শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ০৪ ভাদ্র ১৪২৯, ২০ মুহাররম ১৪৪৪

সম্পাদকীয়

দেশে বিভিন্ন খাতে বহু সফল উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে

আবুল কাসেম হায়দার | প্রকাশের সময় : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ১২:২৯ এএম

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস নিয়ে তেমন বড় আকারে কেউ গবেষণা করেনি। দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণি সৃষ্টির ইতিকথা নিয়েও তেমন কোনো চর্চা হয়নি। বৃটিশ-পাকিস্তান আমল থেকে এই অঞ্চলে শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টির একটি বিশেষ ধারা কাজ করে। রুশ অর্থনীতিবিদ এসএস বারানভ ষাটের দশকে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান এলাকার উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। সেখানে তিনি ১৯৬৯-৭০ সালের বাঙালি ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে ১৬ পরিবারের নাম উল্লেখ করেছিলেন। আশির দশকে ‘বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ ও অভ্যন্তরীণ অসংগতি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাদ, ১৯৬০ এর দশকে যার উদ্ভব, কোনোক্রমেই ব্যক্তিপুঁজির স্বাভাবিক বিকাশের ফসল নয়।’

কীভাবে উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ: নানাভাবে আমাদের দেশে উদ্যোক্তা শ্রেণির জন্ম। দরিদ্র থেকে ব্যবসা শুরু করে বড় শিল্পপতি হয়েছেন। শূন্য থেকে ধনী শ্রেণির জন্ম আমাদের দেশে। অবাক করার মতো ঘটনাও রয়েছে, আমাদের ধনী শ্রেণির জন্ম নিয়ে।

আশির দশকে রেহমান সোবহান লিখেছিলেন, ‘বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণিটি একটি সজীব বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনিÑ যেমনটি গড়ে ওঠে খুদে ব্যবসায়ী থেকে বৃহৎ ব্যবসায়ী এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি।’ তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কঠোর পরিশ্রম করে, ছোট থেকে বড় শিল্পপতি হয়েছেন, এমন বেশ কিছু উদাহরণ আছে। এদের বড় অংশই এক সময় খুব ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন, ব্যবসা থেকে আস্তে আস্তে পুঁজি বাড়িয়ে কঠোর পরিশ্রম করে উৎপাদনখাতে এসেছেন।

১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান আমলে বাঙালি ব্যবসায়ী ছিল না বললে চলে। ইতিহাসে দেখা যায়, প্রথম বাঙালি ব্যবসায়ী ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। একে খান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম খান চট্টগ্রামের এক সওদাগর পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। পরে শ্বশুরের অর্থে ব্যবসা করে বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। আর ইসলাম গ্রুপের জহুরুল ইসলাম সামান্য কেরানীর চাকরি করতেন। চাকরি ছেড়ে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনাবলে তিনি বড় ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। রিয়েল অ্যাস্টেট ব্যবসার প্রতীক হিসেবে তিনি বাংলাদেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। সর্বশেষ বাজিতপুরে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করে গিয়েছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালেরও আগে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজউদ্দিন কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে জীবনের প্রথম সময় কমলালেবু বিক্রি করে জীবন কাটাতেন। ধীরে ধীরে হকারী করে মূলধন সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর মূলধন সংগ্রহ করে শিল্পব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। তাই আজকের আকিজ গ্রুপ, বৃহৎ শিল্প গ্রুপ। নিজের একান্ত চেষ্টা, পরিশ্রম তাকে জীবনের সফলতা এনে দিয়েছে।

আমাদের দেশের আরেক শিল্পগ্রুপ মেঘনা গ্রুপের উত্থান অতি ক্ষুদ্র থেকে। মোস্তফা কামাল ব্যবসা শুরু করেন রাস্তার পাশে টং দোকান থেকে। ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টায় আজ মেঘনা গ্রুপ। চট্টগ্রাম জেলার আরেক শিল্প উদ্যোক্তা আবুল খায়ের। তিনি জীবনের প্রথম ব্যবসা শুরু করেন মুদি দোকান দিয়ে। আজ দেশের বৃহৎতম শিল্প গ্রুপ। কোন সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত আবুল খায়ের শিল্প গ্রুপ।

‘মালা শাড়ী’ আমাদের সকলের নিকট খুবই পরিচিত। আনোয়ার হোসেন লেখাপড়া বেশি করতে পারেন নাই। মাত্র ১২ বছর বয়সে সংসার চালাতে গিয়ে ১৫ টাকা বেতনে দোকানে চাকরি করতেন। এই ১৫ টাকা বেতনে দোকানে চাকরি করা মানুষটি দেশের বড় শিল্প গ্রুপের মালিক হয়েছিলেন। ব্যাংক, বীমা, শিল্প সকল খাতে তার রয়েছে সফল বিনিয়োগ।

আমাদের সকলের সামনে বেড়ে উঠা ওয়ালটন গ্রুপ, একটি জেলা শহরে ঢেউ টিনের দোকান দিয়ে যার শুরু। এসএম নজরুল ইসলাম ‘ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট’ ওয়ালটন এর প্রতিষ্ঠাতা। আজ দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপের মালিক। দিন দিন সমৃদ্ধি তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মেধা, চেষ্টা, পরিশ্রমে ‘ওয়ালটন গ্রুপ’ সকলের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয়।

বাংলাদেশের আরেকটি সফল শিল্প গোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপ। স্যামসন এইচ চৌধুরী এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। জীবনের শুরুতে ঔষধের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু। তাও চারজন বন্ধু মিলে শুরু করেন। সফলতার শেষ পর্যায়ে স্যামসন এইচ চৌধুরী ও তার পরিবারকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। বাকী তিন বন্ধুর খোঁজ পাই নাই। তবে তিনি সফল শিল্প উদ্যোক্তা।


ব্যাংক ঋণনির্ভর শিল্প উদ্যোক্তা : ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন। শিল্পও স্থাপন করেন। সফলতাও দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ইস্টার্ন গ্রুপের জহুরুল ইসলাম ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিয়ে শিল্প গড়ে তোলেন। দুই ভাই মিলে পারিবারিক ব্যবসা তাদের। তার মৃত্যুর পর ব্যবসা আলাদা হয়েছে।

প্রাণ আরএফএল গ্রুপ দেশের বর্তমান সময়ের একটি সফল শিল্পগ্রুপ। প্রচুর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে এখনও ব্যবসা করছে। তবে এখনও ঋণ খেলাপী হয় নাই। সফলতার সূর্য আজও এই গ্রুপকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।

ইউনাইটেড গ্রুপ অবশ্য ব্যাংক ঋণনির্ভর শিল্পগোষ্ঠী নয়। ব্যাংক ঋণ না নিয়ে নগদ অর্থে ভালো ব্যবসা করছে তারা। তবে সব সময় সরকারি দলের সহযোগিতা পেয়ে আসছে। সরকারের আনুকূল্যে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি খাতে ইউনাইটেড গ্রুপের ব্যবসা বেশ জমজমাট।

দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো গ্রুপ। দাপটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছে। সরকারি সহযোগিতা ও আনুকূল্য নিয়ে তাদের ব্যবসার প্রসার বাড়ছে।

তৈরি পোশাকনির্ভর উদ্যোক্তা: বাংলাদেশের সত্যিকার শিল্পবিপ্লব ঘটে তৈরি পোশাক শিল্পখাত দিয়ে। ১৯৭৫ সালের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের উত্থান। যদিও ১৯৭৮ সালে ২৮ জুলাই ফ্রান্সে প্রথম ১০ হাজার শার্ট রপ্তানি করে রিয়াজ গার্মেন্টস। সেই তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রথম উদ্যোক্তা রিয়াজউদ্দিন। কিন্তু রিয়াজউদ্দিন তৈরি পোশাকের প্রথম রপ্তানিকারক হলেও জীবনের শেষ দিকে এসে সফলতা তেমন দেখাতে পারেন নাই। তার মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রজন্ম তার ব্যবসাকে উজ্জ্বল করতে পারেন নাই।

একই সময় দেশে প্রথম শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প স্থাপন করে পথ দেখিয়েছিলেন সাবেক সচিব নুরুল কাদের। ১৯৭৫ সালের পর নুরুল কাদের তখনকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নুরুল ইসলাম মিলে যে দুইটি বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের পথকে সহজ করে দেয়। এই দুইটি উদ্যোগ হচ্ছে বিলম্বে দায় পরিশোধের ব্যাংক টু ব্যাংক এলসি খোলা এবং বিনা শুল্কে কাঁচামাল আমদানি করার বন্ডেড ওয়্যার হাউস সুবিধা। এই দুই সুবিধার কারণে বড় অংকের পুঁজি ছাড়াই তৈরি হয়েছিল হাজার হাজার পোশাক কারখানা, গড়ে উঠেছিল বিপুল সংখ্যক শিল্প উদ্যোক্তা। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরের অলি-গলিতে তৈরি পোশাকশিল্পের স্থাপন ছিল বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লবের শুরু।

যাদের হাত ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান, সবাই যে সফল তা বলা যায় না। অনেকে ব্যবসা থেকে সরে পড়েছেন। অনেকে অন্যখাতে বিনিয়োগে জড়িয়েছেন। ফেনীর মোশাররফ হোসেন তৈরি পোশাক দিয়ে শুরু করলেও পরে জনশক্তি রফতানিতে চলে যান। পরবর্তী সময় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সংসদ সদস্য হন। তিনি বিজিএমই’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

সেনা কর্মকর্তা থেকে অবসরের পর তৈরি পোশাক শিল্পে আসেন ক্যাপ্টেন সিনা। তার প্রতিষ্ঠান সিনা গ্রুপ। বেশ বড় শিল্পগোষ্ঠি গড়ে তোলেন। কাঁচপুরে তার শিল্পনগরী। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছেন। এক সময় তিনিও বিজিএমই’র সভাপতি ছিলেন।

অতি ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে তৈরি পোশাকশিল্পের মাধ্যমে বড় উত্থান ঘটে ইয়ুথ গ্রুপের ১৯৮৪ সাল থেকে। ফিরোজ আলম ও আবুল কাসেম হায়দার এই গ্রুপের এমডি ও চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে এই গ্রুপের একটি অংশ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করে সফলতা অর্জন করে। টেক্সটাইল, জ্বালানি খাতে ইয়ুথ গ্রুপের বড় বিনিয়োগ। আবুল কাসেম হায়দার এক সময় এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিটিএমএ সহ-সভাপতির দায়িত্বপালন করেন। তিনি শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, লিজিং ও সমাজ সেবায়ও অবদান রাখেন।

মোহাম্মদী গ্রুপ নামে আনিসুল হক তৈরি পোশাকশিল্পের সফল উদ্যোক্তা হয়ে পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শেষ জীবনে ঢাকা শহরের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। তিনিও বিজিএমই’র সভাপতি ও এফবিসিসি’র সভাপতি ছিলেন। চট্টগ্রামের প্যাসিফিক গ্রুপ তৈরি পোশাকের বড় উদ্যোক্তা। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন একজন সফল তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা। (চলবে)

লেখক: প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ ,সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন