ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৩ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন প্রকল্পের বেহাল দশা

প্রকাশের সময় : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখেই অবশেষে আগামী মে মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে যাচ্ছে সরকার। ২০১৩ সালের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৩ দফা সময় ও বাজেট বাড়িয়েও দেশের সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখনো শেষ করতে পারেনি চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন, শিকো এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান পিবিএল। গত বছরের ডিসেম্বর নাগাদ অসমাপ্ত কাজ শেষ করার টাইম লাইন থাকলেও সে ডেটলাইনও পার হয়ে গেছে আরো একমাস আগে। জানুয়ারী পর্যন্ত সামগ্রিক কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে বলে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। প্রায় ১৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পকে ১০টি প্যাকেজে ভাগ করে এসব কোম্পানির দরপত্র অনুমোদন করেছিল সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ১৪টি বাইপাস, ২৩টি সেতু এবং ২৩০টি কালভার্টসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন প্রকল্প বাস্তবায়নে শিনোহাইড্রোসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো যে অ্যাকশন প্লান জমা দিয়েছিল বার বার সময় ও বাজেট বাড়িয়েও তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফেনির রেলওয়ে ওভারপাস দেশীয় পিবিএল জেভি লি: এবং শিকো গত চার বছরে অর্ধেকও শেষ করতে পারেনি। আগামী মে মাসে প্রধানমন্ত্রী চারলেন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবে বলে ভাবা হলেও চলতি বছরের মধ্যেও এসব অসমাপ্ত কাজ শেষ করা যাবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। যারা চার বছরে প্যাকেজের অর্ধেকও শেষ করতে পারেনি, তারা মাত্র ৪ মাস বা এক বছরে বাকি অর্ধেক কাজ শেষ করতে পারবে, এটা অপ্রত্যাশিত।
 ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের। ২০০৬ সালে এই মহাসড়কটিকে চারলেনে উন্নীত করতে ২ হাজার ১৬৮ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং ২০১২ সালের মাঝামাঝি নাগাদ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারিত হয়। এরপর বার বার সময় এবং বাজেট বাড়ানো হলেও ১০ বছরেও তা বাস্তবায়নের শেষপ্রান্তে পৌঁছতে পারেনি। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রায় সবগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক সময় ক্ষেপণের পাশাপাশি বাজেট বৃদ্ধির নানা অজুহাত তৈরি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বাস্তবায়নকারি সরকারী সংস্থাগুলোও যেন এসব দেশি-বিদেশি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে তাদের অন্যায় আবদার মেনে নিচ্ছে। ঢাকার সাথে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের একমাত্র সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হিসেবে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগই ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের ওপর দিয়ে পরিচালিত হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ যে কোন নিরিখেই সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে বাস্তবায়নের দাবি রাখে। নির্ধারিত সময়সীমার দ্বিগুণ সময় পার হওয়ার পরও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো অসমাপ্ত থাকার বাস্তবতা হতাশাজনক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াতকারি লাখ লাখ যাত্রী বছরের পর বছর ধরে অস্বাভাবিক যানজট ও দুর্ভোগ পোহাতে বাধ্য হচ্ছে। চার-পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা অধিকাংশ সময় ৮-১০ ঘণ্টায়ও  পার হতে পারছে না। হাইওয়ে উন্নয়নে অস্বাভাবিক ধীরগতির কারণে জনভোগান্তির পাশাপাশি দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ব্যয় বাড়ছে।
শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে প্রকল্পেই নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি বড় প্রকল্পেই অনুরূপ সময় ক্ষেপণ এবং ক্রমবর্ধমান হারে বাজেট বৃদ্ধির রেওয়াজ চলছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার একাধিক ফ্লাইওভার প্রকল্প, হাতিরঝিল প্রকল্প এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের উদাহরণ দেয়া যায়। ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে প্রকল্প এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে প্রকল্পের সাথেও বাংলাদেশী ঠিকাদার কোম্পানি পিবিএল জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের সময় ও বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মহল জনগণের রাজস্বের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত: ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের অস্বাভাবিক ধীরগতি এবং বার বার মেয়াদ বৃদ্ধির সাথে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কারসাজির অভিযোগ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) বিভাগের সর্বশেষ মূল্যায়নেও তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে  বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন প্রকল্পের কাজ শেষ করার মেয়াদ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সাথে প্রকল্প ব্যয় আরও ৬২৭ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সড়ক বিভাগ। একেকটি প্রকল্পের কাজ সময় মতো শেষ করতে না পারা এবং অব্যাহত বাজেট বৃদ্ধির পেছনে সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গাফিলতি ও নজরদারিতে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না। জনগুরুত্বসম্পন্ন এবং দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন প্রকল্পের এমন বেহাল দশা, অর্থের এবং সময়ের এ রকম বেহিসাবী অপচয় মেনে নেয়া যায় না। দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে  কারাসাজি ও লুটপাটের সাথে জড়িতদের কখনো জবাবদিহি করতে হয় না। দেশের কোটি মানুষের অনেক ভোগান্তি এবং রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সাথে জড়িতদের অবশ্যই আইনানুগ জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আর কোন সময়বৃদ্ধি বা কালক্ষেপণ নয়, অনতিবিলম্বে চারলেন প্রকল্পের কাজ শেষ করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন