মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০২ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

আগুন ও গোলাগুলির মুখে ‘বাড়ি’ থেকে উচ্ছেদ

আসামে শাসক দলের মুসলিম উচ্ছেদ অভিযান

নিউ ইয়র্ক টাইম্স | প্রকাশের সময় : ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৩ এএম

আহমদ আলী অসহায়ভাবে দেখেছিলেন যখন পুলিশ তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের লাঠিপেটা করে পুলিশ তার গ্রামে প্রবেশ করে। বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলে তারা গুলি চালায়, যার ফলে ১২ বছর বয়সী একটি ছেলেসহ মারা যায় দু’জন। তারপরে পুলিশ স্থানীয়দের বাড়িঘর এবং ভিতরের জিনিসপত্র, একটি বিছানা, একটি লেপ, তাদের গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য খড় ইত্যাদি পুড়িয়ে দিতে শুরু করে।
জনাব আলী ঘটনার সময়কার একটি ভিডিওতে দেশ-বিদেশের দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘দয়া করে দেখুন! আমরা কি মিথ্যা বলছি’?

গত মাসে ভাইরাল হওয়ার পর সহিংসতার ভিডিও এবং বিবরণ ভারতের অনেককে হতবাক এবং দেশের উত্তর-পূর্ব কোণে জোরপূর্বক উচ্ছেদের সরকারি প্রচেষ্টার দিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন যে, তারা বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের টার্গেট করেন, যারা গুরুত্বপূর্ণ কৃষি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমিতে বসে আছে।
কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের সাক্ষাৎকার এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, বহিষ্কৃত বাসিন্দাদের অনেকেই ভারতের মালিকানাধীন জমিতে বসবাসের অধিকার নিয়ে ভারতের বৈধ নাগরিক। এর পরিবর্তে, সরকারের সমালোচকরা বলছেন, উচ্ছেদ কার্যক্রম ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক অভিযানের অংশ বলে মনে হচ্ছে।

রাজ্যের বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য কাজ করে এমন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘তারা চায় মুসলিমরা হিন্দুদের অনুকম্পা ও দয়ায় বাঁচুক’।
নরেন্দ্র মোদি এবং তার ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভিত্তিকে আংশিকভাবে এমন উদ্যোগে চাপিয়ে দিয়েছে যা দেশের ২০ কোটিরও বেশি মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারত একটি অভিবাসন আইন পাস করে যা নিকটবর্তী দেশ থেকে আসা অননুমোদিত অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেবে যদি তারা হিন্দু বা অন্য পাঁচটি ধর্মের একজন হয়, কিন্তু মুসলিম নয়। ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে পার্টির নেতারা বিয়ের মাধ্যমে ধর্ম পরিবর্তনকে নিষিদ্ধ করার জন্য আইন প্রণয়ন করেছেন ‘লাভ জিহাদ’ নামের শব্দ ব্যবহার করে যা নিয়ে সন্দেহ করা হয় যে, এসব পদক্ষেপ কাদের লক্ষ্য করে নেয়া হচ্ছে।

কিছু কঠিন পদক্ষেপ আসামের দিকে মনোনিবেশ করেছে, যেখানে জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মুসলিম। ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে নাগরিকত্বের একটি পর্যালোচনায় আসামের ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে ফেলেছে যাদের মধ্যে অনেকেই দরিদ্র এবং মুসলিম।
এখন মোদির রাজ্যের শীর্ষ কর্মকর্তা হেমন্ত বিশ্ব শর্মার অধীনে সরকার জোর করে শত শত বা হাজার হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করেছে, যাদেরকে তারা সন্দেহভাজন বিদেশি বলে। এর এমন এক গোষ্ঠী যাদের মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন প্রধানত মুসলিম। তার সরকার সম্প্রতি রাজ্যের আদিবাসীদের জমি পুনর্বণ্টনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দলীয় নেতারা ইতোমধ্যেই হেমন্ত বিশ্ব শর্মাকে আরো উচ্ছেদের আদেশ দিতে এবং জনবহুল জমিতে আরো কৃষি প্রকল্প নির্মাণ করতে বলছেন।

এ বিষয়ে আসামের কর্মকর্তা এবং দলের নেতাদের মন্তব্য জানানোর অনুরোধে সাড়া মেলেনি। মি. শর্মা অস্বীকার করেছেন যে, এসব উচ্ছেদ মুসলিম বিরোধী। তারা বলেছে যে, তাদের প্রতি ‘জনসাধারণের সমর্থন’ রয়েছে।
সবুজ পাহাড় এবং চা বাগানের জন্য বিখ্যাত একটি রাজ্যে এ অভিযান চলছে এবং যেখানে অনেকেই ভারতীয় হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আগে নিজেদের অসমিয়া মনে করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই যারা অসমীয়া ভাষায় কথা বলেন, তারা কখনও কখনও ভারতীয় শাসনের অধীনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে ইন্ধন জুগিয়েছেন।
অনেক আদিবাসী অসমীয়া, হিন্দু এবং একইভাবে মুসলিম দীর্ঘদিন ধরে চিন্তিত যে, তারা তাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলবে এমন অভিবাসীদের কাছে যাদের বেশিরভাগ বাংলাদেশের মুসলিম যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ অজুহাতে অতীতে সরকারি জমি থেকে বিদেশী হিসাবে বিবেচিত লোকদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ উচ্ছেদ অভিযানে দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে থাকা আসামের একজন আইনজীবী সান্তনু বোর্ঠাকুর বলেছেন, আজ বিজেপি এসব জটিলতাকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছে যে, হিন্দুদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সরাসরি আরো বেশি করে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘তারা মানুষের আশঙ্কাকে পুঁজি করতে সক্ষম হয়েছে’।
জোরপূর্বক উচ্ছেদ কয়েক দশক ধরে চলছে, কিন্তু ২৩ সেপ্টেম্বর সংঘর্ষ তাদের একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক দর্শক দিয়েছে। আলী এবং আরো এক ডজন গ্রামবাসীর মতে, নিরাপত্তা বাহিনী পশ্চিম আসামের ধলপুরে বিক্ষোভ দমনে লাঠি ব্যবহার করেছিল। যখন দলের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তারা বলেছিল, প্রতিবাদকারীরা বাঁশের লাঠি নিক্ষেপ করে পাল্টা লড়াই করেছিল। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। তারা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে এবং মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙচুর করেছে বলে এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন।
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মইনুল হকের মৃত্যু সেই ঘটনাই চিত্রায়িত করেছিল যা ভারতের অধিকাংশই দেখেছে। একটি ভিডিওতে দেখানো হয়েছে যে, তিনি হাতে একটি লাঠি নিয়ে বিশাল একদল অফিসারের দিকে তেড়ে যাচ্ছন। কয়েক সেকেন্ড পর গুলির শব্দ হয় এবং মইনুল হক মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে লাঠি দিয়ে মারতে থাকে। তারপর, স্থানীয় সরকারের জন্য কাজ করা একজন ফটোগ্রাফার মইনুল হকের শরীরের ওপর লাফাতে থাকে। এক পর্যায়ে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়।

পরিবার দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তার সরকারের জারি করা পরিচয়পত্র দেখিয়েছে, যাতে দেখা গেছে জনাব মইনুল হক একজন ভারতীয় নাগরিক। পরিবারের সদস্যরা তাকে ২৮ বছর বয়সী লাজুক প্রকৃতির মানুষ বলে বর্ণনা করেছেন। তারা এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নদী ব্রহ্মপুত্রের তীরে টিনের চাল এবং শক্ত কাঠের বিছানাসহ একটি বালুকাময় দ্বীপে একটি অস্থায়ী বাড়িতে বাস করে।
সাম্প্রতিক এক সফরে দেখতে পাওয়া যায় মইনুল হকের বিধবা স্ত্রী মমতাজ বেগম কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘ওকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচবো’? তাদের ৯ বছরের মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি কীভাবে বাচ্চাদের বড় করব’?

মইনুল হকের আত্মীয়রা জানান, নিরাপত্তা কর্মীরা হুমকি দিয়ে বলে, তারা যদি তাদের কাছে আসে বা তার লাশ স্পর্শ করে তাহলে তাদের গুলি করে মারবে। তারা তার লাশকে একটি বুলডোজারের সাথে বেঁধে রাখে এবং ময়না-তদন্তের জন্য পাঠানোর আগে এটিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে মন্তব্য করার অনুরোধে পুলিশ সাড়া দেয়নি।

হকের ছোট ভাই আইনুদ্দিন বলেন, ‘তারা শুধু আমাদের নির্যাতন করতে চায়, কারণ আমরা মুসলিম’।
সাক্ষাৎকার নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা বেশিরভাগ মুসলমান ছিলেন যারা অসমিয়া এবং বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন। কখনও কখনও মিশ্রিত ভাষায় বলেন যে, তারা কয়েক দশক ধরে এ জমিতে বসবাস এবং চাষ করতেন। মইনুল হকের পরিবার এবং অন্যরা যেসব প্রমাণ পেশ করেছিল তাতে দেখা যায় যে, যে জমিতে বসবাস করত তারা সেটার কর দিয়েছে।

তা সত্ত্বেও, সরকার ওইসব লোকদের কৃষিকাজের জন্য জমি উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে যাদেরকে তারা আদিবাসী (ধলপুরে নতুন ভূমিহীনদের একটি দল যারা মূলত হিন্দু) মনে করে।
নিউইয়র্কের বার্ড কলেজের রাজনৈতিক অধ্যয়নের অধ্যাপক সঞ্জীব বড়ুয়া বলেছেন, ‘বিজেপি ‘আদিবাসী’ দ্বারা একটি জিনিস বোঝায় এবং সবাই এর সাথে সহমত’।
একটি সাম্প্রতিক সফরে দেখা গেছে, একটি হিন্দু মন্দিরের চারপাশে ট্রাক্টর জমি চষে বেড়াচ্ছে, যা ছিল বহাল তবিয়তে।

মন্দিরের একজন হিন্দু পুরোহিত উধ্বব দাস বলেন, ‘এসব লোকদের উচ্ছেদ করা ভালো ব্যাপার। হিন্দুরা তাদের জমি ফিরে পাবে’।
কর্তৃপক্ষ কীভাবে মসজিদ এবং একটি মাদরাসা ভেঙে ফেলেছে জানতে চাইলে উধ্বব দাস বলেন, ‘হিন্দুদের মসজিদ ও মাদরাসার প্রয়োজন নেই’।
আইনজীবী এবং বিরোধী রাজনীতিকরা সতর্ক করেছেন যে, আসামের রাজনৈতিক বিভাজন ধর্মীয় উত্তেজনাকে আরো বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। বিরোধী ব্যক্তিত্ব এবং কর্মী অখিল গগৈ বলেন, ‘এটি একটি বর্বর সরকারের বর্বর কাজ’। ভারতের কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মি. গগৈ চার মাস আগে কারাগার থেকে মুক্তি পান।

কমলা স্কার্ফ পরা ১৮ বছর বয়সী মেয়ে সাহেরা খাতুন ব্রহ্মপুত্র অতিক্রমকারী রিকি নৌকায় দাঁড়িয়ে তার বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, তার পরিবারকে এখনও উচ্ছেদ করা হয়নি, কিন্তু সরকার সম্প্রতি তাদের প্রজন্ম ধরে চাষ করা জমি দখল করেছে। তাদের আশঙ্কা, পরবর্তীতে তাদের বিদায় করা হবে। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র’।

কৃষক আলী জানান, সেদিন আগুন তার পুরনো কাগজপত্রসহ জমিতে তার দাবি প্রতিষ্ঠার কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ সেদিন বিকেলে যা পুড়িয়েছিল তা শুধু মানুষের বাড়ি ছিল না, ছিল তাদের স্বপ্নও। তিনি আরো বলেন, ‘আগুন শুধু বাইরে জ্বলছিল না, এটা যেন জ্বলছিল আমার ভিতরেও’।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (8)
Elias Uddin ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৫৮ এএম says : 0
জাতিসংঘ এখন নীরব দর্শক
Total Reply(0)
Md Tahidul Islam ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৫৮ এএম says : 0
ভারতের দাদারা নিজের দেশের মানুষের সমস্যা খুঁজে পায় না, অন্য দেশ নিয়ে মাথা ব্যাথা।
Total Reply(0)
Nahid Islam ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০১ পিএম says : 0
ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশের হিন্দুদের বাড়ি পরিদর্শনে যায়। বাংলাদেশের হাইকমিশনারদের সেই কলিজা হবে?
Total Reply(0)
Nasir Parvez ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৫৯ এএম says : 0
উগ্র হিন্দুত্ববাদ সমাজ দেশ ও রাষ্ট্রের বিষ পোড়া।
Total Reply(0)
Johirul Islam ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৫৯ এএম says : 0
আল্লাহ তুমি সকল মুসলমানদেরকে বাঁচাও
Total Reply(0)
মোঃ আল আমিন মুন্সি ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০০ পিএম says : 0
এখন সবাই চুপ থাকবে কারন ওরা মুসলিম
Total Reply(0)
MH Masuk ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০২ পিএম says : 0
এ জায়গার অসাম্প্রদায়িক চেতনা কই
Total Reply(0)
Md Amdad ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৩ পিএম says : 0
ইয়া আল্লাাহ্!! ! সারা বিশ্বের সকল মুসলমানদের তুমি হেফাজত করো।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন