ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭, ২৯ মুহাররম ১৪৪২ হিজরী

খেলাধুলা

খেলাধুলায় এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা ২

প্রকাশের সময় : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

রক্ষণশীল সমাজের গÐি থেকে বেরিয়ে এসে নানা প্রতিক‚লতা পেরিয়ে ক্রীড়াঙ্গণে একটার পর একটা সাফল্যের ইতিহাস রচনা করে চলেছে বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াবিদরা। মেয়েদের সাফল্যে আজ স্ব-গর্বে উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা, সমৃদ্ধ হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গণের ইতিহাস। খেলাধুলায় মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বিতীয় কিস্তি
কাবাডির মর্যাদা এখন মেয়েদের হাতে
শামীম চৌধুরী : জাতীয় খেলা কাবাডিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে কম স্বপ্ন দেখেনি বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রেমীরা। ১৯৮৪ সালে কাঠমাÐুতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞ এসএ গেমসের (তৎকালীন সাফ গেমস) অভিষেক আসরেই বাংলাদেশ পুরুষ কাবাডি দল ছড়িয়েছে আলো। জিতেছে রৌপ্য পদক। ১৯৯০ সালে চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ার বৃহত্তম ক্রীড়া আসর এশিয়ান গেমসে কাবাডি ডিসিপ্লিন অন্তর্ভুক্ত হয়েই দলগত খেলা থেকে প্রথম রৌপ্য পদক জয়ে দেশকে দিয়েছে সুসংবাদ লাল-সবুজের পুরুষ কাবাডি দল। ভারতকে টেক্কা দিয়ে ভবিষ্যতে যে খেলা থেকে স্বর্ণজয়ের সম্ভাবনা এক সময়ে দেখতো ফেডারেশন, জাতীয় খেলা কাবাডিতে পুরুষ দলকে ঘিরে সে স্বপ্ন এখন ফিকে হতে বসেছে। ১৯৯০ সালে বেইজিং এবং ২০০২ সালে বুসান এশিয়াডে রৌপ্যজয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ পুরুষ কাবাডি দল।
এশিয়ান গেমসের সর্বশেষ ২ আসর গুয়াংজু এবং ইনচিওনে পুরুষ কাবাডি দল কাটিয়েছে পদকহীন! দক্ষিণ এশিয় গেমসের সর্বশেষ ৪ আসরে ব্রোঞ্জেই সন্তুষ্ট হতে হয়েছে পুরুষ কাবাডি দলকে! অথচ, ফেডারেশনের রুটিন আসর জাতীয় কাবাডি এবং সীমিত পরিসরে ক্লাব কাবাডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেই আন্তর্জাতিক আসরে আলো ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ নারী কাবাডি দল! এশিয়ান গেমসের সর্বশেষ ২ আসরে পুরুষ কাবাডি দল যেখানে পদকশূন্য, সেখানে ওই দুই আসরেই ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে নারী কাবাডি দল। দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের (এস এ গেমস) সর্বশেষ দুই আসরে পুরুষ দল যেখানে ব্রোঞ্জে থেকেছে সন্তুষ্ট, সেখানে নারী কাবাডি দল জিতেছে রৌপ্যপদক!
বাংলাদেশ নারী কাবাডির পথচলার শুরুটা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না। আশি দশকের শুরুতে মহিলা কাবাডি প্রবর্তন করে আসরটি নিয়মিত করতে পারেনি কাবাডি ফেডারেশন। খোলা মাঠে খেলাটি খেলতে হতো বলে শারীরিক শক্তিমত্তা আর স্ট্যামিনার খেলায় মেয়েরা আসতে চাইতো না সে সময়ে। অন্য খেলায় অংশগ্রহণকারী সার্ভিসেস দলসমূহের নারী ক্রীড়াবিদদের ধরে এনে কোনমতে দল গঠন করে কাবাডির কোর্টে নামিয়ে দিয়েই কৃতিত্ব জাহির করতো কাবাডি ফেডারেশন। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারী কাবাডিকে আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নিতে কাবাডি ফেডারেশনকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০০৫ সাল পর্যন্ত। ২০০৬ সালে কলোম্বো সাফ গেমসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে নারী কাবাডি, সেই আসরে বাংলাদেশ নারী দল অংশ নিবে বলে যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাবাডি ফেডারেশন। সে কারণেই জাতীয় দল গঠনে আন্তঃজেলা মহিলা কাবাডি প্রবর্তন করতে হয় কাবাডি ফেডারেশনকে। অভিষেক আসরেই ব্যাপক সাড়া পেয়েছে ফেডারেশন। এই টুর্নামেন্টটিই বদলে দিয়েছে দৃশ্যপট। ছেলেদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কাবাডিতে নারী দলের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ওই আসরের সাফল্যে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশ নারী কাবাডি দলের অংশগ্রহণের অতীত এক যুগও পেরোয়নি। ২০০৫ সালে ভারতের হায়দারাদে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক বাংলাদেশ নারী কাবাডি দলের। অভিষেকেই তৃতীয় বাংলাদেশ নারী দল। আশ্চর্য হলেও সত্য, এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের ওই আসরে বাংলাদেশ নারী কাবাডি দলে কাবাডি খেলোয়াড়ের চেয়ে সংখ্যায় বেশি ছিল অন্যান্য খেলার নারী ক্রীড়াবিদ! জাতীয় সাইক্লিংয়ে সেরা ফারহানা শিলার সঙ্গে নারী সাইক্লিস্ট চিনমাই মারমা, নারী হ্যান্ডবল খেলোয়াড় মালেকা পারভিন, নারী কুস্তিগীর শিরিন, নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় ফারহানা, রোমানাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নারী কাবাডি দলে নেয়া হয়েছিল! এমন তথ্যই দিয়েছেন কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামÑ ‘কাবাডি কৌশলের পাশাপাশি শারীরিক শক্তির ও খেলা। কাবাডি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলেও চলবে, শক্তি থাকা চাই। এধরনের একদল মেয়েই খুঁজছিলাম। তাই জাতীয় নারী কাবাডি দল গঠনে আনসার, বিজেএমসিকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করে তাদের হ্যান্ডবল, সাইক্লিং, ফুটবল, ভলিবল, কুস্তি খেলে এমন ক’জন মেয়ে চেয়েছিলাম। আমাদের সে অনুরোধ রেখেছে তারা। তার সঙ্গে আন্তঃজেলা মহিলা কাবাডি থেকে বাছাই করে ক’জনকে পেয়েছি। এদেরকে নিয়েই শুরু হলো আমাদের পথচলা।’
নারী কাবাডি খেলায় এক সময় আগ্রহ ছিল না তেমন। ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের অভিষেক আসরে তৃতীয় হয়ে, ২০০৬ সালে কলোম্বো সাফ গেমসে রৌপ্য পদক জয়ে এখন বদলে গেছে দৃশ্যপট। কাবাডি খেলে নারী কাবাডি খেলোয়াড়রা এখন পেয়েছে রুটি-রুজির নিশ্চয়তা। আনসার ও ভিডিপি, বিজেএমসি, বর্ডার গার্ড এবং পুলিশে ক্রীড়াবিদ কোটায় চাকরির নিশ্চয়তা পেয়েছে নারী কাবাডি খেলোয়াড়রা। চাকরির নিশ্চয়তার কারণেই কাবাডি খেলায় নারীদের অংশগ্রহণ উত্তোরত্তোর বাড়ছে বলে মনে করছেন ফেডারেশনের সহ-সভাপতি নিজাম উদ্দিন চৌধুরী পারভেজÑ ‘যে সব মেয়ে কাবাডিতে আসছে, তাদের অধিকাংশই অস্বচ্ছল, গরীব। কাবাডিতে ভাল খেললে চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে মেয়েরা এই খেলায় আসতে শুরু করেছে। কাবাডি খেলে চাকরির নিশ্চয়তা পাচ্ছে এখন মেয়েরা। এখন শুধু সার্ভিসেস দলগুলোতেই একশ’র কাছাকাছি মেয়ে চাকরি করছে।’
অন্যান্য খেলা থেকে ধার করে এনে এক সময় গড়তে হতো দল, এখন সেই কাবাডিতেই এখন খেলছেন মেধাবী শিক্ষার্থী কাজি শাহিনা বৃষ্টি! দর্শনে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে সম্প্রতি এমপিএড (মাস্টার্স অব ফিজিক্যাল অ্যাডুকেশন) করেও কাবাডি ছাড়েননি বৃষ্টি! ২০০৭ সালে আনসার ও ভিডিপি ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন ফাতেমা আক্তার পলি। ক্রিকেটের মায়া ছেড়ে ২০০৮ থেকে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন কাবাডিতে। এখন তিনি জাতীয় নারী কাবাডি দলের অধিনায়ক। তার অধিনায়কত্বেই আসামের গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ এস এ গেমসে বাংলাদেশ নারী দল পেয়েছে রৌপ্যপদক।
জাতীয় খেলা কাবাডির মর্যাদা এখন মেয়েদের হাতে। তবে নারী কাবাডি দলকে ঘিরে এতোটা স্বপ্ন কিন্তু দেখেননি কোচ আবদুল কাইয়ুমÑ ‘আন্তর্জাতিক কাবাডিতে প্রথম যখন অংশ নেয় মেয়েরা, তখন এতোটা স্বপ্ন দেখিনি। অংশগ্রহণেই তখন পেয়েছি আনন্দ। এখন আমরা স্বপ্ন দেখছি ভবিষ্যতে এশিয়ান গেমস এবং এসএ গেমস থেকে স্বর্ণপদকের।’
দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের (এস এ গেমস) পর পর দুই আসরে রৌপ্য পদক জয়ে নারী কাবাডি দলকে ঘিরে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখছেন অধিনায়ক ফাতেমা আক্তার পলিÑ ‘যখন কাবাডি খেলা শুরু করি, তখন এতোদূর আসব, তা চিন্তাও করিনি। এই কাবাডি আমাকে দিয়েছে অনেক কিছু। এসএ গেমসে দু’বার রৌপ্যজয়ী দলে প্রতিনিধিত্ব করেছি, পর পর দু’বার এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ পদক জয়ী দলে ছিলাম আমি। ভারতকে হারিয়ে যে কোন একটি গেমসে স্বর্ন পদক জিততে চাই।’ তবে যে কাবাডিতে এতোটা উজাড় করে দিচ্ছে মেয়েরা, ভবিষ্যতে স্বর্ণপদক জয়ে প্রতিজ্ঞ, সেই খেলায় নিবিড় অনুশীলনের জন্য আদর্শ পরিবেশ এবং উন্নতমানের সুযোগ সুবিধা চান কাজি শাহিনা বৃষ্টিÑ ‘দলীয় গেমস বলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে সচেষ্ট থাকি আমরা। এখন আমাদের দাবি একটাই, আর একটু সুযোগ সুবিধা এবং ভাল পরিবেশ।’
জাতীয় খেলা কাবাডির মর্যাদা ধরে রাখছে মেয়েরা, অথচ কি জানেনÑকাবাডি খেলার সুবাদে বিজেএমসিতে চাকরি করছেন যারা, চাকরিতে তাদের পদবি বড়ই অসম্মানের। পরিচয়টা চাকরিস্থলে ‘হেলপার’। স্নাতকত্তোর ডিগ্রি নিয়েও বৃষ্টির পদবী অন্য নারী ক্রীড়াবিদদের মতো হেলপার! দেশকে গর্বিত করা মেয়েরা চান চাকরিস্থলে সম্মান।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন