বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯, ২৮ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

সড়কে মৃত্যুর মিছিল

ড. মোহা. হাছানাত আলী | প্রকাশের সময় : ১৭ মে, ২০২২, ১২:০২ এএম

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় করুণ মৃত্যু কোনভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। দিনদিন সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মাসে সংঘটিত দুর্ঘটনার সংখ্যা সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশে সর্বমোট ৪২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নারী ও ৮১ জন শিশুসহ মোট ৫৪৩ জন নিহত ও ৬১২ জন আহত হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মাসে ১৮৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২০৬ জন, যা মোট নিহতের ৩৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার সর্বোচ্চ ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছে ৮৭ জন, যা মোট নিহতের ১৬ শতাংশ।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও মৃত্যু সবচেয়ে বেশি। মোটরসাইকেলের সহজলভ্যতা এর জন্য অনেকটা দায়ী। তাছাড়া মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট না পরা, ট্রাফিক আইন না মেনে দুইজনের অধিক আরোহণ করা, চালকদের বেপরোয়া মনোভাব দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘ করছে। ২০২১ সালে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলো ২২১৪ জন। পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম সাত দিনে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় আহত ১৪৭৪ জন তাদের নিকট থেকে সেবা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কারো হাত বা পা ভাঙলে সুস্থ হতে গড়ে ৩ থেকে ৯ মাস সময় লেগে যেতে পারে।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল বিক্রির পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। আঞ্চলিক সড়কে মোটর সাইকেল চালানোর নিয়ম মানছে না চালকরা, চালক ও আরোহীরা হেলমেট পড়ে না এক মোটরসাইকেলে দুইজনের বেশি না ওঠার নিয়ম মানা হয় না, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল অহরহ চলাচল করে, অনেকের আবার মোটরসাইকেল চালানোর কোনো প্রশিক্ষণ নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল ১৫ লাখের কম। বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। এদিকে গ্রামে গঞ্জে অন্তত আরো ১৫ লাখ অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল চলাচল করে থাকে। ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর তিন লাখের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হচ্ছে।

বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এভাবে মোটরসাইকেলকে সহজলভ্য করেনি। গণপরিবহনকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বিকল্প হিসেবে মোটরসাইকেলের বিক্রয় ও ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়কে যাত্রী নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল চালাতে আইনসম্মতভাবে হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পরই বেশি হতাহত হয়েছে সাধারণ পথচারী।

সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, সচারচার যেসব কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে তার মধ্যে অন্যতম হলো ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, যানবাহনের বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার কারণে সড়কে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে এ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন। দুর্ঘটনা রোধে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা এবং এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা (সার্ভিস রোড) তৈরি করা, পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করা, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের ওপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই কমতে পারে।

দুর্ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সড়কে যেভাবে মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে, তা যে করেই হোক কমাতে হবে। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। দক্ষ চালক তৈরির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক চালক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া সড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা না গেলে মৃত্যুর মিছিল দিনদিন আরো বৃদ্ধি পাবে। দুর্ঘটনার কারণে যে শুধু মানুষের মৃত্যু হয় তা কিন্তু নয়। বরং বহু মানুষ পঙ্গত্ব বরণ করে। একটি পরিবারের কর্মক্ষম মানুষ যখন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে বা পঙ্গু হয়ে যায়, তখন সেই পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পতিত হয়ে নিদারুন কষ্টে দিনাতিপাত করে। এরকম হাজারো পরিবার সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সড়ক দুর্ঘটনা দেশের উন্নয়নে অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তাই সময়ক্ষেপণ নয়, বরং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সড়ক ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নয়নসহ আইন প্রয়োগে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে।

লেখক: প্রফেসর, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
drhasnat77@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps