ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭, ২১ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

রাজনীতি

মহামারীর মধ্যেও প্রকাশ্যে সরকারের দুর্নীতি চলছে-রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৭ জুন, ২০২০, ৫:১১ পিএম

সরকার অবিচার-অনাচার আর দুর্নীতিকেই নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দুর্নীতি হয়ে গেছে তাদের মজ্জাগত। তিনি বলেন, এই ভয়াল করোনা মহামারির মধ্যেও দুর্নীতি চলছে প্রায় প্রকাশ্যে। নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে বিরোধী দল ও মতের মানুষের বিরুদ্ধে র‌্যাব-পুলিশকে লেলিয়ে দেয়া, ব্যাংক ডাকাতি, টাকা পাচার, ভোট ডাকাতি, ব্যালট চুরি করে বছরের পর বছর ধরে এভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক নানা অপকর্মে সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এমন মহাদুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তেও সরকারের দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতির চিন্তায় মগ্ন। স্বাস্থ্যখাতকে লুটপাটের আঁখড়ায় পরিণত করেছে। সেখানে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব।

রোববার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ক্ষমতাসীন দলের হোমরা-চোমরারা দুর্নীতিতে ভাগ বসাতে ব্যস্ত অভিযোগ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাসপাতাগুলোতে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট,স্বাস্থ্য সরঞ্জাম, পিপিই সংকটে করোনায় আক্রান্তদের সেবা দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। এমন বাস্তবতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া ‘করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জরুরি সহায়তা’ প্রকল্পটির আওতায় এক লাখ সেফটি গগলস কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে দেখা যায়, প্রতিটি সেফটি গগলসের দাম ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে প্রতিটি সেফটি গগলস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায়। এই প্রকল্পের আওতায় মোট এক লাখ সাত হাজার ৬০০ পিপিই কেনা হবে। যার প্রতিটির জন্য খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার ৭০০ টাকা। পিপিই কেনায় মোট খরচ হবে ৫০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব শর্ত মেনে ওষুধ অধিদপ্তরের সব শর্ত অনুসরণ করে বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি ভালো মানের পিপিই বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকায়। এই প্রকল্পের আওতায় ৭৬ হাজার ৬০০ জোড়া বুট জুতা কেনা হবে। প্রতিটি জুতা'র খরচ দেখানো হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। এই খাতে খরচ ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ বর্তমান বাজার মূল্যে প্রতিটি বুট জুতা কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়'।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে করোনা মোকাবিলার প্রকল্পে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার চেয়ে সফ্টওয়্যার, ওয়েবসাইট, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে তুলনামূলক বেশি খরচ হচ্ছে। গবেষণার জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ইনোভেশন নামের আলাদা একটি খাত তৈরি করে সেখানে ৩৬ কোটি টাকা খরচ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চলমান করোনা সংকটের মধ্যে যেখানে সবকিছু স্থবির, সেখানে এই প্রকল্পে ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা। মাত্র ৩০টা অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরির খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৮০টা সেমিনার ও কনফারেন্স করে খরচ করা হবে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়েছে ওয়েবসাইট উন্নয়ন খাতে। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খরচ হবে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি ডাটাবেইস তৈরিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি কম্পিউটার সফ্‌টওয়্যার কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৩০টি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য খরচ ধরা হয়েছে আরো ৪৫ কোটি টাকা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের আনা-নেয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। দেশে সকল স্থলবন্দরে যাতায়াত করা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা দেখতে নির্মাণ করা হবে অনাবাসিক ভবন। সেসব ভবন নির্মাণে খরচ দেখানো হয়েছে ১৯০ কোটি টাকা। প্রকল্পে জিনিসপত্র ক্রয়ের যে দাম ধারা হয়েছে তা মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এই মহামারির মহাদুর্দিনেও সাগরচুরির মহা উল্লাসে ওরা মেতে উঠেছে তারা।

তীব্র সংকট মোকাবিলায় ভেন্টিলেটর আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হলেও আজও ক্রয়াদেশ দেয়া হয়নি মন্তব্য করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ভেন্টিলেটর আমদানির আগেই সেখানে দুর্নীতির কালো হাত থাবা বিস্তার করেছে। এই ক্রয়ের সঙ্গে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলে জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে গণমাধ্যম। খবরে বলা হয়েছে, দুর্নীতির কারণে কার্যাদেশ দিতে দেরি হচ্ছে। করোনাকালের ১২ সপ্তাহেও এই আদেশ দেয়া যায়নি। অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির কারণে আটকে আছে ভেন্টিলেটর আমদানি। দেয়া যাচ্ছে না কার্যাদেশ। এভাবে গত একদশকে এই সরকারের প্রতি ক্ষেত্রেই, প্রতিটি প্রকল্পেই চুরি-দুর্নীতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। ত্রাণ চুরি, চাল চুরি, খাতা চুরি, বালিশ চুরি এমনকি করোনা চিকিৎসার সরঞ্জাম কিনতেও চুরি আর দুর্নীতি। অপ্রিয় সত্য হলো এই সরকারের জন্মই যেহেতু নিশিরাতে জনগণের ভোট চুরির মাধ্যমে, ফলে সবাই মনে করে দুর্নীতি, চুরি-জোচ্চুরি-ই এই সরকারের মূল ভিত্তি। একটি ভেন্টিলেটরের জন্য হাহাকার চলছে। এই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের রোল মডেল।

তিনি বলেন, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ, এম্বুলেন্স, হাসপাতালের বেড আর করোনা আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা সুবিধা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এই সরকার। উন্নয়নের ফাঁপা গল্পের মাঝে যে একটা বাতাসযুক্ত বেলুন ছিল করোনার সামান্য ধাক্কায় সেটা ফুটো হয়ে গেছে। জনগণের চিকিৎসা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার হরনের দায় সরকারেরই। গত দু’সপ্তাহ যাবত আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে করোনা আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে যখন করোনা ভাইরাসে মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে, তখনও সরকার নিরীহ অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করে চলেছে। অপরিনামদর্শী ও ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার সমগ্র দেশে করোনা ভাইরাসের চাষাবাদ বাড়াচ্ছে। ঘরে ঘরে করোনা বিস্তারের সুযোগ করে দিচ্ছে।

সরকারের মন্ত্রীদের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, লক ডাউন' না বলে 'সাধারণ ছুটি' আখ্যা দিয়ে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিকে হালকা করে দেখানো, করোনা সম্পর্কে কতিপয় মন্ত্রীর স্থুল মন্তব্য, এই ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার পরিবর্তে 'শেখ হাসিনা থাকতে কোনো চিন্তা নেই' আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদের এমন কান্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য, বিভিন্ন অফিস-আদালত, মার্কেট-দোকানপাট-বিপনী বিতান কিংবা গার্মেন্টস শিল্প কলকারখানা ইচ্ছে হলে বন্ধ করা, ইচ্ছে হলে খুলে দেয়ার কারনে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেছে পরিস্থিতি। কোন ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া সবকিছু খুলে দেয়ার পর এখন আক্রান্ত আর মৃত্যুর ভয়াবহ বৃদ্ধির কারনে গতকাল থেকে আবার এলাকা ভিত্তিক জোন ঘোষণা করে নতুন করে লকডাউন দিতে শুরু করেছে সরকার। সরকারের আচরণ এমন যে, খুলে দিলাম, ছেড়ে দিলাম, ছড়িয়ে দিলাম, এবার দিচ্ছি লক করে, মরো এবার নিজ ঘরে।

হাসপাতালগুলোতে করোনা আক্রান্ত মানুষের ঠাঁই মিলছেনা অভিযোগ করে রিজভী বলেন, প্রায় প্রতিদিনই দেশের গণমাধ্যমগুলোতে খবর বেরুচ্ছে, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে পথিমধ্যেই মারা যাচ্ছে মানুষ। করোনা আক্রান্ত কিংবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় যেসব পরিসংখ্যান প্রতিদিন সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, প্রকৃত পরিস্থিতি তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খারাপ।

বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশে করোনার প্রয়োজনীয় টেস্ট হচ্ছে না, কোন চিকিৎসা নেই, হাসপাতালে ঠাঁই মিলছে না, মৃত্যু ও আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন ২৬ হাজার ৫৬ জন। গত এক মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩২ জন। এ মাসের শেষে এ সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৯ লাখ ১১ হাজার ৬০ জনে। যার সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানের কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। গত ২ জুন প্রকাশিত এমআরসি সেন্টার ফর গ্লোবাল ইনফেকশিয়াস ডিজিজ এনালাইসিস শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদি কোনো পদক্ষেপ প্রহণ করা না হয় তাহলে ৩০ জুনের মধ্যে ১৯ হাজার ৮৪৮ টি আইসিইউ বেড লাগতো পারে। অথচ সরকারি হাসপাতালে এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আইসিইউ বেড আছে মাত্র ৫০৮টি। যা আমাদের মোট চাহিদার ২.৫৫ ভাগ। এ থেকে সম্যক অনুমিত হয়, এদেশের মানুষকে সরকার কতটা অসহায় এবং বিপদজনক পরিস্থিতিতে ফেলে রেখেছে। এদিকে বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় ৭০০ আইসিইউ বেড আছে। যা ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন ও বড়লোকেরা বুকিং দিয়ে রেখে দিয়েছেন অথবা তাদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে ৭ লাখ ছাড়িয়েছে। আইসিডিডিআরবির বরাত দিয়ে তারা এই তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকারিভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের যে সংখ্যা জানানো হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। ইকোনমিস্টের রিপোর্ট যদি সত্যি হয় তাহলে দেশের অবস্থা কতটা ভয়ঙ্কর তা সহজে অনুমেয়। দেশের মানুষ এখন বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

প্রণোদনা নেয়ার পর পোশাক শিল্পে ছাটাইয়ের ঘোষণা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না মন্তব্য করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রণোদনার পাঁচ হাজার কোটি টাকা নেয়ার পর তাদের এই ঘোষণা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। পোশাক শিল্প মালিকদের এই ঘোষণায় অন্য কোন কোনো দুরভিসন্ধি থাকতে পারে। ইতোমধ্যে পোশাক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত আছে। লকডাউন শুরুর পর থেকে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। তাদের রুজি রোজগার বন্ধ হওয়ায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই সময়ে শুধু ব্যবসার কথা চিন্তা করে ছাঁটাই অন্যায্য। এদিকে বিজিএমই এখন পর্যন্ত ২৬৪ জন পোশাক শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত বলে শিকার করলেও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকরা করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের পুরো দায়িত্ব বিজিএমইএর নেয়ার কথা থাকলেও তারা নিচ্ছে না। শ্রমিকদের জীবন জীবিকাকে আমলে না নিয়ে ছাঁটাইয়ের কথা বলা চরম অমানবিক ও মানবতাবিরোধী।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন