ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, ২০ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সাহিত্য

বিরামহীন ব্যারাম

অ য়ে জু ল হ ক | প্রকাশের সময় : ২৩ এপ্রিল, ২০২০, ১১:৫২ পিএম

মামুনের সামনে বিসিএস পরীক্ষা। বিরামহীন ভাবে পড়া দরকার। এই বিরামহীন শব্দটা মামুন প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় বলবে। হাসান ও শামীম মেসের দুই বন্ধু বিগত কয়েক মাসে বিরামহীন শব্দের অপপ্রয়োগে অতিষ্ঠ। দ্রুত করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় শামীম গ্রামে চলে গেছে। বর্তমানে হাসানকেই মামুনের বিরামহীন শব্দটা হজম করতে হচ্ছে। শামীম যাওয়ার আগে বলে গেছে, করোনার প্রকোপ কমলেও যতদিন না মামুনের বিসিএস শেষ হয় তার আগে সে আর ফিরছে না।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। বেশ ঝলমলে চাঁদ আকাশে। দুনিয়া ব্যাপি করোনা নামক অদেখা এক ভাইরাস মানুষের মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। হাসান নিজেও টেনশনে আছে। টেনশন কাটানোর জন্য মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে আকাশে ওঠা চাঁদ দেখছে। এই কর্মব্যস্ত নগরে একটা সময় মানুষের চাঁদ দেখার সময় ছিল না। এখন ঘরবন্দী অনেক মানুষের সাথী আকাশের চাঁদ, ঝিকমিক করে মৃদু আলো বিলানো তারা। রাত আটটার খবর। আক্রান্ত বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যু। উপসর্গ নিয়ে জেলায় জেলায় মরছে মানুষ। হাসান হাক দেয়, মামুন দেশের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।
মামুন বই সামনে করে মোবাইল টিপছিল। বিরামবিহীন পড়ার বদলে বিরামহীন মোবাইল টেপা। তব্ওু খ্যাঁক করে ওঠে, এই তোকে না বলেছি উচ্চস্বরে কথা বলবি না। শব্দ দূষণ হয়। আমার বিরামহীন পড়ার ব্যাঘাত ঘটে।
-তুই তো মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত।
-জাস্ট ফর ফাইভ মিনিট, তিষার সাথে চ্যাট করলাম। এবার বিরামহীন ভাবে পড়া শুরু হবে।
কথা শেষ না হতেই ঘরে প্রবেশ করেন মেসের বাবুর্চি গোলে বাহার। ওনার নাম গোলে বাহার না হয়ে গোলে মালে বাহার হওয়া উচিৎ ছিল। বয়স ষাট পেরিয়েছে। স্বামী মারা গেছে বহুকাল আগে। ছেলে মেয়েরা দেখেনা। বাধ্য হয়ে মেসে মেসে কাজ করেন। আপাতত তিনি মেসে মেসে কাজ করতে পারছেন না। এই মেস টাকেই বেছে নিয়েছেন। বিরাট অবসরে মামুন তাকে ফেসবুক শেখানোর মহান দায়িত্ব নিয়েছে। তার কথা প্রযুক্তি থেকে কেউ দূরে থাকবে না। গোলে বাহার ঘরে ঢুকে সোজা মামুনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখে হাসি হাসি ভাব। যেন একটু আগে চাঁদের মাটিতে পতাকা গেড়ে এসেছেন কিংবা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন।
-বাবা মামুন।
-হু।
-আমি তো সব বুইঝা ফালাইছি।
মামুন উজ্জীবিত। বলে, লাইক, কমেন্ট করেন?›
কমেন্ট করিনা বাবা। লাইক করি। যেইডা দেখি হেইডাই তো লাইক করি, কিন্তু.....
-কী!
-এই যে এতো মানুষ লাইক করি। এই বয়সে কিন্তু এতো লাইক করা সম্ভব না।
মামুন কী বোঝে কে জানে! বলে, অসম্ভব কিছু না। আপনি বিরামহীন ভাবে লাইক, কমেন্ট করে যান। একদিন ঠিকই ফেসবুক সেলিব্রেটি হয়ে যাবেন।
-সেলিব্রিটি কী!
-সেটা আরেক দিন বলব। এখন আমার বিরামহীন ভাবে পড়তে হবে।
গোলে বাহার ঘাড় নেড়ে চলে যায়। মামুন খসখস করে বইয়ের পাতা উল্টায়। শিয়াল পালনোর সময় যেমন ঘাতঘোত আওয়াজ করে, কিছুক্ষণ সেরকম বিরামহীন শব্দ করে থেমে যায়। বইয়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে। কানের কাছে মোবাইল বেজেই চলে। মনেহয় রিংটোনের ট্যাং টুং শব্দে মামুন ঘুমের আরও গভীর স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। হাসান হতাশা, বিরক্তি নিয়েই মামুনের মোবাইলটা হাতে নেয়। একের পর এক কল করে না পেয়ে সম্ভবত হাসানের চেয়ে বেশি বিরক্ত হয়ে তিষা লিখেছে, তোমার সাথে আর কোনদিন যোগাযোগ করবো না। গুড বাই ফরএভার। মেয়েটার বিরক্তি আরেকটু বাড়িয়ে দিলে মন্দ হয় না। হাসান লিখে দেয়, ওঁকে। থ্যাংক উ।
সাথে সাথে তিষার ম্যাসেজ, হোয়াট!
মেয়াটা হোয়াট হয়ে গেছে। আরেকটু হোয়াট হলে তাকে দিয়ে জামা কাপড় আয়রন করা যাবে! ভাত রান্না করা যাবে! হাসান রিপ্লাই দেয়, স্টপ নাউ। স্টুপিড গার্ল। আই হেট উ। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। মোবাইলটা স্তব্ধ হয়ে যায়। তিষা আয়রন কিংবা রান্নার কাজে সেবা দেয়া শুরু করতে পারে! তিষার প্রথম ম্যাসেজ টা রেখে বাকি গুলো ডিলিট করে হাসান নিজের জায়গায় চলে আসে।
মামুনের ঘুম ভাংগে রাত দশটার দিকে। ঘুম থেকে জেগে মামুন মোবাইল ধরবে সেটা চলবে শেষ রাত অব্ধি। আজ কী হয় কে জানে! মামুন কল করে, অপরাধ টা জানতে পারি!
ওপাশ থেকে কী বলে কে জানে। তবে মামুন কয়েক মুহুর্ত ক্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ধপাস করে খাটের উপর শুয়ে পড়ে। তার বিরামহীন ভাবে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকা দরকার। একটু বাদেই মামুন লাফ দিয়ে ওঠে। বাইরের দিকে পা বাড়ায়।
হাসান কিছুটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করে, ‹কোথায় যাবি?
-জানিনা। তবে হাঁটতে থাকবো। বিরামহীন ভাবে। যাবি আমার সাথে?
-না।
-আজ তের বছর পর প্রান ভরে আকাশের চাঁদ দেখব। চল যাই।
-না, তুই যা। এই সংকটপূর্ণ সময়ে এত রাতে বাইরে যাওয়া ঠিক হবেনা।
মামুন চলে যায়। চেহারায় বিষন্নতা। রাত দুটো। হঠাৎ দরজায় খটাখট আওয়াজ। হয়তো মামুন ফিরেছে। নয়তো এতোরাতে কে কড়া নাড়বে! হাসান দরজা খুলেই অবাক। একঝাঁক মানুষ। চোখে হিংস্রতা।
-এই চল।
-কোথায়!
হাসানের কথা শেষ হবার আগেই গালের উপর প্রচন্ড একটা থাপ্পড়।
-এই চল।
দ্বিতীয় বার কোথায় প্রশ্ন মানে আরেকটা থাপ্পড়। সাথে কিল-ঘুষিও জুটতে পারে। চুপচাপ ওদের সাথে চাঁদের মৃদু আলো সাথে নিয়ে বিরামহীন হাঁটা। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেন নিয়ে যাচ্ছে কে জানে! এরা কী ভাইরাস! মানুষের মতো দেখতে কোন ভাইরাস কী আছে?
মাঝখানে একজন বলে ওঠে, কবির সাহেবের মেয়ে তিষার সাথে বাটপারি। আইজ ওরে করোনাভাইরাসে মরা লাশের মতো পুইতা ফালামু।
হাসান কিছুটা সাহস নিয়ে বলে, আপনারা যাকে ধরতে এসেছেন সে আমি না। মামুন। সে তো এখন চাঁদ দেখছে। আমি নির্দোষ, হাসান।
সাথে সাথে গর্জন, আমাগো লগেও বাটপারি! পেছন থেকে জোরালো লাথি। হাসান হুড়মুড় করে পড়ে যায়। বিরামহীন ভাবে চলতে থাকে কিল-ঘুষি।
হাসান কাতর কন্ঠে বলে, ভাই এভাবে বিরামহীন ভাবে মারছেন কেন! মরে যাব তো। বিরামহীন তর্জন গর্জন চলতে থাকে। হাসানের কথা কেউ শোনে না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন