ঢাকা রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

মহানগর

চট্টগ্রামে জিম্মি করে অর্থ আদায় চক্রের প্রধানসহ ৪ যুবক গ্রেফতার

প্রকাশের সময় : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে জিম্মি করে অর্থ আদায় চক্রের প্রধানসহ ৪ যুবককে গ্রেফতার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। চক্রটি বিভিন্ন কৌশলে কখনও মানুষ, কখনও গাড়ি, কখনও বিভিন্ন পণ্য জিম্মি করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। কখনও ডিবি, কখনও পুলিশ, আবার কখনও ক্রেতা-বিক্রেতা সেজে মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভনের ফাদে ফেলে জিম্মি করে অর্থ আদায় করাই তাদের পেশা। গত দু’দিন ধরে চট্টগ্রাম ও ফেনীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জয়নাল (৩৫), আলাউদ্দিন (৩৭), ফখরুল (৩৭) এবং দেলোয়ার হোসেন (৩২) নামের চার যুবককে আটক করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। চারজনের বাড়িই মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জে।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর-দক্ষিণ) বাবুল আক্তার বলেন, চারজনের মধ্যে জয়নাল গাড়িসহ মালামাল জিম্মি করে টাকা আদায় করে। ফখরুল নারী দিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাদে ফেলে জিম্মি করে। আলাউদ্দিন উভয় গ্রæপের হয়ে টাকা-পয়সা সংগ্রহ করে। উভয় গ্রæপের মধ্যে সমন্বয় করে নিরীহ মানুষ সংগ্রহ করে দেয়া তার কাজ। এ চক্রটি গত প্রায় দুই বছর ধরে মানুষকে জিম্মি করে আসছে। এ প্রথম তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।
জয়নাল এলপিজি গ্যাসের পরিবেশক হাটহাজারীর আলমপুরের জনৈক মো. লোকমানের পিকআপ ভ্যানের চালক ছিল। ২৫ ডিসেম্বর ৮৯টি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে সেগুলোতে গ্যাসভর্তি করার জন্য জয়নাল সীতাকুÐে যায়। এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ২৬ ডিসেম্বর গ্যাস সিলিন্ডারসহ পিকআপ ভ্যান ফেরত দেয়ার জন্য জয়নালের পক্ষে আলাউদ্দিন তিন লাখ টাকা দাবি করে। মো. লোকমান বলেন, গাড়ি ফেরত পাবার জন্য আমি তাদের কাছে বিকাশ নম্বরে ১৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা গাড়ি ও সিলিন্ডার ফেরত দিচ্ছিল না। পরে আমি নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসি। টাকা দিতে দেরি করায় আলাউদ্দিন একদিন আমাকে ফোন করে বলে, গাড়ি এনেছি বলে টাকা দিচ্ছ না, তোমার মেয়েকে তুলে আনলে ঠিকই টাকা দিতে। একথা বলার পর আমি আতংকিত হয়ে পড়ি।
লোকমানের পিকআপ ভ্যান চুরির পর গাড়িটির রঙ ও নম্বরপ্লেট পাল্টে ফেলা হয় বলেও জানিয়েছে জয়নাল। সে জানায়, একরাম ও জাহাঙ্গীর নামে আরও দু’জন তার সঙ্গে জড়িত। নগর গোয়েন্দা পুলিশ ফেনীতে একরামের বাড়ি থেকে গাড়ি এবং জাহাঙ্গীরের বাড়ি থেকে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো উদ্ধার করলেও দু’জনকে খুঁজে পায়নি।
এদিকে লোকমানের গ্যাস সিলিন্ডার ও গাড়ির সন্ধানে নেমে নগর গোয়েন্দা পুলিশ বাকি তিনজনের সন্ধান পায়। এছাড়া নগরীর ইপিজেড এলাকায় ঝনক প্লাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাবুল ধরকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার একটি ঘটনাও উদঘাটন করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের সঙ্গে ফখরুল, আলাউদ্দিন ও দেলোয়ার জড়িত ছিল।
বাবুল আক্তার বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে ঝনক প্লাজার তথ্য পেয়ে আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম বাবুল ধর গাড়ি ও গ্যাস সিলিন্ডার আটকে রাখার সঙ্গে জড়িত। তার কাছে গেলে তিনি জানান, তিনি নিজেও প্রতারণার শিকার। তাকেও জিম্মি করে চারটি বিকাশ নম্বরে এক লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। তার দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে আমরা তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি।
বাবুল ধর জানান, গত ১৮ ডিসেম্বর দুপুরে এক নারী তাকে ফোন দিয়ে জানায়, ওই নারী তার দোকানের নিয়মিত গ্রাহক। তার স্বামী বিদেশে থাকে। তার কাছে কিছু পুরনো স্বর্ণালংকার আছে। সেগুলো বিক্রি করবে, বাসা থেকে যেন নিয়ে যায়। সরল বিশ্বাসে ওই নারীর দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী পাহাড়তলী থানার মুরগির ফার্ম এলাকায় বাবুল ধর যান। সেখানে নির্দিষ্ট বাসায় ঢোকার পর তিনজন যুবক ও দু’জন নারী মিলে তাকে জিম্মি করে একটি কক্ষে আটকে রাখে। তিন যুবক তার বুকে, পেটে ক্রমাগত লাথি মারতে থাকে। এছাড়া লোহার রড আর কাঠ দিয়ে তাকে পেটানো হয়। এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান তাকে উলঙ্গ করে ফেলা হয়েছে। দু’জন নারীকে পাশে বসিয়ে ছবি তুলে সেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয় আলাউদ্দিন। ফখরুল আর দেলোয়ার নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে অস্ত্র ও ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেয়ার হুমকি দেয়। তিনি জানান, আলাউদ্দিন ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাবুলের স্ত্রীকে ফোন দিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করে। এসময় বাবুলের স্ত্রী দ্রæত পাঁচলাইশ থানায় যান। পুলিশের পরামর্শে তিনি প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দুইটি বিকাশ নম্বরে পাঠান। এরপরও তাকে জিম্মি করে রাখলে রাতে আরও দু’টি বিকাশ নম্বরে আরও ৫০ হাজার টাকা দেয়ার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, আটকের সময় ফখরুল ও তার ভাই তাকে আওয়ামী লীগের নেতা বলে পরিচয় দেয়। সে প্রভাবশালী নেতা পরিচয় দিয়ে পুলিশের সঙ্গে ঔদ্ধত্য দেখায়। বাবুল ধর জানায়, তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেয়ার আগে আলাউদ্দিন ও ফখরুল তাকে বলেছিল, স্থানীয় বঙ্গবন্ধু ক্লাবকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। ২৫ হাজার টাকা পুলিশকে দিতে হবে। বাকি ২৫ হাজার টাকা তারা পাবে। আলাউদ্দিন জানায়, সে আগে ফেনীতে সিএনজি অটোরিকশা চালাত। পরে চট্টগ্রাম নগরীতে এসে আলম মাঝি নামের একজনের পতিতা পল্লীতে খদ্দের সরবরাহ করত। দুই বছর আগে থেকে সে সম্পূর্ণভাবে প্রতারণার পেশায় জড়িয়ে যায়। বাবুল ধরের কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেয়ার পর সে ১৩ হাজার টাকা পেয়েছে। এছাড়া সাত-আটজনের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে। মাসে তার এই খাত থেকে আয় হয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। দেলোয়ার জানায়, আলাউদ্দিনের মাধ্যমে সে এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। আলাউদ্দিনের দু’জন স্ত্রী। বড় স্ত্রী থাকে জোরারগঞ্জে আবাসন এলাকায়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন