ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭, ০৭ সফর ১৪৪২ হিজরী

সাহিত্য

আল মাহমুদ কেন বড় কবি

সায়ীদ আবুবকর | প্রকাশের সময় : ১৬ এপ্রিল, ২০২০, ১১:৫২ পিএম

শেক্সপিয়ারের কমেডিগুলো রোমান্টিক প্রেমকাহিনীনির্ভর, যা শুরু হয়েছে ’লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ দিয়ে। অ্যাজ ইউ লাইক ইট-এর রোজালিন্ড-অরল্যান্ডো, এ মিড সামার নাইটস ড্রিম-এর লাইস্যান্ডার-হার্মিয়া ও ডিমিট্রিয়াস-হেলেনা, টুয়েলফথ নাইট-এর লেডি অলিভিয়া-সেবাস্টিয়ান কিংবা টেম্পেস্ট-এর মিরান্ডা-ফার্ডিন্যান্ড-এসব চরিত্র একে অপরের প্রেমে পড়েছে প্রথম দর্শনেই এবং প্রথম দর্শনের প্রেমই তাদের টেনে নিয়ে গেছে পরিণয়ের দিকে। ভালো কবিতার সাথে এ ধরনের শেক্সপেরিয়ান প্রেমদর্শনের প্রচুর মিল। সুবোধ ঘোষের মতে, যে কবিতা প্রথমবার পাঠ করার সাথে সাথেই বিদ্যুচ্চমকের মতো ভালো লেগে যায়, তারপর সমস্ত জীবন বারবার ফিরে যেতে হয় তার কাছে, সেই কবিতাই উৎকৃষ্ট কবিতা। আল মাহমুদেরও এমন কিছু কবিতা আছে, যা প্রথম পাঠেই পাঠকের হৃদয়কে হরণ করে নেয়, তারপর আর তারা বাঁচতে পারেন না সে কবিতার সাথে সহবাস ছাড়া। বাংলা ভাষায় এরকম কবির সংখ্যা অসংখ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে উৎকৃষ্ট কবির সংখ্যা কোনো ভাষাতেই অজস্র হয় না। পি বি শেলি তাঁর ’ওড টু স্কাইলার্ক’ কবিতায় যে স্বর্গীয় স্পিরিটের কথা বলেছেন কিংবা এস টি কোলরিজ তাঁর ’কুবলা খান’ কবিতায় যে স্বর্গীয় আলোকচ্ছটার কথা, সেই আলোয় আলোকিত না হলে কোনো কবিই সত্যিকার অর্থে খাঁটি কবি হয়ে ওঠেন না। উইলিয়াম ব্লেক, বার্ড (ইধৎফ) বা কবি বলতে কেবল তাঁদেরকেই বুঝিয়েছেন, যাঁরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। আল মাহমুদ বাংলা ভাষার সেই সব দুর্লভ কবির একজন, যিনি ছিলেন স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত ও অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের রাস্তায় সতত পরিভ্রমণশীল। তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে তাঁর অমর কিছু কবিতা, যা তাঁকে আপামর বাঙালির মাঝে বাঁচিয়ে রাখবে যুগ যুগ ধরে।
কবিতা কী জিনিস, আল মাহমুদ তা ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন তাঁর ’কবিতা এমন’ কবিতায় কী স্বতঃস্ফূর্ত ভাষায় এভাবে :
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।
প্রত্যেক কবিই বেড়ে ওঠেন তাঁর নিজস্ব আলো-বাতাসে, আর তারই প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। রবার্ট ফ্রস্টকে বলা হয় নিউ ইংল্যান্ডের কবি। তাঁর সমস্ত কবিতায় নিউ ইংল্যান্ডের প্রকৃতি, মাটি ও মানুষ এত নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে যে, ফ্রস্ট আর নিউ ইংল্যান্ড হয়ে গেছে পরস্পরের পরিপূরক। ডাব্লিউ বি ইয়েটস ও সিমাস হিনি প্রিয় জন্মভূমি আয়ারল্যান্ডকেই চিত্রশিল্পীর মতো অঙ্কন করে গেছেন সমস্ত জীবন তাঁদের কবিতায়। মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করেই অমর কবি। আল মাহমুদও জানতেন, একজন কবির প্রথম পরিচয় তাঁর দেশ। আর দেশ মানেই তাঁর গ্রাম। মধুসূদন ফ্রান্সের ভার্সাই নগরী থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তাঁর প্রাণের নদী কপোতাক্ষের অববাহিকায়; রবীন্দ্রনাথও ‘এবার ফেরাও মোরে’ বলে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসার আকুতি নিয়ে; আল মাহমুদও ’প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ লিখে জানান দিয়েছিলেন তাঁর কবিতা মানেই তাঁর স্বদেশ, তাঁর জননী, তাঁর মাটি ও মানুষ। দেশকে নিয়েই বিশে^র শ্রেষ্ঠ কবিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বের দরবারে। স্বদেশ, স্বজাতি ও স্বধর্মের গুণকীর্তন করতে তাই কখনও কার্পণ্য করেননি আল মাহমুদ। কী অবলীলায় তিনি সরাসরি ব্যবহার করে গেছেন পবিত্র কোরানের আয়াত ’ফাবি আইয়ি আলা রাব্বি কুমা তুকাজ্জিবান’ তাঁর কবিতায়, যা বেমানান তো হয়ইনি, বরং আলাদা শৈল্পিক সৌন্দর্য দান করেছে আধুনিক বাংলা কবিতাকে।
কবিতা কখন বিদ্যুচ্চমকের মতো ভালো লেগে যায়? কবিতা তখনই বিদ্যুচ্চমকের মতো ভালো লেগে যায়, যখন তা আমাদের জীবনের কথা বলে, আমাদের হদয়ের কথা বলে। এ ধরনের কবিতা কখনও জোর করে লেখা যায় না, কল্পনা করে তৈরি করা যায় না, এমনি এমনিই এ আসে, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ যাকে বলেছেন ’শক্তিশালী অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত পস্রবণ’। কবিরা, তাই, মূলত কখনও কবিতা লেখেন না, বরং কবিতার জন্ম দেন। শিশুর মতো তাই তা আমাদের এত আকর্ষণ করে, এত কাহিল করে ফেলে আমাদেরকে তার অনাবিল ধ্বনির আঘাতে। আল মাহমুদের কবিতায় এ ধরনের ধ্বনির অনুরণন প্রায়শই দৃশ্যমান, কি তাঁর দেশপ্রেমের কবিতায়, কি সাম্যবাদের, কি বিপ্লবের কিংবা অধ্যাত্মবাদের। কি-স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ আমরা লক্ষ করি যখন তিনি বলেন :
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
-হাত দিও না, শরীর আমার ভরা বোয়াল মাছে।
... .... .... ... .... .... ....
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই।
কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো সব পাখ-পাখালি বনের সাধারণ।
সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি না তো
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো-
কী রূপক, কী উপমা! স্বাধীনতার এমন সাদামাঠা অমোঘ উচ্চারণ বাংলা ভাষায় খুব কম কবির কণ্ঠেই শোনা গেছে। আল মাহমুদ সেইসব সৌভাগ্যবানদের একজন, যাঁর কবিতা জাতীয় প্রয়োজনে নানা জাতীয় দিবসে শতকণ্ঠে উচ্চারিত হয় বাববার। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এলে যেমন অনিবার্য হয়ে ওঠেন আল মাহমুদ, তেমনি অনিবার্য হয়ে ওঠেন ২১ ফেব্রুয়ারি এলেও :
প্রভাত ফেরি, প্রভাত ফেরি
নেবে আমায় সঙ্গে?
বাংলা আমার ভাষা, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।
বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও শামসুর রাহমানের পরে, আল মাহমুদ ছাড়া বাঙালির জাতীয় জীবনে আর কাউকে এত অনিবার্য হয়ে উঠতে দেখি না। বড় কবি আছেন অনেকেই বটে, কিন্তু সকলেই জাতির জীবনের সাথে এত ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন না।
দেশের আনন্দে যার হৃদয় নেচে ওঠে না, বেদনায় মুষড়ে ওঠে না স্বদেশের দুঃখে, সে আবার কিসের কবি! ডাব্লিউ বি ইয়েটস আইরিশ মুভমেন্টের হিংস্রতায় ও প্রাণহানিতে বিচলিত হয়ে লিখেছিলেন ’ইস্টার ১৯১৬’। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা তাঁর দেশবাসীর স্বাধীনতার আন্দোলন দেখে বলে উঠেছিলেন ’এক ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের জন্ম হয়েছে।’ আল মাহমুদের মতো কবি, যাঁর কাব্যসত্তা জসীম উদদীন ও জীবনানন্দ দাশের রাস্তা ধরে প্রবেশ করেছিল বাংলা কবিতায়, জাতীয় জীবনের নানা দুর্যোগে-দুর্বিপাকে দ্বিধান্বিত হননি কখনও উচ্চকণ্ঠে স্বদেশের গান গেয়ে উঠতে, সেটা কার পক্ষে গেল কি বিপক্ষে গেল, তাতে তাঁর কিছু যায় আসেনি। আধুনিককালের কাবলিওয়ালা এনজিও-ব্যাংক প্রভৃতি শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে তাই তাঁর বিক্ষুব্ধ উচ্চারণ :
গ্রামীণ ব্যাংকের চালে উড়ে এসে বসেছে হুতুম
রৌদ্রঝরা দিন শেষে ধেয়ে আসে মরুর রজনী,
চোর ও শেয়াল ছাড়া আর সবই নিঃসাড় নিঝুম
সিঁদেল ইঁদুর খোঁজে স্বাবলম্বী বিধবার ননী।
... .... .... ... .... .... ....
শেয়ালের হাসি শোনো, কুমিরের বংশ বুঝি শেষ
সামন্ত নিকেশ করে বাংলাদেশে পুঁজির প্রবেশ।
এ ধরনের উচ্চারণ এর আগেও আমরা দেখেছি তাঁর ’সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছের পরতে পরতে :
শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতেরা উঠিয়েছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা,
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এসো এঁটে দেই বীরের তকোমা।
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।
আল মাহমুদ বিপ্লবী। কিন্তু তাঁর বিপ্লবের রাস্তাটা নজরুলের মতো নয়; অনেকটা সুকান্তীয় ঢঙে, ছাইচাপা আগুনের মতো, জ¦লে ওঠেন তিনি, যার তাপ আমাদের ধমনীকে হয়তো উত্তপ্ত করে না কিন্তু আমাদের হৃদয়কে ঠিকই সেক দিতে থাকে।
আল মাহমুদ কেন বড় কবি, দু-একটি উদাহরণ তুলে ধরলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাসমূহের একটি ’মিথ্যাবাদী রাখাল’। এ ধরনের কবিতা বাংলা ভাষায় বোধহয় একটাই লেখা হয়েছে। হাজার বছরের প্রচলিত একটা মিথ, তাকে ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে কিভাবে নতুন মিথের জন্ম দেয়া যায়, তা আল মাহমুদের ’মিথ্যাবাদী রাখাল’ না পড়লে অনুধাবন করা যাবে না। যে গল্প এ যাবৎ আমরা পাঠ করেছি এ কথা শেখার জন্য যে, মিথ্যা ধ্বংস ডেকে আনে, তাই মিথ্যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। সে গল্প আল মাহমুদ শোনালেন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। আধুনিক সভ্যতাকে একটা গ্রামে রূপান্তরিত করে তিনি আমাদেরকে বলতে থাকলেন সেই মিথ্যাবাদী রাখালের কাহিনী এভাবে :
আমরা যে উচ্ছন্নে যাওয়া উপত্যকা থেকে এসেছি
সেখানে বাস করতো এক মিথ্যেবাদী রাখাল। ছোকরা
কেন যে দিনরাত বাঘ বাঘ বলে চেঁচাতো আল্লা মালুম।
তারপর সত্যি একদিন বাঘ এসে সব খেয়ে ফেললো। প্রথম
সেই বালকটিকে, শেষে নখ আর দাঁত দিয়ে আঁচড়ে ফেললো
মানুষের গ্রাম, ঘরবাড়ি, রক্ত, মাংস।
আমরা এখন কোথায় যাই। আমরা তো সেই
মিথ্যাবাদীর খুলির উপর রোদ চমকাতে দেখে এসেছি। আর
দেখেছি সকল সত্যবাদীদের পঙ্গপালের মতো পালাতে।
য পলায়তি স জীবতি। পালায়নি যে সে তো এখন
বাঘের পেটে।
প্রাচীন কালের ঈশপের গল্প নয় এটি, এ গল্প আধুনিককালের ঈশপ আল মাহমুদের। আল মাহমুদের গল্প থামে না। তিনি বলে চলেন তাঁর নিজস্ব স্টাইলে :
মাঝে মাঝে ভাবি, ছেলেটা কেন এমন ’বাঘ বাঘ’ বলে চেঁচাতো?
আমরা ভয়ে বিহবলতায় চারদিকে ছুটে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে
বলতাম শুয়োরের বাচ্চা। সে বোকার মতো হাসতো। বিব্রত,
অপদস্থ। তারপর আমরা প্রতিজ্ঞা করলাম,
মিথ্যাবাদীর ডাকে আমরা আর সাড়া দেব না।
আমরা কেউ তার শেষ ডাকে সাড়া দিইনি যেদিন
সত্যি বাঘ এসেছিল। মৃত্যুর নখে ছিন্নভিন্ন হলো সেই ডাক।
সেই কাতর অনুনয় এখনও আমার কানে লেগে আছে।
আজ ভাবি, ছেলেটার কি তবে আগাম মৃত্যুর গন্ধ টের
পাওয়ার কোনো অস্বাভাবিক ইন্দ্রিয় ছিলো? যার দুর্গন্ধে
শত তিরস্কার উপেক্ষা করে সে চিৎকার করে উঠতো
বাঘ বাঘ বলে, ঠিক কবির মতো?
আহ, আবার যদি ফিরে আসতো সেই মিথ্যাবাদী ছেলেটা
জনমত ও তিরস্কারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রান্তরের চারণের মতো
বলে উঠতো, ‘মৃত্যু এসেছে, হে গ্রামবাসী-
হুঁশিয়ার।’
কবিতায় বহু গল্প শুনিয়েছেন কবিরা, যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি আমরা তন্ময় হয়ে। রবীন্দ্রনাথের ’দুই বিঘা জমি’ কিংবা ’জুতা আবিষ্কার’, নজরুলের ’মানুষ’ কিংবা ’উমর ফারুক’, সুকান্তের ’আগামী’ কিংবা ’একটি মোরগের কাহিনী’, জসীম উদ্দীনের ’কবর’ কিংবা ’পল্লী-জননী’ প্রভৃতি কবিতার কথা ভোলা যায় না। কিন্তু আল মাহমুদের ’মিথ্যাবাদী রাখাল’ সবকিছু থেকে একেবারে আলাদা। প্রচলিত মিথকে ভেঙে দিয়ে মিথ্যাবাদী রাখালকে সত্যবাদী বালক বানিয়ে দেওয়ার যে অভিনব প্রয়াস আর মাহমুদের, তার কোনো তুলনা নেই বাংলা সাহিত্যে। এখানে তিনি একা ও অনন্য।
আল মাহমুদের আরেকটি অসম্ভব সুন্দর কবিতা ’সোনালি কাবিন’। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, ’সোনালি কাবিন’ও ততদিন আনন্দপাঠ্য হয়ে থাকবে কাব্যরসিক বাঙালির কাছে। এ কবিতায় হয়তো কাহিনী নেই কিন্তু এর ভেতরে আছে এক তীব্র আবেগ, জ্বালাময়ী কামনার ঝড়, আবহমান বাংলার সভ্যতা-সংস্কৃতি, প্রকৃতির নানা রঙ ও রূপ, নারী, নদী, এক কথায় সমগ্র বাংলাদেশ, সেই সাথে সাম্যবাদের সম্মোহনী সুর- সব কিছু মিলে এক অপূর্ব কাব্য-ব্যঞ্জন, যার স্বাদ বারবার চেখে দেখার মতো। যেমন এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মণি-মাণিক্যের মতো লুকিয়ে আছে উপমা-উৎপ্রেক্ষা-অনুপ্রাস প্রভৃতি অমূল্য কাব্যালঙ্কার, তেমনি এর নিখুঁত শব্দবুনন, চমৎকার অন্ত্যমিল-বিন্যাস এবং নির্ভুল অক্ষরবৃত্তের চাল। মনে রাখার মতো, বারবার আবৃত্তি করার মতো, অমর পঙক্তি তাঁর-
সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি।
আল মাহমুদের মতো কবি কালে ভদ্রে জন্মগ্রহণ করেন কোনো ভাষায়। বাংলা ভাষা ও বাঙালি তাঁর মতো কবি পেয়ে অহঙ্কার করতে পারে, বুক ফুলিয়ে পৃথিবীর আকাশে উত্তোলন করতে পারে একটি নিশান, যার গায়ে উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে দিতে পারে ’আল মাহমুদ’।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
জান্নাত মাহিন ৪ জুলাই, ২০২০, ১১:২১ এএম says : 0
পড়ে এত ভাল লাগলো! আর একটা ভাব মনে জাগলো তাঁর সম্পর্কে জানা।
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন