ঢাকা শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ০২ মাঘ ১৪২৭, ০২ জামাদিউল সানী ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিকল্প নেই

প্রকাশের সময় : ২ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও কার্যকরভাবে পৃথক হয়নি বিচারবিভাগ। বিচারকদের নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতি সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ এখনো নির্বাহী বিভাগের হাতে। পৃথকীকরণের আগে এ দায়িত্ব ছিল সংস্থাপন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে। এখন সেটি নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বাধীন আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। মাসদার হোসেন মামলায় বিচার বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা থাকলেও বিচার বিভাগ পৃথকের ৯ বছরেও স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদত্ত একবাণীতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি ও বদলির ক্ষমতা এককভাবে সুপ্রিম কোর্টের হাতে না থাকায় দ্বৈত শাসন সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির অবসানে ১৯৭২-এর সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রবর্তন চান প্রধান বিচারপতি। তিনি মনে করেন সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের ধীরগতির অন্যতম কারণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্তরায় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আইনজীবীরা একটি ইংরেজি দৈনিককে বলেছেন, যতক্ষণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ করা হবে ততক্ষণ বিচারবিভাগ স্বাধীন হবে না। নিম্ন আদালতে সরকারি প্রভাবের প্রসঙ্গও তারা উল্লেখ করেছেন। সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, নিম্ন আদালতের বিচারকগণ এখন পর্যন্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণে। যতক্ষণ নিম্ন আদালতের উপর সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণ তদারকি প্রতিষ্ঠিত না হয়, ততক্ষণ নিম্ন আদালতের কোন স্বাধীনতা থাকবে না।
একটি দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে রয়েছে তা নির্ধারণ করা হয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিরিখে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার কোন সুযোগ নেই। প্রকৃত বিবেচনায় কোন দেশের সরকারের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণের মাপকাঠি হচ্ছে বিচার বিভাগের দক্ষতা ও যোগ্যতা। বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কার্যত এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা না থাকাটা সত্যিই দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন খোদ প্রধান বিচারপতি। তিনি স্পষ্ট করেই এ ব্যাপারে বলেছেন, আমাদের মূল সংবিধানে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়টি স্পষ্ট করে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে পৃথকীকরণের জন্য অতীতে আন্তরিকভাবে উদ্যোগ গৃহীত হয়নি বরং সামরিক সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিভিন্ন সময়ে লঙ্ঘিত হয়েছে। সিনিয়র আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও বলছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারক নিয়োগের ফলেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণœ নেই। একথা বোধহয় সকলেই স্বীকার করবেন যে দেশে গত কিছুদিন ধরে যে ধরনের আলোচনা চলছে সে বিবেচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খুবই স্পর্শকাতরতা লাভ করেছে। নিম্ন আদালতের বিচার কার্যক্রম নিয়ে ইতোমধ্যেই নানামুখী আলোচনা শুরু হেয়েছে। সরকারের অভিপ্রায় বাস্তবায়নই তাদের মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহল থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। একথা সর্বজনবিদিত যে কোন রাষ্ট্রে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে কোন ধরনের অবিচার বা নির্যাতন-নিবর্তন হলে তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে বিচারবিভাগ। সে বিবেচনায় বিচারবিভাগ যদি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন না থাকে তাহলে জনগণের আশানুরূপ ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে এক ধরনের সংশয় থেকেই যায়। এই প্রসঙ্গের আলোচনা কার্যত দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অংগনেও পৌঁছেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক নয়, এর বাস্তব দিকও রয়েছে। প্রধানবিচারপতি পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে প্রতি ১০ লাখের জন্য ১০৭ জনবিচারক জন্য রয়েছে সেখানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখের জন্য রয়েছে ১০জন বিচারক। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে বিচারকদের জন্য রয়েছে এজলাস সংকট। জনবলসহ অবকাঠামোগত সংকটও প্রবল। এখন পর্র্যন্ত অবস্থা এই যে বিচারকদের এজলাস না থাকার কারণে বিচারিক কর্মঘন্টার পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না- যা মামলা নিষ্পত্তিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য। সে বিবেচনা থেকেই সংবিধানে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর কতটা নাগরিকরা পাচ্ছে বা পাবার মত অবস্থায় রয়েছে অথবা পাবার অন্তরায় কী এসব সুনির্দিষ্ট করে থাকে সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টই হচ্ছে সংবিধানের অভিভাবক। সেদিক থেকে বলা যায়, বিচার বিভাগেরই যদি স্বাধীনতা না থাকে তাহলে এসবের দেখভাল করবে কে ? বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়া হলে কার্যত দেশের বিদ্যমান সংকটেরও অনেকখানি সমাধান হয়ে যাবে। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা গেলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপরাধীরা তো বটেই এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বৈরতন্ত্র, নির্বাচনকালীন অপকর্ম, অগণতান্ত্রিক আচরণসহ ন্যায় বিচার ও সুশাসন বিনাশী সংস্কৃতি চর্চাকারী এবং নানা পর্যায়ের অন্যায়কারীরা আপনাতেই লেজ গুটাতে বাধ্য। বিচারবিভাগ স্বাধীন মত কাজ করতে পারলে এবং বিচারক নিয়োগকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করা গেলে প্রকৃতপক্ষেই নবযুগের সূচনা হবে। দ্বৈতশাসন কখনোই কাম্য হতে পারেনা। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচারবিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্টরা যতœবান এবং আন্তরিক হবেন -এটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Nimay Debnath ২ নভেম্বর, ২০১৬, ১:২৭ এএম says : 0
গণতন্ত্রকে সুসংহত, অর্থবহ ও সত্যিকারের মর্যাদা দান করতে হলে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার কোন বিকল্প নাই। মূল কথা, গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা বিচারের মানদন্ড নির্ভর করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপর। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ হবে ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার এক অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ; এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন