের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিল। নবীর পরিবারও অভিযোগ করেছে পুলিশ অনেক আগেই তাদের ধরে নিয়ে যায়। বন্দুকযুদ্ধ বলে যা বলা হচ্ছে তা সাজানো নাটক বলেও অভিযোগ করেন নিহত দুইজনের পরিবারের সদস্যরা। রাশেদ মূল হোতা আবু মুছার ভাগিনা। মুছার স্ত্রী পান্না অভিযোগ করেন পুলিশ ২২ জুন মুছাকে ধরে নিয়ে গেছে।
গত সোমবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন পুলিশ ওই দিন তাদের বাসায় গিয়ে সবাইকে জিম্মি করে। এসময় পুলিশের সাথে নবীও ছিল। মুছা তখন বাসায় ছিল না। নবীর মোবাইল থেকে মুছাকে ফোন করে বাসায় নিয়ে আসে পুলিশ। পরে মুছা ও তার বড় ভাই সাইদুলকে নিয়ে যায় পুলিশ। ১ জুলাই সাইদুলকে গ্রেফতার করার কথা স্বীকার করে পুলিশ। পুলিশ দাবি করে মিতু হত্যাকা-ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি মুছাকে সরবরাহ করে সাইদুল। সাইদুলকে গ্রেফতারের বিষয়টি স্বীকার করলেও মুছাকে তারা ধরেনি বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহারের মতে, মিতু হত্যার মূল হোতা মুছা। হত্যাকা-ে যে ৭ থেকে ৮ জন অংশ নিয়েছিল তারা সবাই ভাড়াটে। টাকার বিনিময়ে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রে এসব সদস্যকে ভাড়া করা হয়েছিল। মুছাকে ধরা গেলে খুনের মূল রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। তবে সে মুছা কোথায়, সে কি আদৌ বেঁচে আছে নাকি গুম হয়ে গেছে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না।
এদিকে মিতু হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া দুই আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার ২৬ জুন আদালতে জবানবন্দী দিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত যে সাতজনের নাম প্রকাশ করেছিল তাদের মধ্যে রাশেদ এবং নূর নবীর নামও ছিল। তারা জানায়, নবী মিতুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আর রাশেদ আগে থেকে সেখানে অবস্থান করে হত্যাকা-ে তাদের সহযোগিতা করেছে। গত ৫ জুন সকালে  ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় নগরীর ও আর নিজাম রোডে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত ও গুলিতে নিহত হন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনায় বাবুল আক্তার নিজে বাদি হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
হত্যাকা-ের পর থেকেই সিএমপির গোয়েন্দা ইউনিটের সঙ্গে তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এবং কাউন্টার  টেরোরিজম ইউনিট। আইজির নির্দেশে ঘটনা তদন্তে ৬টি সমন্বিত টিমও গঠন করা হয়। শুরুতে পুলিশ এ হত্যাকা-ের জন্য জঙ্গিদের দায়ী করে। এরপর এই খুনের সাথে জামায়াত-শিবির জড়িত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় বেশ কয়েকজনকে, পরে তাদের ছেড়েও দেয়া হয়। ৮ জুন হাটহাজারীর মুসাবিয়র দরবারের খাদেম আবু নসর গুন্নুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে শিবিরের সাবেক কর্মী হিসেবে প্রচার করে পুলিশ। তবে মাজারের পক্ষ থেকে দাবি করা গুন্নু শিবির নয়, মাজার নিয়ে বিরোধের জেরে ত্রিশ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষ।
এরপর পুলিশ শাহ জামান রবিন নামে এক মদ্যপকে ধরে এনে এই মামলায় চালান করে। তাদের দুইজনকে ৭ দিন করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। তাদের পাঠানো হয় কারাগারে। পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেন তারা এ ঘটনায় জড়িত এমন প্রমাণ মেলেনি। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো কর্মকর্তা কথা না বললেও তারা দাবি করেন হত্যাকা-ে জড়িত সবাই তাদের হাতে। তাদের ধরা হয়েছে, হত্যাকা-ে ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। পুলিশের বরাত দিয়ে খুনিচক্রের সদস্যদের আটক করার খবর দেশের প্রায় মিডিয়ায় প্রকাশ হয়। তাদের ছবিও প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে।
এর মধ্যে ২৪ জুন রাতে বাবুল আক্তারকে রাজধানীতে তার শ্বশুরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে টানা ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। মামলার বাদিকে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করায় হত্যাকা-ের কারণ নিয়ে দেশজুড়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন চট্টগ্রামে কয়েকজন আসামি ধরা পড়েছে, বাবুল আক্তারকে তাদের মুখোমুখি করা হয়েছে। তবে সিএমপির কর্মকর্তারা মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের কথাটি চেপে যান। কাকে ঢাকায় নিয়ে মুখোমুখি করা হয়েছে তাও এখনো রহস্যাবৃত।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন