শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯, ০২ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

স্বাস্থ্য

বন্যা গরমের এই সময়ে ডায়রিয়া

| প্রকাশের সময় : ২৭ মে, ২০২২, ১২:৩২ এএম

বন্যা পরিস্থিতি ও প্রচন্ড গরমের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েই চলেছে। ডায়রিয়া প্রতিরোধে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা। এই ডায়রিয়ার কারনের মধ্যে এবার কলেরাও সনাক্ত হয়েছে। কলেরা গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের পেটের অসুখ। এক সময় এগুলো মহামারী আকারে ছড়াতো এবং শহর-গ্রামের মানুষ দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো। একসংগে কয়েকটি গ্রামের মানুষ কলেরার আক্রমণে উজাড় হয়ে যাবার কথা এখন শুধু গল্প। দূষিত পানি পান পরিহার ও সামান্য স্যালাইন পানির আবিষ্কারে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কলেরা-ডাইরিয়ার সংক্রমণ থেমে যায়নি। এখনও বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এসব রোগে বহু মানুষ মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে সারা বছর কোথাও না কোথাও ডাইরিয়ার প্রকোপ বেড়ে যেতে দেখা যায়। গরম শুরু হলে এর প্রকোপ বেড়ে যায়। বড় বড় শহরের দরিদ্র ও জনবহুল এলাকায় এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পরে। এবছর মার্চের শুরু থেকে রাজধানীর নিম্ন আয়ের বস্তি এলাকাগুলোতে এর প্রকোপ প্রবল হয়ে উঠতে থাকে।

বর্তমানে করোনার ভয় কমে যাওয়ায় বিত্তবান পরিবারের মানুষ ভ্রমণে বের হয়ে পুনরায় দোকানের ফাষ্টফুড খেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। সমুদ্র সৈকত, পর্যটন কেন্দ্র এবং শহরের দামী রেস্তোরাগুলোতে পার্শেল অর্ডার এবং সশরীরে গ্রাহকদের গণভীড় দেখে তাই মনে হয়। হঠাৎ বাইরের খাবারের প্রতি আকর্ষণ ও নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় ডাইরিয়া-কলেরার মতো পেটের পীড়া বেড়ে গেছে। এছাড়া শহরের দরিদ্র এলাকাগুলোতে সুপেয় পানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে দূষিত পানি ব্যবহার করছেন। দ্রব্যমূল্যস্ফীতির ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে গছে। পথের পাশে কমমূল্যে পাওয়া যায় এমন খাদ্য তারা গ্রহণ করছেন। ফলে বহুদিন ধরে নোংরা ড্রামে রক্ষিত পানি ও নিম্নমানের ভাজা-পোড়া, পঁচা, বাসি খাবার খেয়ে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশী।

আর চলতি বছরে সারাদেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় তিন লাখেরও বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে মৃত্যুর হিসাব না থাকলেও রাজধানীর মহাখালীতে কলেরা হাসপাতালে মারা গেছেন ২৯ জন। মার্চ থেকে এই পর্যন্ত আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে ৪৫ হাজারের অধিক রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন।
কলেরা রোগের ইতিহাসঃ- ১৮১৭ সালে এ মহামারীর প্রাদুর্ভাব প্রথম দেখা দেয়। কলকাতা থেকে কলেরা ছড়ানো শুরু হয়। ক্রমে তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, চীন প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সে সময় এক কলকাতাতেই গড়ে প্রতি হাজারে ১১-১২ জন মানুষ মারা যেত। এ সময় কলেরায় বাংলায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। কলেরা ছড়ানোর পেছনে জীবাণুবাহিত পানিপান ছিল সবচেয়ে বড় কারণ। সে যুগে গ্রাম-বাংলায় পুকুর ও নদীর পানির ওপরই ভরসা ছিল। রোগের কারণ শনাক্তের পর মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা নেয়া হতে থাকে। এ সচেতনতার পথ ধরেই ক্রমে কমে আসতে থাকে কলেরার প্রাদুর্ভাব।

ডায়রিয়ার লক্ষণঃ-
ডায়রিয়ার প্রধান উপসর্গগুলো হলো মলত্যাগের জন্য প্রচন্ড চাপ অনুভূত হওয়া এবং ঘনঘন পাতলা পায়খানা। এ ছাড়াও বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, পেটে চাপ অনুভূত হওয়া, পেট ফোলা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অবস্থায় ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হয়। পানিশূন্যতার লক্ষণগুলো হলো প্রচন্ড ক্লান্তি, শুকনো শ্লেষ্মা, হৃদ্স্পন্দন বৃদ্ধি, মাথাব্যথা, তৃষ্ণা বৃদ্ধি, প্রস্রাব হ্রাস ও শুষ্ক মুখ।

বাচ্চারা ডায়রিয়া এবং পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে বেশ সংবেদনশীল। এ সময় বাচ্চাদের প্রস্রাব কমে যায়, মুখ শুকিয়ে যায়, মাথাব্যথা হয়, ক্লান্ত দেখায়, কান্নার সময় চোখে পানি থাকে না, চোখ আধবোজা-আধখোলা অবস্থায় থাকে, তন্দ্রাতুর দেখায় এবং সবসময় বিরক্ত থাকে।
ডায়রিয়া হলে করণীয়ঃ সাধারন ডায়রিয়া কোন চিকিৎসা ছাড়াই কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যেতে পারে। শরীর খারাপের সময়টুকু বিশ্রামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানীয় পান করতে হয় এবং অন্যান্য খাবারের সময় সতর্ক থাকতে হয়।

শরীরকে পানিপূর্ণ রাখার জন্য খাবার স্যালাইন, পরিষ্কার তরল পানি ও ফলের রস খেতে হবে। এ সময় দিনে প্রায় ২-৩-৪ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। একবারে টান দিয়ে পুরো গলাধঃকরণের পরিবর্তে অল্প পরিমাণে চুমুক দিয়ে পান করা যেতে পারে।

যে খাবারগুলো ডায়রিয়া বা শরীরে গ্যাসের অবস্থা আরও খারাপ করে এমন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এগুলোর মধ্যে আছে চর্বিযুক্ত বা ভাজা খাবার, কাঁচা ফল এবং শাকসবজি, মসলাদার খাবার, মটরশুঁটি ও বাঁধাকপি এবং ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়, যেমন: কফি ও সোডা।

যদি শরীর নেতিয়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায় বা বমি হতে থাকে, তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয় বা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আরও কিছু উপসর্গ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এগুলো হলো অবিরাম বমি, ক্রমাগত ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, উল্লেখযোগ্য হারে ওজন হ্রাস, মলের মধ্যে পুঁজ ও রক্ত, কালো মল বের হওয়া ইত্যাদি

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ডায়রিয়া, জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি, রক্ত ও পুঁজ মল এবং কালো মল। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে ডায়রিয়া হলে ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কথা বলতে পারেন।

কী কী কারণে ডায়রিয়া হয়:
ভাইরাসঃ ডায়রিয়ার ভাইরাসগুলোর মধ্যে রয়েছে নরোভাইরাস, অ্যাস্ট্রোভাইরাস, এন্টারিক অ্যাডেনোভাইরাস, ভাইরাল হেপাটাইটিস ও সাইটোমেগালোভাইরাস। রোটাভাইরাস বাচ্চাদের ডায়রিয়ার তীব্রতার জন্য দায়ী। কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসও ডায়রিয়া সংক্রান্ত জটিলতার সৃষ্টির পেছনে কাজ করে।

দূষিত পানি নরোভাইরাস, অ্যাস্ট্রোভাইরাস, হেপাটাইটিস এ ভাইরাস এবং স্যাপোভাইরাসের একটি বড় উৎস। হিমায়িত সবজি হেপাটাইটিস এ ভাইরাসের বড় উৎস। নোরোভাইরাস থাকে পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি এবং তাজা ফলের মধ্যে। হেপাটাইটিস এ এবং নোরোভাইরাস সংক্রমণ অনুপযুক্ত খাদ্য পরিচালনার মাধ্যমেও হয়ে থাকে।

ব্যাকটেরিয়া এবং পরজীবীঃ
দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ই কোলাই, কলেরার মতো প্যাথজেনিক ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংস্পর্শে আসার ফলে ডায়রিয়া হয়। দূষিত পানি ছাড়াও ই কোলাই কাঁচা বা কম রান্না করা গরুর মাংস, কাঁচা শাকসবজি এবং পাস্তুরিত দুধে থাকে।

ল্যাকটোজ সমস্যাঃ- ল্যাকটোজ হলো দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত দ্রব্যে পাওয়া এক ধরনের চিনি। যাদের ল্যাকটোজ হজম করতে অসুবিধা হয়, তাদের দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর ডায়রিয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাটি বাড়তে পারে।

হোমিও সমাধানঃ রোগ নয় রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। অভিজ্ঞ চিকিৎসক গন প্রাথমিক ভাবে যেইসব মেডিসিন নির্বাচন করে থাকেন। আর্সেনিক, ক্রোটন টিগলিয়াম, চায়না, ফসফরিক এসিড, পালসেটিলা, ভিরেট্রাম এলবাম, পডোফাইলাম, ইলেটোরিয়াম, গ্রেটিওলার ইত্যাদি

ডায়রিয়া প্রতিরোধের কিছু উপায়ঃ-
নিয়মিত হাত ধোয়া-যেকোনো ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচার মোক্ষম উপায় হলো খাবার তৈরি ও খাওয়া আগে এবং পরে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নেওয়া। রান্না করা, টয়লেট ব্যবহার, বাচ্চার ডায়াপার পরিবর্তন, হাঁচি, কাশি এবং নাক ফুঁকানোর পর হাত ধুয়ে নেওয়া জরুরি।

ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা- যেখানে ভ্রমণ করা হচ্ছে সেখানকার অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং দূষিত খাবার নিমেষেই শরীরকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে নিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে করণীয়গুলো হলো: নতুন জায়গায় খাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। গরম ও ভালোভাবে রান্না করা খাবার খান। কাঁচা ফল এবং শাকসবজি এড়িয়ে চলতে হবে। অবশ্য সেগুলো রান্নার জন্য প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ নিজেই করলে খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও কাঁচা বা কম রান্না করা মাংস এবং দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। নতুন জায়গার পানীয়র ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বোতলজাত পানি বা সোডা বোতল থেকেই পান করা উচিত। এমনকি দাঁত ব্রাশ করার জন্যও বোতলজাত পানি ব্যবহার করা উচিত।

পরিশেষে, ডায়রিয়া একটি সাধারণ রোগ। আজকাল ডায়রিয়া বা কলেরায় মৃত্যুর হার খুবই কম। কিন্তু আক্রান্ত হলে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে, কার্যক্ষমতা কমে যায়। তাই সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও উচিত ডায়রিয়া প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং টাটকা খাবার খেতে হবে। পঁচা ও বাসি খাবার খাওয়া যাবে না। বাজারের খোলা খাবার খাওয়া যাবে না। বৃদ্ধ ও শিশুদের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে।

ষ মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।
ইমেইল- drmazed96@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps