শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯, ০১ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

স্বাস্থ্য

বুকের দুধ শিশুর জীবন্ত অবলম্বন

| প্রকাশের সময় : ২৭ মে, ২০২২, ১২:৩২ এএম

জন্মের পরপরই নবজাতক অত্যন্ত অসহায় থাকে। পৃথিবীর হাজারো ধরনের খাবার চিবানোর মতো দাঁত আর হজম করার সামর্থ্য তার থাকে না। ভাত হজম করার এমাইলেজ রস ও চর্বি হজম করার লাইপেজ রস পরিমিত পরিমাণে থাকে না। পেটের নাড়িভুঁড়ি মিউকোনিয়াম নামক একগাদা ময়লা দিয়ে ভর্তি থাকে। অন্ত্রের দেয়ালের স্থানে স্থানে বড় বড় ছিদ্র থাকে যা দিয়ে খাদ্যের প্রোটিন কণা অপরিশোধিতভাবে শোষিত হয়ে এলার্জির জন্ম দেয়। নবজাতকের কিডনির ক্ষমতাও জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন সীমিত থাকে। তাই কিডনির সামর্থ্যরে চাইতে বেশি পরিমাণ পানি-লবণ-খাবার নবজাতককে দিলে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দুর্বল থাকে। রোগজীবাণু নাশক টিসেল ও এন্টিবডি কম থাকে। তার মস্তিষ্কের কোষগুলো কচি ও অপরিপক্ব থাকে। তাই নবজাতকের জন্য এমন খাবার প্রয়োজন যা কিডনির উপর চাপ সৃষ্টি না করেই শরীরের অভাব পূরণ করে সহজে হজম হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় আর মস্তিষ্ককে সজীব করে তোলে।

একজন মা যেমন তার সন্তানের প্রয়োজনের প্রতি সদাসতর্ক দৃষ্টি রেখে তাকে লালন-পালন করেন ও খাবার দেন, একজন স্ত্রী যেমন তার স্নেহময়ী পরশ দিয়ে স্বামীর প্রয়োজন ও পছন্দমাফিক খাবার মেনু দিয়ে খাবার টেবিল সাজিয়ে রাখেন তার চাইতে অনেকগুণ বেশি যত্নের স্বাক্ষর রেখে আল্লাহতায়ালা মায়ের দুধের মধ্যে নবজাতকের সমস্ত প্রয়োজন পূরণের ও তার সমস্ত অক্ষমতাকে কাটিয়ে উঠার ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

গরুর দুধের বা টিনের দুধের প্রোটিন বিটা ল্যাকটগ্লোবুলিন ও ক্যাসিন সহজপাচ্য নয় ও এলার্জি সৃষ্টিকারী বিধায় মায়ের দুধে ক্যাসিনের পরিমাণ কম (৮০%-এর স্থলে ৩৫%) বিটা ল্যাকটগ্লোবুলিনের পরিবর্তে সহজপাচ্য আলফা ল্যাকটগ্লোবুলিন রাখা হয়েছে। যাতে শিশুর অপরিপক্ব কিডনির উপর অত্যধিক চাপ না পরে। খিঁচুনি না হয় সেজন্য মায়ের দুধের প্রোটিন, ঘনত্ব, সোডিয়াম, ফসফেটের পরিমাণ যথাক্রমে গরুর দুধের ১/৩ ভাগ, ১/৩ ভাগ, ১/৪ভাগ ও ১/৭ ভাগ রাখা হয়েছে। যে প্রজাতির নবজাতক যত তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় প্রকৃতিগতভাবে তাদের দুধে প্রোটিনের পরিমাণ তত বেশি। গরু-মহিষের বাছুরের তুলনায় মানুষের নবজাতক শিশু অনেক আস্তে আস্তে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় বিধায় মানুষের দুধে প্রোটিনের পরিমাণ গরুর দুধের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। নবজাতকের মস্তিষ্ক জন্মের পর দু’বছর পর্যন্ত খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শিশুর মস্তিষ্কের এই বিশেষ বৃদ্ধির প্রতি লক্ষ্য রেখে মায়ের দুধকে সিসটিন ও টরিন নামক এমাইনো এসিড দিয়ে সমৃদ্ধ করা হয়েছে যাতে মস্তিষ্কের কোষগুলো তাড়াতাড়ি পূর্ণতায় পৌঁছতে পারে। অথচ টিনের দুধে এ উপদানগুলো পরিমিত পরিমাণে থাকে না।

পৃথিবীতে এমন কোনো খাবার পাওয়া যাবে নাÑ যার সাথে খাবার হজম করার রসও সরবরাহ করা হয়। মায়ের দুধ এমনই একটি ব্যতিক্রমী খাবার। নবজাতকের চর্বি হজম করার শক্তি থাকে না। এই অপূর্ণতাকে কাটিয়ে উঠার জন্য মায়ের দুধের সাথে চর্বি হজম করার জীবন্ত রস লাইপেজ সরবরাহ করা হয়। তাছাড়া চর্বির অত্যাবশ্যকীয় উপাদান অ্যাসেনসিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড মায়ের দুধে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে যাতে শিশুর অতি কচি মস্তিষ্ক কোষ, চক্ষু কোষ, রক্ত সরবরাহনালী সুগঠিত হতে পারে। মায়ের দুধের ওসমলালিটি বা ঘনত্ব গরুর দুধের ১/৩ ভাগ রাখা হয়েছে যাতে তা মানুষের রক্তের সাথে সামঞ্জস্যশীল হতে পারে। যাতে অতিরিক্ত ঘনত্বের কারণে নবজাতকের ও শিশুর মস্তিষ্ক, কোষ ও কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি না হয়। মায়ের দুধের আয়রন গরুর দুধের তুলনায় ৫ গুণ দ্রুত শরীরের কোষে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া মায়ের দুধে ট্রান্সফেরিন নামক আয়রন বহনকারী প্রদার্থ থাকে যা লোহার কণিকাগুলোকে অন্ত্রের কোষ থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তের মাধ্যমে বহন করে নিয়ে যেতে পারে। এজন্যই যেসব শিশু মায়ের দুধ খায় তারা রক্তশূন্যতায় ভোগে না।

শিশুর জন্মের পরপরই প্রথম ৩-৪ দিন ঘন কষের মতো শালদুধ আসে। এই শালদুধকে অনেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফেলে দেন। আল্লাহতায়ালা কিছুই অপ্রয়োজনীয় সৃষ্টি করেননি। শালদুধ দুধের চাইতেও অনেক অনেকগুণ বেশি উপকারী। শালদুধ প্রথমে অন্ত্রে জমানো মিউকোনিয়ামের ময়লা খুব তাড়াতাড়ি শরীর থেকে বের করতে সাহায্য করে। শালদুধে এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর নামক একটা পদার্থ থাকে যা অন্ত্রের দেয়ালে বড় বড় ফুটোগুলোকে সিল করে দেয় যাতে ক্ষতিকারক বস্তু শিশুর শরীরে ঢুকে এলার্জির সৃষ্টি করতে না পারে। শালদুধে ভিটামিন ‘এ’র পরিমাণ অনেক বেশি থাকায় নবজাতক ও শিশু ভিটামিন ‘এ’র অভাবে ভোগে না।

মায়ের দুধে বিশেষত শালদুধে বিশেষ একটা পদার্থ থাকে। যা নবজাতকের অন্ত্রকে নিরীহ জীবাণু ল্যাকটোবেসিলাস দিয়ে ভর্তি করে দেয় ফলে ক্ষতিকর জীবাণু ইকোলাই শরীরে ঢুকে ডায়রিয়া ও ক্ষতিকর অসুখ সৃষ্টি করতে পারে না। পৃথিবীর জীবাণুময় বৈরী পরিবেশে নবজাতক যাতে বেঁচে থাকতে পারে সেজন্য মায়ের দুধে বিশেষত শালদুধে জীবাণুনাশক জীবন্ত এন্টিবডি (বিশেষত ইমিউনোগ্লোবুলিন এ) ল্যাকটোফেরিন, ট্রান্সফারিন, ভিটামিন বি-১২ সংযোগ প্রোটিন, জীবন্ত কোষ (টিসেল, ম্যাক্রোফেজ) থাকে। এভাবেই নবজাতকের মা-নানীরা বছরের পর বছর অসুখে ভুগে ভুগে যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন তার একটা অংশ নবজাতক মায়ের দুধের মাধ্যমে বিনা পরিশ্রমে পেয়ে যায়। আর অসহায় নবজাতক মায়ের দুধের সহায়তায় জীবাণুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শালদুধ অন্ত্রকে ময়লামুক্ত করে উপকারী জীবাণু দিয়ে ভর্তি করে অন্ত্রের অবাঞ্ছিত ছিদ্র বন্ধ করে অন্ত্রের দেয়ালে দেয়ালে জীবাণুনাশক এন্টিবডি ও কোষ জমা করে শিশুর খাদ্যনালীকে এক মিনিদুর্গে পরিণত করে। শালদুধ শিশুর জীবাণু প্রতিরোধক প্রথম প্রাকৃতিক টীকা।

বুকের দুধ বাজারে পাওয়া রকমারী টিনের দুধের মতো নির্জীব কোনো খাবার নয় বরং নবজাতকের ও শিশুর সমস্ত অক্ষমতার অনুপূরক জীবন্ত অবলম্বন। বুকের দুধ অসহায় নবজাতককে তার মায়ের সাথে মানসিক যোগসূত্র তৈরি করতে সাহায্য করে। মায়ের স্তন এমন সুন্দর জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে যাতে দুধ খাওয়ার সময় শিশু স্পষ্টভাবে মায়ের মুখ দেখতে মায়ের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকতে সক্ষম হয়। এমনিভাবে বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুর চাহনী, স্পর্শ, গন্ধের সমন্বয়ে মা ও শিশুর হৃদয়ে যে অন্তহীন স্নেহ-তৃপ্তি-ভালোবাসার তরঙ্গ বন্ধন সৃষ্টি হয় তার কোনো তুলনা টিনের দুধে কল্পনাও করা যায় না। এভাবেই আল্লাহতায়ালার নিখুঁত পরিকল্পনা ও অশেষ কৃপায় মায়ের দুধ নবজাতকের সামগ্রিক প্রয়োজন পূরণকারী জীবন্ত সহচর হিসেবে কাজ করে।

যা জানা প্রয়োজন
* মায়ের দুধ ছাড়া নবজাতককে অন্য কোন খাদ্যই দেয়া যাবে না।
* শালদুধ নবজাত শিশুর জন্য প্রথম টীকার কাজ করে।
* বোতলে খাবার খেলে শিশুর ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগব্যাধির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
* কোন কারণে মা শিশুকে সরাসরি বুক থেকে দুধ খাওয়াতে না পারলে স্তন চিপে দুধ বের করে খাওয়াতে হবে।
* ছ’মাস বয়সের পর শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার খাওয়াতে হবে।
* বুকের দুধ খাওয়ালে প্রসবের পর ৬ মাস পর্যন্ত গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে না।
* কোন অবস্থাতেই বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না।

* এক বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য খাবার দেয়ার আগে প্রতিবার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
* চাহিদা অনুযায়ী শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ দিন এতে বুকের দুধ বৃদ্ধি পাবে।
* পরের বার দুধ দেয়ায় সময় অবশ্যই আগে যেখানে শেষ করেছিলেন সেই স্তনে শুরু করুন।
* প্রতিবারই দুই স্তন দান করুন।
‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর বুকের দুধ পান করাবে’ (আল-কোরআন, সূরা-বাকারা আয়াত-২৩৩)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps