ঢাকা, রোববার ২১ জুলাই ২০১৯, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সারা বাংলার খবর

সীমাহীন বিদ্যুৎ সংকটে নরসিংদী ঘন ঘন গ্রীড ফিডার ট্রান্সফরমার বৈকল্যের পর এবার ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং, জনজীবন বিপর্যস্ত

প্রকাশের সময় : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

স্টাফ রিপোর্টার, নরসিংদী থেকে : শিল্প, ব্যবসা ও শিক্ষার জনপদ খ্যাত নরসিংদীতে সীমাহীন বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। ঘন ঘন গ্রীড ফিডার ও ট্রান্সফরমার বৈকল্য, ত্রæটিজনিত ঘন ঘন সরবরাহ লাইন ট্রিপ এবং সর্বোপরি ঘণ্টায় ঘণ্টায় রেশিওবহির্ভূত লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে কল-কারখানার উৎপাদনে বিঘেœর সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা শপিংমলগুলোর বেচাকেনায় ধস নেমেছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বাড়ীতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। বহুতল ভবনের বাসিন্দারা বিদ্যুতও পানির অভাবে সংকটাপন্ন অবস্থায় পতিত হয়েছে। গ্রামগুলোতে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ থাকছে না। শহর বন্দর গ্রাম সর্বত্রই জন-জীবনা নাজুক হয়ে পরেছে।
সার্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বিএনপি আমলের ৯০ দশকের সংকটাবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আরইবি নিয়ন্ত্রিত পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সেবার মান তৎকালীন ডেসার সেবার মানের চেয়েও অধপতিত হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন এই অবস্থা চলতে থাকলেও মন্ত্রী এমপি এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সর্বোপরি স্থানীয় প্রশাসন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, দেশে কোনো লোডশেডিং নেই এর পরও কেন এত অতিমাত্রায় লোডশেডিং চলছে এর কারণ সম্পর্কে নরসিংদীর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১’র কর্মকর্তাগণ কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারছেন না। তারা শুধু বলছেন, উপর থেকে বলছে লোডশেডিং কর, আমরা করছি।
খবর নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতার পূর্বাপর সময়ে নরসিংদীর পলাশে স্থাপিত হয় ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নামে একটি বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা। এই ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৬টি ইউনিটে ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। তখনো এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নরসিংদীর মানুষ তাদের কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ পায়নি। এব্যাপারে নরসিংদীর একজন সাবেক এমপি এক জনসভায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলেন নরসিংদীতে ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কিন্তু নরসিংদীর মানুষ তাদের কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ পাবে না কেন।
তৎকালীন শিল্প এলাকা নরসিংদীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ দায়িত্ব ছিল পিডিবির উপর। কিন্তু পিডিবি’র তৎকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি ও ব্যর্থতার কারণে ৮০’র দশকে নরসিংদীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ডেসার অধীনস্ত করা হয়। কিন্তু ৯০ দশক পর্যন্ত ডেসা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৯৯ সালে নরসিংদীর ডেসার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থপনাসমূহ নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নিকট হস্তান্তর করা হয়। পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি নরসিংদীর বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব নিলেও শহর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করার অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। নরসিংদীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় আরইবি’র নিয়ন্ত্রণাধীন নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১’র অধিনে মাধবদীতে সামিট পাওয়ার নামে একটি বেসরকারী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এই উৎপাদন কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ২৫ মেগাওয়াট। কথা ছিল সামিট পাওয়ারে উৎপাদিত ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মাধবদী শিল্প এলাকায় ব্যবহারের পর বাকী অংশ নরসিংদী কারখানার জন্য সরবরাহ করা হবে। এ নিমিত্তে মাধবদী থেকে নরসিংদী পর্যন্ত ১১ হাজার কেভি একটি সঞ্চালন লাইনও নির্মাণ করা হয়।
কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের ধাক্কায় সবই ভেস্তে যায। সামিট পাওয়ারের বিদ্যুৎ নিয়ে যায় নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি উপজেলায়। তৎকালীন নরসিংদীর মন্ত্রী-এমপি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এব্যাপারে টুশব্দটিও করেননি। পরে নরসিংদীতে আরইবি’র নিয়ন্ত্রণে নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২’র সহযোগিতায় ডরিন পাওয়ার নামে ২২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর ডরিন পাওয়ারের নানা ধরনের যান্ত্রিক গোলযোগ লেগেই থাকে। এই কেন্দ্রটি খুব কম দিনই চূড়ান্ত উৎপাদন দিতে পেরেছে। কেন স্ট্যান্ডার্ড উৎপাদন দিতে পারেনি, পারছে না, এব্যাপারে ডরিন পাওয়ার কর্তৃপক্ষকে কেউ কোনো দিন জিজ্ঞেসও করেনি। স্থানীয় সাংবাদিকরা বহু চেষ্টা করেও ডরিন পাওয়ার কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে কোন তথ্য খুঁজে পায়নি। ডরিন পাওয়ার স্থাপনের পরও নরসিংদী জেলায় বিদ্যুৎ সংকট দুরীভূত না হওয়ায় নরসিংদীর চৌয়ালায় স্থাপন করা হয় গ্রীড লাইন।
তখন বলা হয়েছিল গ্রীডলাইন স্থাপন করা হলে নরসিংদীর বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অন্তত: নরসিংদী জেলা শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় কখনো বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হবে না। কিন্তু নরসিংদীর মানুষের বিধিবাম। গ্রীডলাইন স্থাপন করার পরও মানুষের ভগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না। নরসিংদীর গ্রীডলাইন পরিচালন ও সংরক্ষণ করছে পিজিসিবি কর্তৃপক্ষ। স্থাপনের পর থেকে এই গ্রীডলাইনে গোলযোগ লেগেই রয়েছে। একেক সময় গ্রীডবিপর্যয় দেখা দিলে নরসিংদীর মানুষকে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে কাটাতে হয়। প্রায়ই শোনা যায় গ্রীডলাইনে ‘রেডহট’ সমস্যার কথা। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে ১০ ঘণ্টা, ১৫ ঘণ্টা, ২০ ঘণ্টা, ২৫ ঘণ্টা করে নরসিংদী শহর বিদ্যুৎ শূন্য হয়ে পড়ে। এসময় স্বাভাবিক কারণেই ডরিন পাওয়ার বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে থেকে বিদ্যুৎ না আনা পর্যন্ত নরসিংদীর মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নরসিংদী পলী বিদ্যুৎ সমিতি-১’র এসব ত্রæটিপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার উপর এখন চেপে বসেছে লোডশেডিং। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮/১০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ পাচ্ছে না নরসিংদী শহরের মানুষ। গ্রামগুলো দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অন্ধকারে ডুবে থাকছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন