শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

লক্ষ্য হোক নবায়নযোগ্য শক্তি

শাহরীন তাবাসসুম | প্রকাশের সময় : ২৭ জুন, ২০২১, ১২:০২ এএম

পুনঃনির্মাণ হলো পরিষ্কার, সাজসজ্জা এবং পুনর্বিবেচনা দ্বারা যে কোনও কিছুতে উন্নতির প্রক্রিয়া। এটি প্রায়শই সংস্কার বা পুনরুদ্ধারের সাথে বিনিময়যোগ্য। এটি উন্নতকরণ, মেরামত, পরিবর্তন, রূপান্তরের পাশাপাশি আধুনিকীকরণকেও অন্তর্ভুক্ত করে। টেকসই পুননির্মাণ টেকসই উন্নয়নের সমতুল্য শব্দ। টেকসই পুনঃনির্মাণ প্রক্রিয়াটির মধ্যে রয়েছে বর্জ্য হ্রাস করা, পুনর্ব্যবহার করা এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণগুলোকে ব্যবহার করা, শক্তির ব্যবহার হ্রাস করা ইত্যাদি। টেকসই পুনঃনির্মাণ কোনও নতুন ধারণা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগণ ক্ষতির বর্তমান উদ্বেগগুলোর কারণে এটি বর্তমানে স্বীকৃতি ও গুরুত্ব অর্জন করছে।

সবুজ শক্তি বা প্রাকৃতিক শক্তি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস যেমন সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, বায়োমাস এবং জলবিদ্যুৎ শক্তি থেকে আসে। প্রতিটি প্রযুক্তি বিভিন্ন উপায়ে নিজস্ব কাজ করে। প্রধান উৎস হলো বায়ু, সৌর ও জলবিদ্যুৎ শক্তি। সৌর ও বায়ু শক্তি ঘর-বাড়িতে ক্ষুদ্র আকারে এবং শিল্প-কারখানার প্রযুক্তিতে বৃহত্তর আকারে উৎপাদন করতে সক্ষম। প্রাকৃতিক উৎসগুলোর ব্যবহার প্রায়শই খনন বা ড্রিলিংয়ের কাজগুলো এড়িয়ে চলে, যা বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। নবায়নযোগ্য, পরিষ্কার শক্তির উৎস নিয়ে গবেষণা এমন গতিতে এগিয়ে চলেছে, যা কল্পনাতীত। তাই অনেক ধরনের প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে ধরন বিভক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। সবুজ শক্তির সর্বাধিক সাধারণ ধরন হলো: সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি, জলবিদ্যুৎ, ভূ-তাপীয় শক্তি, জৈব জ্বালানি, জৈব গ্যাস ইত্যাদি

সৌর শক্তি প্রাথমিক শক্তির এমন একটি উৎস, যা সরাসরি সূর্য থেকে আসে। এই শক্তি সৌর বিকিরণের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছায়, যা আমরা সংগ্রহ করি এবং বিদ্যুতের মতো ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করি। সৌর শক্তি পানি গরম করার জন্য এবং রান্না ও আলো জ্বালানোর জন্যও ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠের বায়ু প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এটি বিশেষত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দূরে এবং উচ্চতর উচ্চতার জায়গাগুলোর জন্য উপযুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে যে, গ্রামীণ অঞ্চলে ২.৫ মিলিয়ন মেগাওয়াট বায়ু টারবাইনগুলির একটি নেটওয়ার্ক দেখা যায়, যা তাদের নির্ধারিত ক্ষমতার মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার করে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শক্তি ব্যবহারের ৪০ গুণ সরবরাহ করতে সক্ষম।

জৈব জ্বালানির মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে পরিবহন জ্বালানিতে বিশ্বের ২৫% এরও বেশি চাহিদা পূরণের সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় প্রাকৃতিক শক্তির উৎস হতে উৎপাদিত জ্বালানি পরিবেশের উপর তুলনামূলক কম প্রভাব বিস্তার করে। এটি পরিবেশ বান্ধব বিকল্পের সাথে জীবাশ্ম জ্বালানির নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে প্রতিস্থাপন করে। এটি কাজের সুযোগও সৃষ্টি করে থাকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্বারা ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী ১১ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। শক্তি উৎপাদন স্থানীয় প্রকৃতির কারণে, শক্তির অবকাঠামোগত নমনীয়তা এবং কেন্দ্রীভ‚ত উৎসগুলোর উপর কম নির্ভরশীলতা জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রাখতে পারে।

সবুজ শক্তি কিছুটা অবস্থানগত পরিবর্তনের উপরও নির্ভর করে। তীব্র এবং শক্তিশালী রৌদ্রদীপ্ত অঞ্চলগুলোতে সৌর শক্তি বিশেষভাবে কার্যকর। প্রাথমিকভাবে ন্যূনতম পরিমাণে ব্যয় করে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুত উৎপাদন করা যায়। বর্তমানে, বায়ু খামারগুলোকে সবুজ শক্তির সর্বাধিক উপযুক্ত উৎস হিসাবে দেখা হয়। এটিতে সৌর প্যানেলগুলোর তুলনায় কম পরিমার্জন এবং কম উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সবুজ শক্তি সমাধানের আগ্রহ, বিনিয়োগ ও বিকাশ ব্যয় হ্রাস করছে। কয়লার ব্যবহারযোগ্য শক্তির মোট দক্ষতা তার মূল শক্তি মানের মাত্র ২৯ শতাংশ, যখন বায়ু শক্তি প্রাথমিকভাবে তার মূল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ১১৬৪ শতাংশ ফেরত দিতে সক্ষম।

অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশও প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানির চাহিদা অনেকাংশে প‚রণ করে চলেছে। ১৯৫৭ সালে কর্ণফুলী নদীর উপর পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক সম্পদকে জ্বালানিরূপে ব্যবহারের যাত্রা শুরু হয়। আশির দশকে সিলেটে প্রথম সোলার সিস্টেম স্থাপনে বেসরকারি উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬ সালে এসএইচএস চালু হয়, যা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচি। অধ্যাবধি ৪.৫ মিলিয়ন সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যা গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। প্রচলিত বিদ্যুৎ সরবরাহবিহীন অঞ্চলগুলোতে জনসাধারণ সাধারণত নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। গত কয়েক বছরে জীবাশ্ম জ্বালানির নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং তার ক্রমবর্ধমান খরচ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে তরান্বিত করছে। এটি দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করার অন্যতম উপায়।

প্রচলিত শক্তির উৎসগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, যা পুনর্নবীকরণযোগ্য নয় এবং শীঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এটি ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে ও বায়ু দূষণের কারণও বটে। কয়লা ও তেল পরিবেশে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত করে, যা সাধারণের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা সৃষ্টি করে, আয়ু হ্রাস করে। তেল ও কয়লা উত্তোলনের সময় বিধ্বংসীভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে অঞ্চল, পরিবেশ, অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর আঘাত হানতে পারে। প্রাকৃতিক শক্তি হলো বিদ্যুতের জন্য ব্যবহৃত একটি মাধ্যম, যা একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। এটি পরিবেশ ও গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের উপর সর্বনিম্ন প্রভাব ফেলে। সবুজ শক্তি পরিবেশের বিদ্যমান বিদ্যুতের সমস্যাগুলি প্রশমিত করতে সহায়তা করে। সবুজ শক্তি পরিবেশের জন্য সত্যিকারের সুবিধা প্রদান করে। তাই নিরাপদ, নবায়নযোগ্য এবং সবুজ শক্তি প্রযুক্তিবিদ, পরিবেশবিদ এবং যারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও ভালো এক পৃথিবী রেখে যেতে চায় তাদের জন্য একটি সঠিক লক্ষ্য। যদি আমরা প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করে এমন অগ্রযাত্রার বিকাশ অব্যাহত রাখতে একসাথে কাজ করতে পারি, তবে আমরা আমাদের বিশ্বকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বসবাসের উপযুক্ত আরও উন্নত স্থানে পরিণত করতে সফল হতে পারব।

লেখক: শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন