বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯, ১১ মুহাররম ১৪৪৪

সাহিত্য

ইতিহাসের বিস্ময় পদ্মা সেতু

শাহনূর শহীদ | প্রকাশের সময় : ২৪ জুন, ২০২২, ১২:০৮ এএম

“পদ্মার ঢেউ রে মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা- যারে/পদ্মার ঢেউ রে”
না, এখন আর শূন্য হৃদয় নয়,দুচোখ মোড়া স্বপ্নে বিভোর পদ্মা পাড়ের মানুষের।›পদ্মা সেতু শুধু ইট-বালু-সিমেন্টের তৈরি সেতু নয়,এটি বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক,নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ।›এটা আমার কথা নয়,গত ২১ জুন, মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে-পদ্মা সেতু নিয়ে
সেমিনারে দেশের জ্ঞানীগুণী বক্তারা এসব কথা বলেছেন।›আমরা মাথা নোয়াবার নই,আমাদের দাবিয়ে রাখা যাবে না›।৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর রক্তঝরা সেই ভাসনের পুনরাবৃত্তি যেন ঘটলো স্বপ্নের পদ্মাসেতুর বেলায়ও।
পদ্মা সেতু নিয়ে সংক্ষেপে কিছু তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।১৯৯৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, রাজধানী ও দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-খুলনা মহাসড়কে পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য ৩,৬৪৩.৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৮.১০ মিটার চওড়া
এই সেতুটিকে দেশের সম্ভাব্য দীর্ঘতম সেতু হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে নির্মাণ কাজ শুরু করার এবং ২০০৪ সালের জুনে শেষ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত ব্যয়ের পরিমাণ ২৬৯৩.৫০ কোটি টাকা বিদেশী উৎস থেকে এবং ৭৫০ কোটি টাকা জাতীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
২০০৬-২০০৭ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।২০০৮ -০৯ সালে প্রকল্প প্রস্তুতির সাথে যুক্ত কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয় এবং অন্যান্য দাতারা সেটি অনুসরণ করে। এই ঘটনায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ও সচিব মোশারেফ হোসেন ভূইয়াকে জেলে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে এমন কোনও অভিযোগ প্রমাণ না পাওয়ায় কানাডীয় আদালত মামলাটি বাতিল করে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তীতে আদালতে খন্ডিত হয়।পরে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। এইসিওএম-এর নকশায় পদ্মা নদীর উপর বহুমুখী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ‹পদ্মা বহুমুখী সেতুর› নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ২৮ আগস্টে। সে সময় ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর ব্যয় আরও আট হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ফলে তখন পদ্মা সেতুর ব্যয় দাঁড়ায় সব মিলিয়ে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা।বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বাসেক) ২০১০ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের জন্য প্রাক যোগ্যতা দরপত্র আহবান করে। প্রথম পরিকল্পনা অনুসারে, ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেতুর নির্মাণ কাজ আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল এবং ২০১৩ সালের মধ্যে প্রধান কাজগুলো শেষ হওয়ার কথা। পরিকল্পনা অনুসারে প্রকল্পটি তিনটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করবে- মুন্সীগঞ্জ (মাওয়া পয়েন্ট/উত্তর পাড়), শরীয়তপুর এবং মাদারীপুর (জঞ্জিরা/দক্ষিণ পাড়)। এটির জন্য প্রয়োজনীয় এবং অধিগ্রহণকৃত মোট জমির পরিমাণ ৯১৮ হেক্টর। পদ্মা বহুমুখী সেতুর সম্পূর্ণ নকশা এইসিওএমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ সেতু প্রকল্প যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয়।
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। এ প্যানেল সেতুর নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্প কর্মকর্তা, নকশা পরামর্শক ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ করা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি। বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।
পদ্মা বহুমুখী সেতুর মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট পথের মাধ্যমে বাংলাদেশের কেন্দ্রের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়। এই সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। প্রকল্পটির ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪৪,০০০ বর্গ কিঃমিঃ (১৭,০০০ বর্গ মাইল) বা বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯% অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটিরও অধিক জনগণ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। ফলে প্রকল্পটি দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।সেতুটিতে ভবিষ্যতে রেল, গ্যাস,বৈদ্যুতিক লাইন এবং ফাইবার অপটিক কেবল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে-সেতুটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
একটি কথা না বললে কার্পণ্য হয়ে যাবে।কথায় আছে- ‹বাপকা বেটা,গাছকা গোটা,›না বাপকা বেটা নয়, বাপকা বেটি ‹অর্থাৎ বিশ্ব ব্যাংক যখন দুর্নীতির তকমা তুলে হাত গুটিয়ে নিল,এবং অন্যান্য দাতা গুষ্টি একই পথ অনুসরণ করলো,দেশীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে দেশের মানুষের লালিত স্বপ্ন পদ্মার গভীর জলে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগান্তকারী ঘোষণা পৃথিবীকে অবাক করেছিল।অনেকে উপহাস করতে ছাড়েনি।তারপর করোনার প্রাণঘাতী ধাক্কা,লকডাউন,উইক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতির অবস্থা নাজেহাল,তারপরও পদ্মাসেতুর কাজ থেমে থাকেনি।সেটা কি বিস্ময় নয়?দয়া করে কেউ ভাববেন না আমি সরকারের সাফাই গাইছি।আমি আসলে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সংপৃক্ত নই।যা সত্য তাই তুলে ধরছি।দেশে ভালো কিছু ঘটলে আপ্লুত হয়ে যাই তাই আজকের এ লেখা। পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ নিয়ে অনেক কথা উঠেছে পক্ষে-বিপক্ষে,এটা স্বভাবিক। ভালো কাজের আলোচনা, সমালোচনা না থাকলে এর সঠিক মূল্যায়ন করা যায় না। পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে এবং পদ্মাসেতু বাঙালির জাতীয় প্রেরণাকে নিয়ে গেছে অনেক উচ্চতায়।সাধারণ মানুষের মনে জেগে উঠেছে আত্মবিশ্বাস। আর মানুষের এই বিশ্বাসকে ধরে রাখতে হলে সরকারের উচিত কঠোর হস্তে দেশের অর্থ পাচার ও সকল প্রকার দুর্নীতির বিষদাঁত ভেঙ্গে ফেলা,তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন সফল হবে,সফল হবেই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন