মঙ্গলবার , ২৮ মার্চ ২০২৩, ১৪ চৈত্র ১৪২৯, ০৫ রমজান ১৪৪৪ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

টানেলে নবযুগে চট্টগ্রাম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন আগামী মাসে খুলে যাবে আধুনিক যোগাযোগ-অর্থনীতি-পর্যটন বিনিয়োগ-শিল্পায়নসহ সম্ভাবনার দ্বার : সাংহাইয়ের আদলে হবে ‘ওয়ান সিটি-টু টাউন’

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ১২:০০ এএম

স্বপ্ন এখন সত্যি। নদীর তলদেশ দিয়েই চলবে গাড়ি। দেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের নির্মাণ কাজ একেবারেই শেষ পর্যায়ে। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়েছে অনেক আগে। এখন চলছে ইলেকট্রো মেকানিক্যাল কাজ। টানেলের দুই প্রান্তে বসছে একাধিক স্ক্যানার। সুড়ঙ্গপথে বসানো হচ্ছে স্যান্সর। এরপর শুরু হবে পরীক্ষামূলক যানবাহন চলাচল। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী মাসে টানেলের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে চট্টগ্রামবাসীকে দেয়া আরো একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি পূরণ করবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম এই সড়ক টানেল চালু হলে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরো এক ধাপ অগ্রগতি হবে। মেট্রোরেলের পর সূচনা হবে টানেল যুগের। টানেলে নবযুগে প্রবেশ করবে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নগরীর পতেঙ্গা থেকে নদীর তলদেশ দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে যাওয়া যাবে চট্টগ্রামের দক্ষিণে আনোয়ারায়। এতে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

চট্টগ্রাম হয়ে দেশের পর্যটন শহর কক্সবাজারের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের যোগাযোগ আরো সহজতর হবে। চট্টগ্রামের মীরসরাই থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত প্রস্তাবিত মেরিন ড্রাইভের সাথে যুক্ত হবে এই টানেল। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর ও এনার্জি হাব। পতেঙ্গা উপক‚লে হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রকল্প বে-টার্মিনাল। চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুÐ ও ফেনীর সোনাগাজীর বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিল্পনগর। মাতারবাড়ির সাথে বে-টার্মিনাল হয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের সঙ্গে সেতুবন্ধন রচনা করবে এই টানেল।

এতে এই অঞ্চলে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পর্যটন, নগরায়নসহ অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। বাড়বে কর্মসংস্থান, তাতে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে জীবন মানেরও উন্নয়ন হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে পড়বে এর ইতিবাচক প্রভাব। কর্ণফুলী নদীর ওপারে আধুনিক নগরী গড়ে উঠবে। চীনের সাংহাই শহরের আদলে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হবে ‘ওয়ান সিটি-টু টাউন’। তাতে চট্টগ্রাম মহানগরীতে মানুষের চাপ কমবে। টানেলে যানবাহন চলাচল শুরু হলে নগরীতে যানজটও কমে আসবে। টানেলের প্রবেশ পথেই পতেঙ্গায় চালু হয়েছে সিটি আউটার রিং রোড। নগরীর লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ। টানেল চালুর আগেই এক্সপ্রেসওয়ের পতেঙ্গা থেকে বন্দর নিমতলা বিশ্বরোড পর্যন্ত অংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।

তাতে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সাথে টানেলের যোগাযোগ আরো সহজতর হবে। কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহন সহজে টানেল হয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে উত্তর চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে পারবে। অন্যদিকে সিটি আউটার রিং রোড হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকার যানবাহন টানেল হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে যাতায়াত করতে পারবে। এতে চট্টগ্রাম মহানগরীর উপর যানবাহনের চাপ কমবে। তাতে চট্টগ্রাম বন্দরমুখী আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন সহজতর হবে। বাড়বে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মক্ষমতা।
তিন দশমিক ৩২ কিলোমিটারের এই টানেলের দুটি (টিউবের) সুড়ঙ্গপথের কনস্ট্রাকশন কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগে। অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। কর্ণফুলীর তীরে এই টানেলের পতেঙ্গা ও আনোয়ারা প্রান্তে দুটি করে টোলপ্লাজা নির্মাণকাজও শেষ। উভয় পাশে ১০টি করে টোল বুথ বসানো হয়েছে। উভয় প্রান্ত থেকে যানবাহন টানেলে প্রবেশ করতে পারবে। টানেলের দুটি টিউব পাশাপাশি। একটির সঙ্গে অন্য টিউবের দূরত্ব ১২ মিটারের মতো। প্রতি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেন রয়েছে। এই লেন হয়ে টানেলের দক্ষিণ টিউব দিয়ে আনোয়ারা থেকে নগরীতে আসা যাবে এবং উজানের দিকে অর্থাৎ উত্তর টিউব দিয়ে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির দিক থেকে আনোয়ারার দিকে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। মূল দুই টিউবের মাঝখানে তিনটি সংযোগ টিউব রাখা হয়েছে। যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এক টিউব থেকে অন্য টিউবে চলে যাওয়া যায়। এর সঙ্গে কয়েকটি সুড়ঙ্গ রাখা হয়েছে, যেকোনো বিপদে সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হওয়া যাবে। টানেলের প্রতিটি সুড়ঙ্গের মুখে বসছে একাধিক স্ক্যানার। এতে করে টানেলে চলাচলকারী সব যানবাহনকে স্ক্যান করা হবে।

নদীর তলের এই মূল পথের দৈর্ঘ্য হচ্ছে তিন দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এর বাইরে পতেঙ্গা প্রান্তে ৫৫০ মিটার এবং আনোয়ারা প্রান্তে চার দশমিক আট কিলোমিটার সংযোগ সড়ক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই পথের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে নয় দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে চার হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা দিচ্ছে চীন সরকার। চীনের কমিউনিকেশন ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেতু বিভাগ। সম্প্রতি প্রকল্পের ব্যয় ১৬৬ কোটি টাকা এবং সময় আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং টানেল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রæয়ারিতে বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সর্বশেষ গত ২৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী টানেলের একটি টিউবের উদ্বোধন করেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্চে প্রধানমন্ত্রী টানেলটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন