ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

সহজ ভ্রমণে মৈত্রী

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নিরাপত্তায় ট্রেন যাত্রা, সময় ও ব্যয় সাশ্রয় ঘুষ-বকশিশের বিড়ম্বনা থামছেই না : নিম্নমানের খাবার উঁচু দরে

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ২৮ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

নয়াদিল্লীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোহাম্মদ আশফাক। ছুটির ফাঁকে ঢাকার ধানমন্ডিতে নানাবাড়ি বেড়াতে আসছেন। আহসানুল হক দক্ষিণ ভারতের ভেলোরে চিকিৎসা শেষে ফিরছেন চট্টগ্রামের চন্দনপুরায়। গৃহবধু লাবনী দাশগুপ্ত কলকাতায় বোনের বাড়ি থেকে ফিরছেন মানিকগঞ্জে। তারা প্রায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন বাংলাদেশ এবং ভারতে। ভ্রমণের জন্য প্রথম পছন্দ ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন।
গত ২৩ এপ্রিল মঙ্গলবার কলকাতা থেকে ঢাকামুখী ট্রেনে যাত্রীদের আলাপচারিতায় জানা গেল, দুই দেশ পাড়ি দিতে সহজ ও স্বস্তিকর ভ্রমণে মৈত্রী জনপ্রিয়। চিকিৎসা, পর্যটন-ভ্রমণ, প্রতিবেশী দুই দেশে অবস্থানরত আত্মীয়-পরিজনের সাথে মিলিত হওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব আয়োজনে উভয় দেশের নানা শ্রেণি-পেশার বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাত্রীরা বেছে নেন মৈত্রী ট্রেনে স্বচ্ছন্দে ভ্রমণ।
বাংলাদেশ এবং ভারতের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উভয় দেশের যৌথ ও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মৈত্রী এক্সপ্রেস পরিচালনা করা হয়। মৈত্রীযোগে রেলপথে যাত্রায় অর্থ ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে। ঢাকা থেকে কলকাতা ভাড়া ৫শ’ টাকা ট্র্যাভেল ট্যাক্স ও ভ্যাটসহ এসি কেবিন ৩৪শ’ টাকা এবং এসি চেয়ার ২৫শ’ টাকা। কলকাতা-ঢাকা জনপ্রতি ভাড়া এসি কেবিন ২০১৫ রুপি, এসি চেয়ার ১৪২৫ রুপি। জনপ্রতি বিনামাশুলে ৩৫ কেজি পর্যন্ত মালামাল বহন করা যায়। আন্তর্জাতিক এই ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ ও ভ্রমণ সহজ হলেও প্রচারের অভাবে এবং জটিলতা মনে করে অধিকাংশ যাত্রী সড়কপথে কষ্টকর ভ্রমণ করছেন। পাসপোর্ট-ভিসা দেখিয়ে ঢাকার কমলাপুর ও চট্টগ্রাম রেলস্টেশন এবং কলকাতা স্টেশন ও ডালহৌসীর ফেয়ারলি প্লেসে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে ভ্রমণ তারিখের ২৯ দিন আগে থেকে টিকিট মিলবে। কলকাতা থেকে ফিরতি অগ্রিম টিকিট আংশিক ঢাকায় পাওয়া যায়।
মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন সপ্তাহে ৪ দিন যায় ঢাকা থেকে কলকাতায়। বুধবার, শুক্রবার, শনিবার ও রোববার। কলকাতা থেকে ঢাকায় আসে সোমবার, মঙ্গলবার, শুক্রবার ও রোববার। পরিপাটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মৈত্রী ছাড়ে এবং কলকাতা পৌঁছায় বিকেল ৪টায়। কলকাতা (চিতপুর) স্টেশন থেকে মৈত্রী ছাড়ে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে। ঢাকায় পৌঁছায় বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে। অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত দুই অংশে মোট ৩৭৫ কিলোমিটার রেলপথ মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে যাত্রীরা ঢাকা ও কলকাতায় পৌঁছাতে পারেন। এতে ভ্রমণ-ক্লান্তি লাগে না। নিয়ম মাফিক একেকদিন দুই দেশের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ব্রডগেজ ট্রেন পরিচালনা করছে।
ঢাকা ও কলকাতায় উভয় রেলস্টেশনে মৈত্রী ট্রেনের যাত্রীদের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমসের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উভয় স্টেশনে ভারত ও বাংলাদেশ অভিমুখী ট্রেন যাত্রীদের ট্রেন ছাড়ার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে উপস্থিত থাকতে হয়। এরজন্য বুথ-অফিস, প্রযুক্তিগত ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয়ে অবকাঠামো সুবিধাদি রয়েছে।
তবে অনেক যাত্রীর অভিযোগ, ঢাকা ও কলকাতা উভয় স্টেশনে কতিপয় অসৎ-দুর্নীতিবাজ কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যথেচ্ছ হয়রানির কারণে সাধারণ যাত্রীদের স্বস্তিদায়ক মৈত্রীট্রেন ভ্রমণের আগে-পরে নানামুখী বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। ঘুষ-বকশিশের নামে যাত্রীদের হরেক বিড়ম্বনা থামছেই না।
‘কত রুপি কত টাকা নিয়ে যাচ্ছেন? লাগেজে অবৈধ কী কী মালামাল আছে? স্বর্ণালংকার কিনেছেন কিনা? ডলার এনড্রোস ও ভাঙানোর অসঙ্গতি’ ইত্যাদি প্রশ্নের আড়ালে নিরীহ যাত্রীদের বিব্রত ও নার্ভাস করে বকশিশ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। চুপিসারে অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে এমনকি প্রকাশ্যে বকশিশের নামে ঘুষ চাওয়া হয়। না দিলে অযথা হয়রানি ও বিব্রত করা হয় যাত্রীদের। লাগেজ মেঝেতে খুলে মালামাল পরীক্ষার নামে তছনছ করা হয়। নাছোর ঘুষখোররা ‘আমরা কীভাবে চলবো’ ‘কিছু তো খরচ করতেই হবে’ ‘যা খুশি দিয়েই দিন’ ইত্যাদি বলে টাকা-রুপি হাতিয়ে নিচ্ছেন।
এই রেলরুটে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন কয়েকজন যাত্রীর অভিযোগ, অসাধু কাস্টমস-ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রীতিমতো ভিক্ষুকের মতো বকশিশ দাবি করে বসেন।
অবশ্য যেসব যাত্রী কথিত বকশিশ না দেয়ার মনোবল বজায় রাখতে পারেন তাদেরকে ঘাটানো হয় না। যাত্রীদের কেউ কেউ নিয়ম-বিধি লঙ্ঘন কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়ায় মালামাল বহন করতে গিয়েও সমস্যায় পড়েন। সর্বোপরি উভয় দেশের রেল পুলিশসহ নিরাপত্তা কর্মীরা যথেষ্ট মাত্রায় যাত্রী-বান্ধব এবং ইতিবাচক।
মৈত্রী এক্সপ্রেস একটি আন্তঃদেশীয় ট্রেন হওয়া সত্তে¡ও সেখানে নিম্নমানের খাবার উঁচুদরে বিক্রি করা হচ্ছে। এই ট্রেনে দুপুরের খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে জনপ্রতি দুইশ’ টাকারও বেশি গুণতে হয়। তাও মানসম্মত নয়। এক কাপ চায়ের দাম বিশ টাকা আদায় করা হচ্ছে। খাবার সরবরাহকারী ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর কাছে খাবারের তালিকা ও দাম (ম্যানু চার্ট) চাওয়া হলে তিনি যাত্রীদের কোনো জবাব না দিয়ে দ্রুত চলে যান। মৈত্রী ট্রেনের সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, খাবারের মূল্য ট্রেন ভাড়ার সাথেই সমন্বয় করা প্রয়োজন। যা ভারতে দূরপাল্লার ট্রেন যাত্রীদের জন্য প্রচলিত আছে।
নিকটতম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখে মৈত্রী ট্রেন সার্ভিস চালু হয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন যাত্রীবাহী ট্রেন। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সাথে ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার মধ্যকার যাত্রীবাহী এই ট্রেন সার্ভিস চালু হয় দীর্ঘ ৫২ বছর পর। মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন বাংলাদেশের প্রান্তে দর্শনা জংশন এবং ভারত প্রান্তে গেদে স্টেশন হয়ে একই ট্রেন দুই দেশ পাড়ি দেয়। মাঝপথে ট্রেন পরিবর্তন অথবা কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নেই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন