শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২ আশ্বিন ১৪২৮, ০৯ সফর ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

মফস্বলের রোগীতে ঠাসা হাসপাতাল

করোনায় রাজধানীর চিত্র অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বললেন, শেষ মুহূর্তে আসায় মারা যাচ্ছে বেশি

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২৮ জুলাই, ২০২১, ১২:০১ এএম

রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি সব হাপসাতাল করোনার রোগীতে ঠাসা। আইসিইউ ও সাধারণ শয্যা খালি নেই। রাজধানীর হাসপাতালে ভর্তি ৭০ ভাগ রোগী মফস্বলের। বিভিন্ন জেলা-উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে রোগীরা রাজধানীতে আসছে। এদিকে রাজধানীতে বাইরের রোগীদের চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি আবার রাজধানীতে সংক্রমণও বাড়ছে। করোনা রোগীর সাথে নতুন করে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীও।
গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৫৮ জন, যা দেশে করোনা মহামারিকালে একদিনে সর্বোচ্চ মৃতের সংখ্যা। এর আগে একদিনে এত মৃত্যু দেখেনি বাংলাদেশ। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগেরই আছেন ৮৪ জন। এ নিয়ে দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৯ হাজার ৭৭৯ জন। আর ঢাকা বিভাগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯ হাজার ২০৩ জন।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর করোনার বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে ঢাকার বাইরের রোগীর চাপ বাড়ছেই। লকডাউনের মধ্যেই প্রতিদিনই ঢাকার বাইরে থেকে রোগী আসছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তীব্র শ্বাসকষ্টসহ ও নানা উপসর্গ রয়েছে। অধিকাংশ রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ায় প্রয়োজন হচ্ছে আইসিইউ, যে কারণে বেড়েছে আইসিইউর চাহিদা।

‘সংক্রমণ বেশি হলে মৃত্যুও বেশি হবে’ এটাই নিয়ম মন্তব্য করে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরার্মশক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, যে ভ্যারিয়েন্ট দেশে ছড়াবে বেশি, সেটা যদি অধিক মাত্রায় ক্ষতিকারক হয় তাহলে মৃত্যু বেশি হবে। সেইসঙ্গে রাজধানীর ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো করোনায় মৃত্যু ঠেকাতে প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, আমরা গত দেড় বছরেও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বাড়াতে পারিনি। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ নেই। যখন জটিল রোগীদের আইসিইউ দরকার হয় তখন তাদের ঢাকায় পাঠাতে হয়। ঢাকার হাসপাতালগুলোতেও আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও যারা পাচ্ছেন, কিন্তু সেটা শেষ মুহূর্তে। আর শেষ মুহূর্তে চিকিৎসা দিয়ে আসলে রোগীকে বাঁচানো যায় না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের ৪০ শতাংশ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যাচ্ছেন। ডিএনসিসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের পর করোনা রোগীর চাপ বেড়েছে। ঢাকার বাইরে অধিকাংশ রোগী জটিল অবস্থায় ঢাকায় আসছেন। এদের চিকিৎসা দিয়েও বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, করোনার ভয়াবহতার মধ্যেই ঈদুল আযহা উপলক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল সরকার। ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ফের কঠোর বিধিনিষেধও দেওয়া হয়েছে। তবে বিধিনিষেধ শিথিলে কোরবানির পশুর হাট, শপিং মল, মার্কেটে স্বাস্থ্যবিধি মোটেও মানা হয়নি। অনেকেই ঢাকা থেকে বাস, ট্রাক, লঞ্চে গাদাগাদি করে ঈদ করতে গেছেন গ্রামে। ঈদ শেষে ২৩ জুলাই ঢাকায় ফিরেছেনও তারা। এমনকি কঠোর বিধিনিষেধের চতুর্থ দিন গত সোমবারও ঢাকায় ফিরেছেন অনেকে। ফেরি, বাসে ছিল না স্বাস্থ্যবিধির বালাই। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে গতকালও পদ্মা পার হয়েছে হজারো মানুষ। আর এতে করে দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মৃত্যুও নতুন রেকর্ড গড়ছে।
এদিকে, দেশের আট বিভাগের মধ্যে সাত বিভাগেই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তির নমুনা থেকে জিনোম সিকোয়েন্সে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। জার্মানির গেøাবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা (জিআইএসএআইডি) অনুযায়ী, দেশের সাতটি বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৫০টি নমুনায় ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বি-১৬১৭ পাওয়া গেছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সামাজিক সংক্রমণে জর্জরিত এখন পুরো দেশ। ইতোমধ্যে রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, বর্তমান সংক্রমণে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টই বেশি।
করোনায় শূণ্য মৃত্যু লক্ষ্যমাত্রা রেখে কাজ করা দরকার মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনায় কেন এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে মৃত্যু হচ্ছে তার পর্যালোচনা দরকার, তাতে অন্তত কিছু মৃত্যু কমানো সম্ভব হতো বা হবে। একইসঙ্গে মৃত্যু কমানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠন করা পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি করোনায় মৃত্যু কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে বলেছিল, করোনায় শূণ্য মৃত্যুর টার্গেট নিয়ে কাজ করতে হবে। আর এ জন্য গত ১৭ জুন তারা একটি লিখিত প্রতিবেদন দেন, যেখানে কাজটি কীভাবে করতে হবে তার কিছু দিকনির্দেশনা ছিল। কিন্তু সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না, যদি হতো তাহলে মৃত্যু কমানো যেত বলে জানান পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল।

বেসরকারি চাকরিজীবী সারওয়ার তার ভাই রাসেলের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ায় শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখেন। তবে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউর খরচ বহন করতে না পেরে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের আইসিইউতে নিয়ে আসেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দিনে এক লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছিল। চার দিনে সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এমন খরচ আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করে এখানে নিয়ে আসছি। ডিএনসিসি ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল থেকে জানা গেছে, হাসপাতালে বর্তমানে ৫৩১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে গত সোমবার ভর্তি হন ১৩৮ জন। তাদের মধ্যে ৬০ জন রোগীকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতি রাজধানীর বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি হাসপতালগুলোতে। বাবার তীব্র শ্বাসকষ্টের উপসর্গ থাকায় তাকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন কলেজ শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, বাবার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ার পর স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করাই। তবে গত চার দিনে অবস্থার উন্নতি না হওয়ার কারণে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন আইসিইউতে নিতে হবে। তবে এখানে আইসিইউ খালি নেই। ঢাকা মেডিকেল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে করোনা সেবার জন্য ৭০৬ শয্যার মধ্যে বর্তমানে ৮টি শয্যা খালি রয়েছে। এই হাসপাতালে ২৪টি আইসিইউ আছে। বর্তমানে এর একটিও খালি নেই। ঈদের পরে ঢাকার বাইরের রোগীর চাপ বেড়েছে জানিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে যেসব রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন এর ৪০ শতাংশ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাচ্ছেন। নাসির উদ্দিন আরও বলেন, গ্রামের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সাপোর্টটা দিতে পারলে রোগী মৃত্যুর হার কিছুটা হলেও কমে আসবে। ঢাকার বাইরে থেকে রোগী আসলেও এত জটিল অবস্থায় আসতে হবে না। এই সময়টা আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীর করোনা সেবার জন্য ১৬টি হাসপাতালে ডেডিকেটেড করেছে সরকার। এর মধ্যে তিন হাসপাতালে কোনো ধরনের আইসিইউ সুবিধা নেই। অর্থাৎ, ১৩টি হাসপাতালে বর্তমানে ৩৯৩টি আইসিইউ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি আইসিইউ খালি রয়েছে। এ ছাড়া দেশে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ১ হাজার ৩২৩টি। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত খালি ছিল ২৩৮টি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন