ঢাকা বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, ১৮ রজব ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

এই উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা কবে বন্ধ হবে

| প্রকাশের সময় : ২৪ জানুয়ারি, ২০২১, ১২:০২ এএম

নদ-নদীর অবৈধ দখল-দূষণ নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চলছে। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত লেখালেখি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে মাঝে মাঝে বিআইডব্লিউটিএ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। গত বছরের শুরুতে দুই ধাপে বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে নদীর কিছু জায়গা উদ্ধার হয়। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অভিযান বন্ধ হওয়ার পরপরই তা পুনরায় দখলে চলে যায়। অবৈধ দখল ও উদ্ধার এক ধরনের ইঁদুর-বেড়াল খেলায় পরিণত হয়েছে। নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত আছে এবং থাকবে। গত দুই বছরে উচ্ছেদ অভিযানে যেসব জায়গা দখলমুক্ত করা হয়েছে, তা পুনঃদখল হয়নি। উচ্ছেদ করা জায়গা সংরক্ষণ করছি। সীমানা পিলার, ওয়াক ওয়ে নির্মাণ ও বৃক্ষরোপন করা হচ্ছে। মন্ত্রী এ কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অবৈধ দখলমুক্ত অনেক জায়গা পুনরায় দখল হয়ে গেছে।
গত বছর সরকার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখল এবং কারা দখল করছে তার একটি তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা এবং এর আশপাশের জেলাসহ সারাদেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার অবৈধ দখলদারের খবর প্রকাশিত হয়। এ তালিকায় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালীসহ ক্ষমতাসীন দলের লোকজন রয়েছে। তালিকা প্রণয়ন করা হলেও তাদের কবল থেকে নদ-নদীর জায়গা মুক্ত করার জোরালো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কেবল রাজধানীর বুড়িগঙ্গাসহ চারপাশের নদ-নদীর উদ্ধারের কিছু চিত্র দেখা যায়। বিষয়টি উদ্ধারের নামে এক ধরনের ক্যামেরা ট্রায়াল বা ফটোসেশনে পরিণত হয়েছে। অথচ একেকটি উদ্ধার অভিযানে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। বিপুল এই অর্থ খরচ হলেও উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি সফল হচ্ছে না। উদ্ধার করে যদি তা ধরেই না রাখা যায়, তাহলে এই অভিযান এবং অর্থের অপচয় কেন? অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা তা পুনরায় দখলদারদের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি যদি হয়, তাহলে নদ-নদী অবৈধ দখলমুক্ত হবে কিভাবে অবৈধ দখল উচ্ছেদে উচ্চ আদালত একাধিকবার নির্দেশ দিয়েছে। কিভাবে উচ্ছেদ করতে হবে তার পথও দেখিয়েছে। আদালত এই নির্দেশ দিয়েছে, সিএস রেকর্ড অনুযায়ী আগে নদ-নদীর সীমানা নির্ধারণ করে এ অনুযায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করতে হবে। উচ্ছেদের পর তা রক্ষা করতে হবে। বলা বাহুল্য, উচ্চ আদালতের নির্দেশ মতো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলে এতদিন অনেক নদ-নদীই দখলমুক্ত করা যেত। দেখা যাচ্ছে, এ কাজটি বিআইডব্লিওটিএ এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষ না করেই উচ্ছেদ অভিযানে নামছে। এ অভিযান যে এখন লোকদেখানোতে পরিণত হয়েছে, তা বোধকরি ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। নদ-নদীর জায়গা অবৈধ দখল থেকে মুক্ত করার এই ব্যর্থতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। বর্তমান সরকার একযুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায়। এই একযুগে নদ-নদী অবৈধ দখলমুক্ত করার চিত্র অত্যন্ত হতাশার। এমন একটি উদাহরণ নেই, যাতে বলা যায়, একটি নদী অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত হয়েছে। এক বুড়িগঙ্গা দখল ও দূষণমুক্ত করার অনেক কথা ও পরিকল্পনা শোনা গেছে। এ কাজটি আজও করা যায়নি। অবৈধ দখলদাররা এতটাই প্রভাবশালী যে, সরকারও যেন তাদের সাথে পেরে উঠছে না। শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, রাজধানীর চারপাশের অন্য তিন নদী এবং মেঘনা ও শীতলক্ষ্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো প্রভাবশালীদের দখলে রয়ে গেছে। নদীর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে ডকইয়ার্ড, পরিবহন স্ট্যান্ড নির্মাণসহ ইট-বালুর ব্যবসা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, সঠিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা না করে সব ধরনের তরল ও কঠিন বর্জ্য নির্বিচারে নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদ-নদীগুলো যেন সব বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
নদ-নদীর অবৈধ দখল ও দূষণের কারণ এবং প্রতিকারের কথা বহুভাবেই বলা হয়েছে। কেবল যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তা করা যাচ্ছে না। অথচ সরকার যে ডেল্টা প্ল্যান করেছে, তা সফল করতে সবার আগে নদ-নদীর অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করার বিকল্প নেই। এ কাজ না করলে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। রাজধানীর প্রাণ হিসেবে পরিচিত যে বুড়িগঙ্গা তা সচল এবং স্রোতস্বীনী করা অসম্ভব কিছু নয়। এই নদীকে যদি তার আদিরূপে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে অন্য নদ-নদী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ হয়ে যাবে। দুঃখের বিষয়, আমার কেবল এর অবৈধ দখল-দূষণমুক্ত করার লোক দেখানো উদ্যোগই দেখছি। বাস্তবে সাফল্য দেখছি না। আমরা মনে করি, বুড়িগঙ্গা ও রাজধানীর আশপাশের অন্য নদীগুলোর অবৈধ দখলমুক্ত করে সচল করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা বুড়িগঙ্গাকে তার আদিরূপে দেখতে চাই। অবৈধ দখলদার যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। যেকোনো মূল্যে দখলমুক্ত জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। নদ-নদীর উদ্ধারকৃত জায়গা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ ও দূষণমুক্ত করতে প্রয়োজনে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন এবং সরকারের অগ্রাধিকারমূলক অন্যান্য প্রজেক্টের মতো একে মেগা প্রজেক্ট হিসেবে নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন