মঙ্গলবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

সম্পাদকীয়

সাম্প্রাজ্যবাদী ব্লু প্রিন্ট এবং আমাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ২৩ নভেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

রাশিয়াকে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করার আগেই ইউক্রেনের জায়নবাদী শাসক ভলোদিমির জেলেনস্কি ও তার বাহিনীকে ন্যাটোর যুদ্ধ সাজে সজ্জিত করা হয়েছিল। সমাজতন্ত্রের পতনের পর ¯œায়ুযুদ্ধের সাবেক প্রতিপক্ষ রাশিয়া কার্যত রণেভঙ্গ দিলে পশ্চিমা মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্স ও ওয়ার কন্ট্রাক্টরদের বিনিয়োগ এবং ব্যবসা লাটে ওঠার আগেই তারা নতুন শত্রæ আবিস্কার করেছিল। সেই নতুন শত্রুটি হচ্ছে ইসলামি জঙ্গিবাদ। এতদ প্রসঙ্গে গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক মালমসলাও পশ্চিমা থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর তাত্তি¡ক গুরুরা দিয়েছিল। মতলববাজ থিঙ্কট্যাঙ্ক ও মিডিয়াগুলো ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী প্রচারনাকে জিঙ্গোইজমের টেক্সটবুক ফর্মে রূপান্তরিত করেছে। পশ্চিমা সমাজ মানসে ইসলামোফোবিক এজেন্ডা তাজা রাখতেই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক ও পেন্টাগনে সন্ত্রাসী বিমান হামলার নাটক সাজানো হয়েছিল কি না সে প্রশ্নের সঠিক জবাব মূল ধারার প্রশাসন বা গণমাধ্যম থেকে কখনোই হয়তো জানা যাবে না। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে বক্তৃতা দিতে গিয়ে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন ১৯৯২ সালে প্রথম ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন প্রসঙ্গটি তুলে ধরতে গিয়ে মূলত মুসলমানদের সাথে পশ্চিমা সভ্যতার সংঘাতের নীলনকশা উন্মোচিত করেছিলেন। তবে হান্টিংটনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণেল ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রীধারি মরোক্কান অর্থনীতিবিদ মাহদি এলমানদ্রা প্রথম সভ্যতার দ্ব›দ্ব এবং ইসলামের সাথে পশ্চিমা সভ্যতার সংঘাতের ভবিষ্যদ্বানি করেছিলেন। মাহদী এলমানদ্রার ধারণাকে উপজীব্য করেই হান্টিংটন তার ‘ক্লাশ অব সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড রিম্যাকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ গ্রন্থটি বাজারে ছাড়েন ১৯৯৬ সালে। পশ্চিমা যুদ্ধবাজ নেতারা ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে তাদের জনগণকে মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তুলতে ক্লাশ অব সিভিলাইজেশনের বিষয়বস্তুকে ব্যবহার করেছেন। ইউরোপে আধুনিক সভ্যতার বিকাশের সাথে মুসলমানরা অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজার বছর আগে আন্দালুসিয়া থেকে পুরো ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ ছিল মুসলমানদের হাতে। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসের বইয়ে স্থান পেলেও আজকের ইউরোপের শহরগুলোতে মুসলমান ইমিগ্রান্টদের সংখ্যা দ্রæত বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সমাজে ইসলামের প্রভাব ক্রমবর্ধমান হওয়ার বাস্তবতা একশ্রেণীর মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তবে জায়নবাদ প্রভাবিত ইসলাম বিদ্বেষী রাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষকে মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তুলতে গিয়ে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আগ্রহী ও অনুসন্ধিৎসু করে তুলেছে। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্বে ওয়ার অন টেররিজমের নামে মুসলমানদের এত রক্ত ঝরানোর পরও পশ্চিমা সমাজে ও রাজনীতিতে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা ও নেতৃত্বের আসন ক্রমে বেড়েই চলেছে। মার্কিন রিপাবলিকান জর্জ বুশ ও ইহুদি টনি বেøয়ারের যোগসাজশে সারাবিশ্বে মুসলমান বিদ্বেষী সন্ত্রাস ছড়িয়ে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করতে না পারলেও মুসলমানদের মধ্যকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তোলা সম্ভব হয়েছে। নিষ্ঠুর রাজনৈতিক গণহত্যার ঘটনাগুলোর সাথে ঐতিহাসিক কসাইদের ভূমিকা দেখা যায়। টনি বেøয়ারের মা হেজেল এলিজাবেথের বাবা ছিলেন একজন (বুচার) ইহুদি জাত কসাই। ইরাকে লাখ লাখ মানুষ হত্যার পেছনে বুশের মূল ইন্ধনদাতা ও সহযোগী ছিলেন তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি বেøয়ার।

ইউক্রেন যুদ্ধকে একটি ন্যাটো-রাশিয়া যুদ্ধে রূপ দেয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন ইউক্রেনের ইহুদি প্রধানমন্ত্রী জেলেনস্কি। রাশিয়াকে কোনঠাসা করতে ইউক্রেনে রাশিয়া বিরোধী পশ্চিমা বশংবদ শাসক বসানো ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করার পরিকল্পনা থেকেই মূলত ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার আগ্রাসি মনোভাবকে উস্কে দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা রাশিয়ান ফেডারেশনভুক্ত করার পর পশ্চিমা বিশ্বের নীরব দর্শক হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না। তবে গোপণে এবং প্রকাশ্যে প্রবল রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে প্রস্তুত করার পশ্চিমা সামরিক কার্যক্রম চলছিল। ইউক্রেনে সম্ভাব্য রাশিয়ান হামলার আগাম সতর্কতা এবং সর্বাত্মক সামরিক সহায়তার বার্তা দিয়ে মার্কিন প্রশাসন মূলত নিজেদের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। ইউক্রেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রশাসনিক এলাকা ইতিমধ্যে রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। জনবল ও সৈন্যসংখ্যার ঘাটতির কারণে রাশিয়া ঝুঁকি এড়াতে খেরসনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর পরিস্থিতিকে রাশিয়ার জন্য পরাজয় বলে প্রচারনা চালিয়েছে পশ্চিমারা। তবে খেরসন থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের পর ব্যাকফুটে থাকা রাশিয়ার দুর্বলতার সুযোগে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসার চাপ দিচ্ছে পশ্চিমারারা। জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইল পদোলিয়াক সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিকে এই তথ্য জানিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাসে শত শত বিলিয়ন সামরিক বাজেট যোগান দিয়েছে। এদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি থমকে দাঁড়ানোর প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ বহনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে মার্কিন রাজনীতিক ও নাগরিক সমাজ। যে যুদ্ধে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য এবং রাজনৈতিক বিজয়ের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না, সেই যুদ্ধে হাজার হাজার কোটি ডলার খরচ করাকে অর্থহীন মনে করছে মার্কিনীরা। মার্কিনীদের ভরসায় যুদ্ধে নামা জেলনস্কি হয়তো মার্কিনীদের চাপে নাকে খত দিয়ে রাশিয়ার আলোচনা বসতে বাধ্য হবে। কিন্তু জায়নবাদী জেলনস্কি যুদ্ধকে একটি রুশ-মার্কিন-ন্যাটো যুদ্ধে রূপ দেয়ার কারসাজি চালিয়ে যাচ্ছে। তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, তিনি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্লট তৈরী করতে সচেষ্ট রয়েছেন। রাশিয়াকে বেকায়দায় ফেলে ইউক্রেন থেকে সম্মানজনকভাবে প্রত্যাবর্তনের পথ করে দিতে প্রথম মহাযুদ্ধের ভার্সাই চুক্তির রাশিয়াকে একটি চুক্তিতে আটকে ফেলার মওকা খুঁজছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ইউক্রেনে ছাড় দিয়ে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতাকে সীমিত করে ফেলার পর চীন ও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করার আলামত দেখা যাচ্ছে। ইরানের ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ান বাহিনী যুদ্ধে বেশ কিছু সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এই তথ্য তুলে ধরে জেলেনস্কি ইসরাইলকে সরাসরি যুদ্ধে নামার আহŸান জানিয়েছে। যুদ্ধে ইসরাইল বাহ্যিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখলেও ইউক্রেনে ইসরাইলী আয়রন ডোমসহ অস্ত্র, ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বলে জানা যায়।

করোনাভাইরাসকেও হোক্স বা কারসাজি বলে ইঙ্গিত করেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকরোনাভাইরাস নিয়ে বেশ কিছু কনস্পিরেসি থিউরি শুরু থেকেই সক্রিয় আছে। এই ভাইরাস মহামারি বিশ্বের সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। বিশেষত মাইক্রোসফ্টসহ তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট ও কর্পোরেট ওষুধ কোম্পানী ও বায়ো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অংকের মুনাফা করেছে। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বিশ্বের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম মন্দা নেমে আসবে। এতদ সত্তে¡ও শুধুমাত্র অস্ত্র বাণিজ্য চাঙ্গা রাখতে পশ্চিমা মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্স’র কুশীলবরা যুদ্ধকে প্রলম্বিত করে মুনাফা লুটতে চাইছে। আফগানিস্তান ও ইরাক দখল, সিরিয়ায় প্রক্সি যুদ্ধ কিংবা ইয়েমেনে সউদী জোটের আগ্রাসন, কিংবা ইউক্রেনে প্রক্সি যুদ্ধ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধেই পশ্চিমাদের সামরিক বিজয় না হলেও বাকি দুনিয়ায় অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা জিইয়ে রেখে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাব টিকিয়ে রাখাই যেন এসব যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। ইউক্রেনের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমাদের হইচই এবং শত শত বিলিয়ন ডলারের বাজেট ও জাহাজ ভর্তি অস্ত্র নিয়ে হাজির থাকার নেপথ্যে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক-মানবিক দায়বদ্ধতার কোনো সম্পর্ক নেই। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগকে পাত্তা না দিয়ে বশংবদ শাসক বসিয়ে ইউক্রেনকে যুদ্ধের শিখÐী বানানোর নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে এখন। পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের ইউনিপোলার বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে সাময়িক ভেস্তে দেয়াই এসব যুদ্ধ পরিকল্পনার লক্ষ। রাজনৈতিক সংঘাত, বায়োলজিক্যাল মহামারি, আঞ্চলিক যুদ্ধ ও আগ্রাসন উস্কে দিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সিরিয়া বা ইয়েমেন যুদ্ধের কারণে বাস্তুহীন ও দুর্ভীক্ষপীড়িত কোটি কোটি মানুষের করুণ বিয়োগান্তক দৃশ্যপট যেন বাকি দুনিয়ার মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। ইউক্রেনে একটি যুদ্ধবিরতি নাটক মঞ্চস্থ করে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির ইয়াসির আরাফাত- আইজাক রবিন, কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কথিত শান্তি চুক্তি তথা প্যারিস পীস অ্যাকর্ডের কারিগর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে ভিয়েতকং জেনারেল লি ডাক থো কে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করার মত পুতিন- বাইডেন কিংবা জেলেনস্কিকে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। তবে ১৯৭৩ সালে জেনারেল লি ডাক থো নোবেল শান্তি পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের আগ মুহূর্তে ইতিহাসে প্রথমবারের মত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও আরব-ইসরাইল শান্তি প্রশ্নে মাদ্রিদ শান্তি আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একমত হয়। তবে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ দেশে ফিরেই একটি রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। উল্লেখ্য, ইউক্রেনের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট বা রেফারেন্ডাম ছিল সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের জীবনে গøাসনস্ত-পেরেস্ত্রয়কার চেয়েও বড় রাজনৈতিক ভুল। রাশিয়া এখন সেই ভুলেরই খেসারত দিচ্ছে। মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদী নীল নকশায় শুধু রাশিয়াই নয়, ইউরোপসহ পুরো বিশ্বকেই এখন ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপে দগ্ধ হতে হচ্ছে।

ইঙ্গ-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের নীল নকশায় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় একের পর এক দেশ সামরিক আগ্রাসনের শিকার হওয়ার পর মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী কৌশলগত পরাজয় বরণ করেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত আগ্রাসন ও ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। ইউক্রেন থেকেও হয়তো শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে ফিরে যেতে হবে। তবে ইউক্রেনের স্বাধীনতার উপর রাশিয়ার আগ্রাসন পশ্চিমা যুদ্ধবাদী চেহারা ঢেকে দিয়ে রাশিয়ার ভøাদিমির পুতিনকে যুদ্ধবাদী চেহারা তুলে ধরার প্রপাগান্ডা সক্রিয় রয়েছে। সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ, ফিলিস্তিনের উপর ইসরাইলী আগ্রাসন ও গণহত্যা, সিরিয়া ও ইয়েমেনে মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভীক্ষে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কার মত মানবিক বিষয় থেকে বিশ্বের দৃষ্টি আড়াল করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে উত্তর আফ্রিকান দেশ ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। ইথিওপিয়ার ইরিত্রিয়ান সীমান্তবর্তী অঞ্চল তিগারি এলাকায় বিদ্রোহ দমনের নামে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক অখÐতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত মাসে স্ট্রাটেজিক কালচার ফাউন্ডেশন নামের একটি অনলাইন বøগে প্রকাশিত ফিনিয়ান কানিংহামের লেখায় ইথিওপিয়ায় পশ্চিমাদের হিপোক্রেসির মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। তার লেখার শিরোনাম, ইথিওপিয়া এক্সপোজেজ ওয়েস্টার্ন হিপোক্রেসি ওভার ইউক্রেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শত শত বিলিয়ন ডলারের বাজেট যোগান দিচ্ছে, সেখানে ইথিওপিয়ায় নিজেদের পাপেট প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে তাকে গণতান্ত্রিক সংস্কারক আখ্যা দিলেও আবি আহমেদের অনুগত বাহিনী অবরোধ সৃষ্টি করে তিগারি অঞ্চলের ৬০ লাখ মুসলমান অধিবাসিকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিআইএ’র ট্রেনিং প্রাপ্ত জেনারেল আবি আহমেদ ইথিওপিয়ায় পশ্চিমা দাবার গুটি এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা হয়ে ওঠার পেছনে কাজ করছে পুরনো ঔপনিবেশিক ও সা¤্রাজ্যবাদী কৌশল। একেক অঞ্চলে সা¤্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক জিও-স্ট্রাটেজিক পার্টনারদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের প্রকৃতি একেক রকম। ইথিওপিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া ও আফগানিস্তান বা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোটি কোটি মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও এ নিয়ে পশ্চিমাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। যত উদ্বেগ আর রাজকোষ উজার করে উথলে উঠা দরদ শুধু ইহুদি শাসিত ইউক্রেনের জন্য। পশ্চিমারা যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ না নিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার জন্য শুধু অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং রাশিয়ান গোলায় ইউক্রেনের জনপদগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিনত হচ্ছে। এতে এটাই কি প্রমানিত হয় না, পশ্চিমারা রাশিয়াকে বেকায়দায় ফেলতে ইউক্রেন ও ইউক্রেনীয় জনগণকে বলির পাঠা বানাচ্ছে?

স্যামুয়েল পি হান্টিংটন ভবিষ্যতের সভ্যতার সংঘাতে যে কয়টি দেশের নাম উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে বাংলাদেশের নামও আছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তহীন যুদ্ধের ডামাডোলে বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট বুশের আহŸানে সাড়া দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল। সেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা মাথায় রেখে ভারত ছিল মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের কৌশলগত আঞ্চলিক মিত্র। গত দুই দশকে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের আঞ্চলিক রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদে সেই মৈত্রীর বিষফল চাক্ষুষ হয়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশে মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা ভারত ও পশ্চিমাদের পৃষ্ঠপোষক বাহিনীর বুটের তলায় পিষ্ট করা হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের অগণতান্ত্রিক সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশে নজিরবিহীন কারসাজিতে তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামি বছর আরেকটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। আগের মত এবারো পশ্চিমারা রাজনৈতিক সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর ও সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গৎবাঁধা বুলি আওড়াচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও আগের মতই সংবিধানের দোহাই দিয়ে নিজেদের অধীনে নির্বাচন করার পুরনো রেকর্ড বাজিয়ে চলেছেন। আবারো বিদেশিরা রাজনৈতিক বিভক্তি ও সংঘাতের সুযোগ নিতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নেপথ্য সমঝোতার আওতায় বাংলাদেশে ভারতের স্থলাভিষিক্ত হয়ে চীনের প্রেসক্রিপশনে আবারো ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অনুরূপ অরাজনৈতিক-অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলে বিস্ময়ের তেমন কিছু নেই। দেশের শাসকরা যদি জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়, বিদেশি শক্তির উপর ভর করে ভিন্ন পথে ক্ষমতা লাভের বশংবদ শাসকের সুবিধাভোগী বিদেশিরাই হয়। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণ কখনোই কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে আপস করেনি। সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রই বাংলাদেশের জন্য শেষ কথা। জনগণের সম্মিলিত শক্তির রাজনৈতিক ঐক্যই পারে দেশকে সঠিক গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নিতে। ভোটারবিহীন একদলীয় ও মধ্যরাতের নির্বাচনের বদনাম ঘোচাতে দেশকে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত জবাব দেবে।

bari_zamal@yahoo.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন