বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ঝুলে রইল শিক্ষার্থীদের দাবি

দুই দিনের আল্টিমেটাম : আন্দোলন অব্যাহত যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই তাদের দাবি যৌক্তিক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাফ ভাড়ার জন্য সংসদে আইন পাসের দাবি রুমিনের

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৮ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০০ এএম

২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবির কথা জানিয়েছিল। কিন্তু সেই দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তাই একই দাবিতে শিক্ষার্থীরা ফের রাজপথ অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীর ধানমিন্ড, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে দুই দিনের সময় বেঁধে দেয় শিক্ষার্থীরা। তবে আজ রোববার ও আগামীকাল সোমবার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করারও ঘোষণা দিয়েছে তারা।

এদিকে, বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া ঠিক করা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘন্টার বেশি সময় ধরে চলা বৈঠক পরিবহন নেতাদের পক্ষ থেকে বিআরটিএ-কে টাস্কফোর্স গঠনসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়। বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া কমানোর বিষয়ে বিআরটিএ অত্যন্ত আন্তরিক। বৈঠকে বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। পরিবহন নেতাদের পক্ষ থেকে টাস্কফোর্স গঠনসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়ে উল্লাহ বলেন, ঢাকার শতকরা ৮০ শতাংশের মতো বাস মালিক গরিব। তারা যদি হাফ ভাড়া নেয় সরকার কীভাবে তাদের এ ক্ষতি পোষাবে আগে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত আন্তরিকও। কিন্তু আগে অনেকগুলো বিষয়ে সমাধান করতে হবে। আমাদের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সমাধানের মাধ্যমে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। নতুন যে যেসব প্রস্তা এসেছে এগুলো নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে শিক্ষার্থীরা জানায়, ৯ দফা দাবি আদায়ে গত বৃহস্পতিবার তারা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে গিয়েছিল। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহ সময় চেয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে তাদের দাবি মেনে প্রজ্ঞাপন জারি করা না হলে ওই দিন দুপুরে শিক্ষার্থীরা বিআরটিএ কার্যালয় ঘেরাও করবে।
জানা যায়, গতকাল শনিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে ধানমন্ডির রাপা প্লাজার সামনে মিরপুর সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক শ শিক্ষার্থী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে বেলা দুইটায় শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে দেওয়ায় দুই দিকের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে লালমাটিয়া মহিলা কলেজ, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ, নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ, মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজ, সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, তেজগাঁও কলেজসহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামার খবরে ঘটনাস্থলে যান পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার। তিনি সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা জানান, ডিসি বলেছেন, তারা আমাদের দাবিদাওয়ার সঙ্গে একমত। কিন্তু এভাবে আন্দোলন না করতে অনুরোধ করেন তিনি।
এদিকে, আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডির বিভিন্ন সিগন্যালে থাকা প্রাইভেট কার, বাস এবং মোটরসাইকেল চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইউনিফর্ম এবং ইউনিফর্ম ছাড়া প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেয়। তারা যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে সড়ক থেকে সরিয়ে দেই।

তবে শিক্ষার্থীরা বলেছে, তারা কোনো ধরনের ভাঙচুর করার জন্য সড়কে নামেনি। ২০১৮ সালের আন্দোলনের সময় ৯ দফা দাবি তুলেছিল তারা। সরকার বলেছিল, দাবিগুলো মানা হয়েছে। কিন্তু একটি দফাও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এবার ৯ দফা মানা না হলে আগামী মঙ্গলবার থেকে আরও কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি হচ্ছে- নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈমসহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সব শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক জীবনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সব যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকাসহ সারাদেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে শিক্ষার্থীদের হাফ পাস নিশ্চিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। বৈধ-অবৈধ যানবাহন চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈধতার আওতায় আনতে হবে এবং বিআরটিএ’র সব কার্যক্রমে নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকাসহ সারাদেশে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রত্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অবিলম্বে স্বয়ংক্রিয় আধুনিকায়ন এবং পরিকল্পিত নগরায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে। গণপরিবহনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও সহিংসতা বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিকল্পিত বাস স্টপেজ ও পার্কিং স্পেস নির্মাণ এবং এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, একই দাবিতে গতকাল লক্ষীবাজার এলাকায় কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। এতে ওই এলাকার সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের সদরঘাটগামী বাসের চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করতে দেখা যায়।
জানা যায়, গতকাল বেলা ১১টায় পুরান ঢাকার লক্ষীবাজার থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রায় সাহেব বাজার মোড় ব্লক করে স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেন, সরকারের কাছে আমাদের দাবি আমাদের জন্য হাফ পাস নিশ্চিত করতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের লাঞ্চিত করা হয়, আমাদের দেখলে বাসের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, এগুলো বন্ধ করতে হবে। শুধু বিআরটিসি বাসে হাফ ভাড়া দেওয়া হয়েছে এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি। সদরঘাটে বিআরটিসির কোনো বাস আসে না। তাই উন্নত দেশগুলোর মতো সব ধরনের বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা ও নটরডেম কলেজ ছাত্র নাঈমসহ সড়কে শিক্ষার্থী মৃত্যুর দ্রুত বিচারের দাবি জানান।

একই দাবিতে যাত্রাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ ও যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান নিহত হওয়ার ঘটনায় সঠিক বিচার এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে যাত্রাবাড়ী মোড়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা যখন সড়ক অবরোধ করে তখন যাত্রাবাড়ী থানা-পুলিশের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আশপাশের থাকা সাধারণ মানুষদের সরিয়ে দেন পুলিশ সদস্যরা।
এদিকে, গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যদের সম্মাননা অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, শিক্ষার্থীদের কম ভাড়ায় চলাচল নিশ্চিত করা উচিত। এ নিয়ে পরিবহনমালিকদের সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর একটি সমঝোতা হয়েছে। তিনি এ নিয়ে একটি ঘোষণা দেবেন।

হাফ ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে রয়েছেন, এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সড়কমন্ত্রীর সঙ্গে পরিবহনমালিকদের একটা বোধ হয় সমঝোতা হয়েছে। ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ওনার মুখ থেকে শোনাই ভালো। বাংলাদেশে অতীতে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া চালুর প্রসঙ্গে টেনে আসাদুজ্জামান খান বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরাও এ রকম অর্ধেক ভাড়ায় চলেছি। ছোটবেলায় আমরাও হাফ ভাড়ায় চলেছি।

হাফ ভাড়ার দাবিতে রাজপথে ছাত্রদের দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি কম ভাড়ায় তাদের চলাচল নিশ্চিত করা উচিত। ছোটবেলায় আমরাও স্বল্প ভাড়ায় চলেছি। এরাও চলত। হঠাৎ করে কেন বন্ধ হলো আমার জানা নেই।
আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি সুরাহার প্রসঙ্গ টেনে আসাদুজ্জামান খান বলেন, তাদরে বলব তাদের দাবিদাওয়া আলোচনার মাধ্যমে শেষ হবে। তারা কষ্ট করে খামাখা গাড়ি অবরোধ বা ভাঙচুর যেন না করে। আমি আরও বলব সড়ক অবরোধ হলে নানা ক্ষতি হয়। সামনে সরকার তাদের দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। আমার মনে হয় সড়ক পরিবহনমন্ত্রী একটা ঘোষণা দেবেন।

অপরদিকে, শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করতে আইন করার দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। সব ধরনের গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া প্রচলন করতে সংসদে আইন পাস করার দাবি করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। এ সময় তিনি হাফ ভাড়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেন। গতকাল মহাসড়ক বিল, ২০২১ এর সংশোধনীর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন। অবশ্য তার বক্তব্যে জবাব দিতে গিয়ে হাফ ভাড়ার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরলেও আইন করার বিষয়ে কিছু বলেননি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের

মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিআরটিসি বাসে হাফ ভাড়া চালু করা হয়েছে। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এটা সারাদেশেই বিআরটিসি বাসের জন্য চালু হবে। তিনি বলেন, বেসরকারি যে গণপরিবহন রয়েছে, তাদের ওপর আমরা জোর করে চাপিয়ে দিতে পারি না। তারা তো সরকারের অধীনে না। সরকারের সঙ্গে হয়তো কাজ করে। বেসরকারি গণপরিবহনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাদের নেওয়া দরকার। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় তাদের অনুরোধ করা হয়েছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকেও তাদের অনুরোধ করা হয়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন