সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

খেলাধুলা

নেপালকে হারিয়ে সাফ সেরা হয়ে ইতিহাস গড়লো মেয়েরা

জাহেদ খোকন | প্রকাশের সময় : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ৭:২৪ পিএম | আপডেট : ১০:৪০ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবার সেরার খেতাব জিতে কৃষ্ণা-মারিয়া-সানজিদা-মনিকাদের বুঁনো উল্লাস। সোমবার কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে।


দক্ষিণ এশিয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে এবার ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০০৩ সালে লাল-সবুজের ছেলেরা এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সেরার খেতাব জিতলেও টানা পাঁচটি আসরে মেয়েদের কাছে ছিল তা অধরা। ষষ্ঠ আসরে এসে জাতিকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি উপহার দিলো সাবিনা খাতুন বাহিনী। প্রথমবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে অপরাজিত শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়লো লাল-সবুজের বাঘিনীরা। সোমবার সন্ধ্যায় কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। প্রথমার্ধে লাল-সবুজরা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। বিজয়ী দলের হয়ে তারকা ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকার দু’টি এবং বদলি ফরোয়ার্ড শামসুন্নাহার জুনিয়র একটি গোল করেন। নেপালের পক্ষে এক গোল শোধ দেন ফরোয়ার্ড আনিতা বাসনেত।
সাফের পাঁচবারে চ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী ভারতকে গ্রুপ পর্বে হারানোর পরই দেশের ফুটবলবোদ্ধারা ধরেই নিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নের অঘোষিত মুকুটটি এবার বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের মাথায় উঠছে। বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। তা সফলভাবে শেষ করতে বাংলার বাঘিনীদের সামনে সর্বশেষ বাধা ছিল স্বাগতিক নেপাল। যাদেরকে এর আগে সাফে হারাতেই পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু ফাইনাল পর্যন্ত আসতে চার ম্যাচে যে বাংলাদেশ ২০টি গোল করেছে, ফাইনালে তাদের সামনে কারা প্রতিপক্ষ তা যেন কোনো বিষয়ই ছিল না। যদিও ফাইনালের আগে কোনো গোলই হজম করেনি বাংলাদেশ ও নেপাল। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে এসে শক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন বাংলাদেশের মেয়েরাই। পুরো ম্যাচে নজরকারা ও উপভোগ্য ফুটবল উপহার দিয়েছে দুই দলই। কিন্তু গোলের খেলায় সাবিনাদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি নেপাল। তাই তো শেষ পর্যন্ত তিন তিনবার নেপালের জালে বল পাঠিয়েছেন কৃষ্ণা রানী সরকার ও শামসুন্নাহার জুনিয়ররা। বিপরীতে নেপাল একবারই পরাস্ত করতে পেরেছে বাংলাদেশ দলের গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী রুপনা চাকমাকে। আর এটিই ছিল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের জালে প্রথম গোল!
সোমবার বিকেল সোয়া ৫টায় ফাইনাল শুরুর আগে পুরো দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়াম স্বাগতিক দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ম্যাচের পুরো সময় জুড়েই নেপালের সমর্থরা ‘নেপাল’ ‘নেপাল বলে চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু কোনো চিৎকারই দমাতে পারেনি বাংলার বাঘিনীদের। স্বাগতিক দর্শকদের চিৎকার উপেক্ষা করে তারা ম্যাচের শুরু থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে নোপলীদের উপর। আক্রমণের পর আক্রমণ করে নেপালের রক্ষণদূর্গে ভীতি ছড়ায়। ম্যাচের আগে প্রচন্ড বৃষ্ঠি হওয়ায় দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামের মাঠ ছিল কাদায় ছুপছুপ। যে মাঠে উপভোগ্য ফুটবল খেলা কঠিন। পিচ্ছিল মাঠেও দারুণ ফুটবল খেলে সেই কঠিন কাজকেই সহজ করলেন সাবিনারা।
আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ম্যাচের ১৪ মিনিটেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এসময় বদলি ফরোয়ার্ড শামসুন্নাহার জুনিয়র দারুণ গোল করে দলকে এগিয়ে নেন। ব্যাথা পেয়ে ১০ মিনিটে আরেক ফরোয়র্ড সিরাত জাহান স্বপ্না মাঠের বাইরে চলে গেলে তার পরিবর্তে বাংলাদেশ কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন মাঠে নামান শামসুন্নাহারকে। সেই শামসুন্নাহারই হয়ে গেলেন সুপার সাব। ডানপ্রান্ত থেকে ডি-বক্সের ভেতরে মনিকা চাকমার ক্রসের বল পেয়ে চমৎকার কোনাকুনি উঁচু শটে গোল করেন তিনি (১-০)।
পিছিয়ে পরার পর নেপাল ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কিছু সময় তারা বাংলাদেশের রক্ষণভাগে ভীতিও ছড়ায়। ভালো দুটি সুযোগও আদায় করে নেয় স্বাগতিকরা। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে আনিতার ফ্রি-কিক বাংলাদেশ গোলরক্ষক রুপনা চাকমা ডান দিকে ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন। ওই কর্নার থেকেই গোলমুখে জটলা হলে গোল প্রায় হজমই করে ফেলেছিল চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করে দলকে বাঁচান মাসুরা পারভীন। ৪১ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যবধান দ্বিগুণ করে বাংলাদেশ। এসময় নেপালের একটি ভুল পাস থেকে বলে পেয়েছিলেন অধিনায়ক সাবিনা। তিনি একটু ফাঁকায় দাঁড়ানো কৃষ্ণাকে পাস দিলে তা থেকে গোল করতে কোন ভুল করেননি এই তারকা ফরোয়ার্ড। নেপালের জালে বল পাঠিয়ে ডাগআউট সহ সুদূর বাংলাদেশেও আনন্দ ছড়িয়ে দেন কৃষ্ণা রানী সরকার। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধের কিছুটা সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্বাগতিক নেপাল। যার ধারাবাহিকতায় ৭০ মিনিটে একটি গোল পরিশোধ করে তারা। এসময় পাল্টা আক্রমণ থেকে বল পেয়ে আনিতা দারুণ এক শট গোল করেন (১-২)। গোল হজমের পর যেন জ্বলে ওঠে বাঘিনীরা। তারা ২-১ ব্যবধানকে নিরাপদ মনে করেনি। তাই ব্যবধান বাড়াতে প্রতিপক্ষের সীমানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লাল-সবুজের মেয়েরা। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ম্যাচের ৭৭ মিনিটে তৃতীয় গোলের দেখা পায় বাংলাদেশ। এসময় মাঝমাঠ থেকে পাওয়া থ্রুতে কৃষ্ণা রানী সরকার বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে চমৎকার শটে নিজের দ্বিতীয় ও দেশের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন (৩-১)। কৃষ্ণার এই গোলে কোচ ছোটনের কপাল থেকে চিন্তার ভাঁজ একেবারেই মুছে যায়। ম্যাচের বাকি সময় গোল শোধের জন্য মরিয়া হয়ে লড়লেও বাংলাদেশের ফুটবলারদের প্রতিরোধের মুখে সফলতা পায়নি নেপাল। ফলে শেষ পর্যন্ত হারের গ্লানি নিয়েই মাঠ ছাড়ে স্বাগতিকরা। আর প্রথমবারের মতো সাফ শিরোপা জেতার আনন্দে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠেন সাবিনা-কৃষ্ণা-মারিয়া মান্ডা-আঁখি খাতুনরা।
নারী সাফের এবারের আসরে দূর্দান্ত ছিল বাংলাদেশ দল। গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত তাদের খেলায় দেখা গেছে মুন্সিয়ানার ছাপ। ‘এ’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ মালদ্বীপকে ৩-০ গোলে হারিয়ে পরের ম্যাচে পাকিস্তানকে ৬-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয়। শেষ ম্যাচে সাবিনারা সাফের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী ভারতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়েই সেমিফাইনালে পা রাখে। শেষ চারের প্রথম ম্যাচে ভুটানকে ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত করে দ্বিতীয়বারের মতো টুর্নামেন্টের ফাইনাল নাম লেখায় বাংলাদেশ। আর ফাইনালে হিমালয় কন্যাদের ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবার সাফ শিরোপা ঘরে তোলে লাল-সবুজরা।

 

বাংলাদেশ একাদশ
রুপনা চাকমা, সাবিনা খাতুন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার, আঁখি খাতুন, মাসুরা পারভীন, মনিকা চাকমা, সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণা রানী সরকার ও সিরাত জাহান স্বপ্না (শামসুন্নাহার)।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন