ঢাকা, রোববার , ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

মহানগর

আবরার হত্যার চার্জশিটে যাদের নাম থাকছে

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৬ অক্টোবর, ২০১৯, ৪:৫৭ পিএম

ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে ৫ অক্টোবর শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা। তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা। হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলিট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ইতিমধ্যে পুলিশ ২০ জনকে গ্রেফতার করেছে। ১৩ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ৬ জন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট নভেম্বর দাখিল করা হবে। এ মাসেই তদন্তে শেষ করতে কাজ করছে আইনশৃংখলাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, কল রেকর্ড ও মশারি টানানোর রড, ক্রিকেট স্টাম্প আলামত হিসেবে দেখানো হবে চার্জশিটে।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে আসামি দেখানো হবে অন্তত ২০ জনকে। এদের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত ৬ নেতা থাকছেন। এরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

জবানবন্দি দেয়া ৬ নেতার তথ্যে আরও অনেকের নাম এসেছে, যারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। কৌতূহলবশত ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তাদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতাদেরও আসামি করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা এবং ১৬১ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মশারি টানানোর রড-স্টাম্প, খুনিদের কল রেকর্ড এবং মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথন আলামত হিসেবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। সংগ্রহ করা হচ্ছে ফরেনসিক টেস্ট ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা মঙ্গলবার উল্লিখিত সব তথ্য জানিয়েছেন।

সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপ পর্যালোচনা করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন আবরারকে নির্যাতনের নির্দেশ দেন ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন।

৫ অক্টোবর শনিবার বেলা পৌনে ১টায় ১৬তম ব্যাচকে ম্যানশন করে রবিন লিখেন, ‘সেভেনটিনের আবরার ফাহাদকে মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। দু’দিন টাইম দিলাম।’

পরদিন রোববার রাত ৭টা ৫৫ মিনিটে সবাইকে হলের নিচে নামার নির্দেশ দেন মনিরুজ্জামন মনির। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরারকে নিজ কক্ষ থেকে ডেকে করিডর দিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান সাদাত, তানিম এবং বিল্লাহসহ কয়েকজন। রাত ১টা ২৬ মিনিটে ইফতি মোশাররফ সকাল মেসেঞ্জারে লেখেন, ‘মরে যাচ্ছে। মাইর বেশি হয়ে গেছে।’

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছে, রাত ১২টা ২৩ মিনিটে আশিকুল ইসলাম বিটু ২০১১ নম্বর কক্ষের দিকে হেঁটে যায়। অমিত সাহার ওই রুমেই আবরারের ওপর শুরু হয় নির্যাতনের স্টিমরোলার। বিটু ওই রুমে যাওয়ার ৭ মিনিট পর বেরিয়ে যান। যাওয়ার সময় তার সঙ্গে কোনো কিছু না থাকলেও বেরিয়ে আসার সময় দেখা গেছে, তিনি একটি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসছেন।

এ বিষয়ে বিটুকে সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গোয়েন্দাদের তিনি বলেন, আবরারকে ডেকে আনতে প্রথমে মনিরের ওপর নির্দেশ আসে। পরে জেমি ও তানিমকে ফোন দিয়ে বলা হয়, আবরারকে ডেকে ২০১১ নম্বর রুমে ডেকে আন।

তাকে ওই রুমে নেয়া হলে দু’জন আবরারের দুটি ফোন এবং একজন তার ল্যাপটপ সার্চ করে দেখছিল। আবরারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গিয়ে লাইক-কমেন্টস দেখা হচ্ছিল। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ভেতরে ঢুকে দেখলাম, আবরার রুমের ভেতর শুয়ে আছে। আমি সকালকে প্রশ্ন করি, আবরারের এ অবস্থা কীভাবে হল? তাকে কে এভাবে মেরেছে? তখন মনির উত্তর দেয়, ‘অনিক ভাই বেশি মেরেছে।’

একজন প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও কেন আবরারকে নির্যাতনের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসনকে জানাননি বিটু? এ প্রশ্নের উত্তরে কোনো সদুত্তর নেই তার। বলেন, আমি মনে করেছিলাম, অনেক মারধর করা হলেও ঢাকা মেডিকেলে নিলে সে ঠিক হয়ে যাবে। আমি গিয়ে তাকে মারা যাওয়া অবস্থায় দেখিনি। হলে এ রকম নির্যাতন প্রায়ই হয়। এ কারণে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেইনি।

এদিকে যার রুমে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তিনি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে এখনও নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেননি। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ২০১১ নম্বর রুমে আমি থাকি, ইফতি মোশাররফ সকাল থাকে, মোস্তফা রাফির থাকে। এ কারণেই আমার নামটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়েছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে অমিত সাহার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই তাকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে।

ডিবি সূত্র জানায়, চার্জশিটে যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলাম ওরফে মোজাহিদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা মনিরুজ্জামান মনির, ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, শামসুল আরেফিন রাফাত, এএসএম নাজমুস সাদাতসহ আরও অন্তত ১০ জন রয়েছে। ওই সূত্রটি জানায়, রবিন, অনিক এবং সকালকে গ্রেফতার করতে না পারলে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়ে যেত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম মঙ্গলবার বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ২০ বা ততোধিকের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি।
সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এজাহারে থাকা ১৯ জন এবং এর বাইরে গ্রেফতার হওয়া ৪ জনসহ মোট ২৩ জনকে নিয়েই বিচার বিশ্লেষণ চলছে। তাদের মধ্য থেকে চার্জশিটে ২-১ জন বাদ যেতে পারে।

তবে যারা ১৬৪ ধারা করেছে এবং এজাহারের বাইরে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের সবার নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যে দু-একজনের নাম বাদ যাবে তাদের নাম এজাহারে থাকলেও তদন্তে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

 
 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন