ঢাকা শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২১, ০১ মাঘ ১৪২৭, ০১ জামাদিউল সানী ১৪৪২ হিজরী

মহানগর

ফুটপাতের চাঁদা এখন দ্বিগুণ ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় চাঁদাবাজচক্র

প্রকাশের সময় : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নূরুল ইসলাম : ঈদকে সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাতের বাজার। দ্বিগুণ হয়েছে চাঁদার হারও। মাত্র দুই মাস আগে নগরীর গুলিস্তানের রাস্তা হকারমুক্ত করা হলেও আবার তা বেদখল হয়ে গেছে। রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে হকারদের কাছ থেকে দ্বিগুণ চাঁদা আদায় করে চলেছে লাইনম্যানরা। হকারদের অভিযোগ, লাইনম্যানদের চাঁদা না দিলে পুলিশ এসে ঝামেলা করে। উঠিয়ে দেয়।
রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর এলাকার হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ফুটপাতে চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। গেল রমজানে গুলিস্তানের রাস্তা থেকে হকারদের তুলে দেয়া হয়েছিল। ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে গুলিস্তানের রাস্তা হকারমুক্ত হলেও মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পাল্টে গেছে গুলিস্তান এলাকার চিত্র। রাস্তার সিংহভাগ দখল করে হকাররা ব্যবসা করছে। রাস্তা দখল করে রাখায় সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যানজট লেগেই আছে। ভোগান্তি পোহাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। অথচ কর্তব্যরত পুলিশ নীরব।
গুলিস্তানের কয়েকজন হকার জানান, ইদুল ফিতরে রাস্তা থেকে হকারদের তুলে দেয়ার পর সার্জেন্ট আহাদ বক্সের পুলিশ লাইনম্যানদের দায়িত্ব দেয় রাস্তা দেখাশোনার। রক্ষক লাইনম্যানরাই ভক্ষক হয়ে রাস্তার ওপর হকারদের বসার সুযোগ করে দেয়। পুলিশকে ম্যানেজ করে তারা এ কাজটি করে আসন্ন ঈদ উপলক্ষে চাঁদার পরিমাণ দ্বিগুণ করেছে। ভুক্তভোগী হকাররা জানান, ঈদ সমাগত বলে দ্বিগুণ চাঁদা দিয়েই তাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে।
রাজধানীর ফুটপাতগুলো হকাররা দখল করে ব্যবসা করলেও এর নেপথ্যে রয়েছে সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতা ও পুলিশ। হকাররা জানান, চাঁদা তোলার জন্য পুলিশই ‘লাইনম্যান’ নিয়োগ করে। লাইনম্যানরা চাঁদা তুলে দখলদার নেতা ও পুলিশকে বুঝিয়ে দেয়। গেল রমজানে ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশের পর গুলিস্তানে হকাররা যাতে রাস্তায় আর না বসতে পারে এজন্য লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজদেরকে দায়িত্ব দেয় গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ বক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। লাইনম্যানরা এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সে সময় চাঁদার অঙ্ক দ্বিগুণ করেছিল। এবার ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আবার চাঁদার হার দ্বিগুণ করা হয়েছে।
হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগে যেসব দোকান থেকে দিনে দেড়শ’ টাকা করে চাঁদা নেয়া হতো, এখন তা তিনশ’ টাকা হয়েছে। দুইশ’ টাকার চাঁদা হয়েছে ৫শ’ টাকা। এভাবে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তুলছে লাইনম্যান নামধারী চিহ্নিত চাঁদাবাজরা। গুলিস্তান সুন্দরবন স্কোয়ারের উত্তর পাশের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে মোটা জজ, বাবুল, আমীর হোসেন, ভোলা ও কানা সিরাজ। গুলিস্তানের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা বলে এখানকার দর একটু বেশি। হকাররা জানান, এখানে ফুটপাতের দোকানগুলোর চাঁদা আগে ছিল দেড়শ’ টাকা। এখন হয়েছে তিনশ’। বঙ্গভবনের পার্কের সামনে সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সাথের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে লম্বা হারুন ও তার শ্যালক দেলোয়ার। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের পূর্ব পাশের ফুটপাত ও রাস্তার দোকান থেকে চাঁদা তোলে সরদার বাবুল। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের উত্তর পাশের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে খোরশেদ ও হাসান। রাজধানী হোটেলের সামনের ফুটপাত ও রাস্তার দোকান থেকে চাঁদা তোলে হিন্দু বাবুল ও রব। জাতীয় গ্রন্থ ভবনের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে সুলতান ও লিপু। রমনা ভবনের পশ্চিম পার্শ্বের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে মনির ও তরিক আলী। পূর্ণিমা ¯œ্যাকসের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে আখতার ও জাহাঙ্গীর। বেলতলা বেল্টের গলির রাস্তা ও ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে কালা নবী, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সোনালী ব্যাংকের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে সর্দার ছালাম। জিপিও’র দক্ষিণের রাস্তার দোকান থেকে চাঁদা তোলে শহীদ ও দাড়িওয়ালা সালাম। মাওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের সামনের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে আলী মিয়া। বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে কাদের ও খলিল। বায়তুল মোকাররম মসজিদের পশ্চিম দিকের মিনারের কাছের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে কোটন, জাহাঙ্গীর ও নসু। বায়তুল মোকাররম মসজিদের স্বর্ণের মার্কেটের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে তমিজ উদ্দিন ও বাবুল ভূঁইয়া। জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে সাজু। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সামনের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে কবির হোসেন, ফুলবাড়ীয়া টিঅ্যান্ডটির সামনের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে ঘাউরা বাবুল। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের পশ্চিমের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে বিমল। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের হিসাব মতে, শুধুমাত্র গুলিস্তান থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ হয়ে ফুলবাড়ীয়া পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাতে কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার দোকান বসে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলে লাইনম্যানরা, যা ঈদকে সামনে রেখে ১০ লাখ টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে, নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করে চলেছে চিহ্নিত চাঁদাবাজচক্র। এদের বিরুদ্ধে ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করার পরেও কোনো কাজ হয়নি। বরং তদন্তের নামে পুলিশ সময় ক্ষেপণ করেছে। রমনা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার চাঁদাবাজি বন্ধে আন্তরিক হলেও থানার ওসির অসহযোগিতার কারণে চাঁদাবাজদের দমন করা যায়নি বলে মনে করেন নিউমার্কেট এলাকার হকাররা। রাজধানীর জুরাইন আলম মার্কেটের সামনে সড়ক ও জনপদের জায়গা দখল করে আগের মতোই চাঁদাবাজি করে চলছে চিহ্নিত চাঁদাবাজরা। হকাররা জানায়, খায়রুল ও মোশাররফরা আগের মতোই হকারদের জিম্মি করে চাঁদা তুলে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী হকাররা জানান, ঈদকে সামনে রেখে চাঁদাবাজদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। তবে খায়রুল হকারদের কাছে থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সংগঠনের নামে কিছু টাকা না তুললে মার্কেট চালানো যাবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও টয়লেটের জন্য কিছু টাকা তোলা হয়, যেটাকে চাঁদাবাজি বলা যায় না।
একইভাবে ফার্মগেট, মিরপুর, মহাখালী এলাকার ফুটপাতগুলো থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, লাইনম্যান নামধারী কতিপয় চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করলেই এসব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
আমরা বরাবরই সে দাবিই জানিয়ে আসছি সরকার তথা প্রশাসনের কাছে। ঈদকে সামনে রেখে চাঁদা দ্বিগুণ করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, পুলিশ ইচ্ছা করলেই এক দিনে সবকিছু বন্ধ করে দিতে পারে। বরং পুলিশ চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দিয়ে সাধারণ হকারদের উচ্ছেদ করছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন