শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

সম্পাদকীয়

অর্থনীতিতে চাপ কমাতে হবে

মো. মাঈন উদ্দীন | প্রকাশের সময় : ১৩ আগস্ট, ২০২২, ১২:০০ এএম

অর্থনীতিতে বর্তমানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাতের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের নানা দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়েছে। দেশের প্রয়োজনীয় পণ্য ও দ্রব্যাদি বিশেষ করে জ্বালানি তেল গ্যাস, গম, ভুট্টা, ভোজ্যতেল, সার ইত্যাদির সরবরাহ বাধাগ্রস্থ ও রফতানিতেও বাধা তৈরি হচ্ছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, উচ্চমূল্য¯ফীতি, রফতানিতে অধঃগতি, আমদানি বেশি হওয়ার কারণে অর্থনীতি অনেকটা চাপের মুখে রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর আব্দুর রউফ তালুকদারও উল্লেখ করেছেন, ‘দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে আছে’। তিনি বলেছেন, আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে। বছর দিন যতই যাচ্ছে মানুষের চাহিদা, আকাক্সক্ষা, জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন হচ্ছে। করোনায় অর্থনীতি যখন নিম্ন মুখী ছিল তখন মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। অর্থনীতি এখনো চাপের মুখেই আছে। অর্থনীতির আকার দিন দিন বাড়লেও রাজস্ব আদায় সে হারে বাড়ছে না। আবার ডলার সংকট ও বিশ্ব বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি খরচও বাড়ছে। বাড়ছে ঋণ পরিশোধের খরচ। তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি খাতেও ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছে। গত ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ৬৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা খরচের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের খরচও বাড়ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৭ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে এই খাতে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বৈরীপরিবেশ ও আমাদের অভ্যন্তরীণ কিছু বড় প্রকল্পে অর্থ যোগান, বার বার প্রকল্পের সময় ও বাজেট বাড়ানো, দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাবসহ নানামুখী চাপে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকও নেতিবাচক ধারায় পতিত হয়েছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, অত্যধিক ব্যাংক নির্ভরতা, টাকার অব মূল্যায়ন, রেমিটেন্স ও প্রবাসী আয়ে ভাটা, বাণিজ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, রাজস্ব সংগ্রহে গতিশ্লথতা ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বিষয় নিয়েও বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা চাপের মুখে। এই চাপকে সামলিয়ে উত্তরণের পথ কী হতে পারে তা এখন ভেবে দেখা উচিত।


মানুষের আয় বাড়ছে না, অথচ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এটা সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে না। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ধাক্কা শেয়ার বাজারেও লেগেছে। তাতে শংকিত শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরাও। বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের বাজার যতটা না অর্থনৈতিক কারণে আক্রান্ত তার চেয়ে বেশি মনস্তান্তিক ও ভয়ের প্রভাবে প্রভাবিত। বাজার দর বাড়ার চেয়ে দর পতনের হারই বেশি লক্ষণীয়। দেশের শিল্প বা অবকাঠামো নির্মাণে বড় পরিমাণ পুঁজি যোগানোর জন্য শেয়ার বাজার বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশে^র উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে পুঁজির যোগান আসে শেয়ার বাজার থেকে। দীর্ঘ মেয়াদী অর্থায়নের জন্য থাকে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আর দৈনন্দিন সেবা দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চলতি মূলধনের যোগান দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কিন্তু আমাদের দেশে সব কর্মকাণ্ডই ব্যাংক খাত ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল সমস্যা হচ্ছে খেলাপীঋণ। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপীঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে খেলাপীঋণের পরিমান আরো বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি ঋণ পুনঃ তফসিল নীতিমালার উদারীকরণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খেলাপী ঋণ পুনঃ তফসিলকরণের ক্ষমতা ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পুনঃ তফসিলের মেয়াদও বাড়ানো হয়। পাশাপাশি ডাউনপেমেন্টের পরিমাণ ও অস্বাভাবিক হারে কমিয়ে আনা হয়।

মূল্যস্ফীতির কথা বলতে গেলে বলতে হয় জুন পর্যন্ত মূলস্ফীতি বেড়ে হয় ৭.৫৬ শতাংশ। বিগত ৯ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। তবে খাদ্য মূলস্ফীতি আরো বেশি। বেসরকারি হিসাব মতে, দেশের সার্বিক মূলস্ফীতি ১০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে দেশের মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কৃষির প্রতি অধিক নজর দিতে হবে। সার, কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচের বিদ্যুৎ ইত্যাদিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য যাতে কৃষকেরা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। পণ্যের কালোবাজারি, অতি মুনাফা, মজুদদারি বন্ধে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় ব্যাংক সুদের হার বাজার ব্যবস্থার উপর ছেড়ে দিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হার বাড়ানো হলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট কমবে এবং লভ্যাংশ বাড়তে পারে। এতে ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা কিছুটা দুরীভূত হতে পারে। বিবিএস তথ্য মতে, দেশে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি। এছাড়া শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতির হার বেশি। মূলস্ফীতি ৭ শতাংশ অতিক্রম করা মানেই হলো জনগণের জন্য বড় দুঃসংবাদ। এতে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই মূলস্ফীতি মূলত বিগত পাঁচ মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। গত অর্থ বছরে (২০২১-২০২২) মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ ধরে রাখার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) গড়ে ৬.১৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মূলস্ফীতি ৫.৬ শতাংশ রাখার কথা বলা হয়েছে। বিশ^ বাজারে আমদানি পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে যার প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক সূত্র অনুযায়ী আমানতের সুদের হার গড় মূলস্ফীতির উপরে থাকা বাঞ্ছনীয়। সেই হিসাবে আমাদের আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে রাখা ঠিক হবে না। তেমনি ঋণের সুদের হারও ৯ শতাংশে বেঁধে রাখা উচিত নয়।

বাংলাদেশ এ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করেনি ঠিকই তবে চলমান ও অনুমোদিত বড় অর্থ ব্যয়ের মেগা বা বড় বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের বড় ধাক্কা আসছে সামনে। দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, এই ২০ মেগা প্রকল্পে বিদেশি ঋণ ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৯২.৬৯ শতাংশ রাশিয়া, জাইকা ও চীনের। এই পর্যন্ত ২০টি মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে ৭০ বিলিয়ন বা ৭ হাজার কোটি ডলার। এর দুই তৃতীয়াংশ বা ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৭টি ঋণ প্যাকেজ ২৮.৫৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। ২০ মেগা প্রকল্পের মধ্যে ৯২.৬৯ শতাংশ ঋণ রাশিয়া, জাইকা, ও এক্সিম ব্যাংক অব চায়নার। ২ বা ৩টি প্রকল্প ছাড়া বাকি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের অবস্থা ভালো না। সময় মতো প্রকল্পসমূহ শেষ না হলে রিটার্নও আসতে দেরি হবে। এছাড়া এই সকল প্রকল্প অধিকাংশই ভৌত অবকাঠামো সম্পর্কিত। এই সকল প্রকল্প নির্মাণের বিদেশি ঋণের অর্থ সময় মতো পরিশোধ করতে না পারলে অর্থনীতি সুসংহত থাকবে না। সম্প্রতি সিপিডি’র বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি বছর জিডিপি’র ১.১ শতাংশ হারে বিদেশি দায়-দেনা শোধ করা হয়। ২০২৬ সাল নাগাদ তা প্রায় দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হবে। তাই এখন থেকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রকল্পসমূহের লাভ লোকসানের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খানুভাবে যাচাই করতে হবে। সময় মতো যাতে প্রকল্প শেষ করা যায় এবং অপচয় ও অহেতুক খরচ যাতে না হয় সেই দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া উচিত।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। বিশে^র অধিকাংশ দেশে জ্বালানি সংকট এখন কঠিন বাস্তবতা। জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি, সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খলায় বাংলাদেশ কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছে। ডিজেল চালিত বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট বন্ধ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকার দেশব্যাপী ২-৩ ঘণ্টা বাধ্যতামূলক লোডশেডিং করছে। এতে শুধু গৃহস্থালী বিদ্যুৎ ব্যবহার নয়, শিল্প উৎপাদনেও বাধাগ্রস্থ হয়েছে। যার প্রভাব দেশের অভ্যন্তরে পণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে পড়তে শুরু করছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয় দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই জ্বালানি তেলের দাম জনগণের সাধ্যের মধ্যে রাখা না গেলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করে দেবে। রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির আকারের তুলনায় রাজস্ব আহরণের গতি কাক্সিক্ষত মানের দেখা যাচ্ছে না। রাজস্ব জিডিপি অনুপাতে বিশে^র তলানির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বাংলাদেশের রাজস্ব জিডিপি’র অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশ। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। বাংলাদেশের সাথে নেপাল ও লাওসও রয়েছে। রাজস্ব জিডিপি অনুপাত বাংলাদেশ থেকে নেপালের দ্বিগুণ এবং লাওসের দেড়গুণ বেশি। অন্যান্য স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও রাজস্ব জিডিপির অনুপাত আমাদের দেশের কম। মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আদায় করে এনবিআর। এনবিআর এর আদায় করা কর জিডিপি অনুপাতের ১০ শতাংশের নিচে। তার বড় কারণ হলো, গত তিন দশকে বড় ধরনের কোনো সংস্কার নেই। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে মাত্র ২৭ লাখ মানুষ রিটার্ন দেয়। তার কারণ সনাতনী পদ্ধতিতে ভ্যাট ও কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। যদি নাগরিকদের থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় করা হতো এখন অর্থনীতির এই অস্থির সময়ে কিছুটা স্বস্তি থাকতো। বেশি রাজস্ব আদায় হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করা যেত। তাই কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া অর্থনীতির উপর একটি চাপ।
অর্থনীতির উপর চলমান বিভিন্ন চাপ ঠেকাতে এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক খাতে সংস্কার খেলাপী ঋণ আদায় ও পুঁজি বাজারকে দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করতে হবে। রাজস্ব আদায়ে জোর দিতে হবে। দেশের কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে সহায়তা জোরদার করতে হবে। রেমিটেন্স বৃদ্ধির জন্য প্রবাসে প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠাতে হবে। বৈধ পথে প্রবাসী আয়ের পথ সুগম করতে হবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক
main706@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন