ঢাকা, শনিবার ২০ জুলাই ২০১৯, ০৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

শুভ নববর্ষ ১৪২৪

| প্রকাশের সময় : ১৪ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। বিগত বছরের সব চাওয়া-পাওয়া, আশা-নিরাশার গ্লানি পেছনে ফেলে বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জাতির সামনে আরেকটি বছরের আবাহন ঘটল। এখন আমরা বাংলা বর্ষবরণের সাথে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক জীবনের মেলবন্ধনের কথা বললেও বাংলা সনের সাথে বাংলার শাসনব্যবস্থার সংস্কারে মুসলমান শাসকদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহীম লোদির সাথে জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবরের যুদ্ধে বাবরের উন্নততর সমরকৌশল ও কামান-বন্দুকের মত আধুনিক প্রযুক্তির কাছে ইব্রাহীম লোদির বিশাল সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতে দিল্লী সালতানাতের বিলুপ্তি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ঘটে। দিল্লী সালতানাতের অধীনে হিজরী বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা হলেও কৃষিভিত্তিক সমাজ বাস্তবতায় হিজরী বর্ষপঞ্জি ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু অসামঞ্জস্য দেখা দেয়ায় এদেশের বাস্তবতায় একটি ফসলী সনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর হিজরী সনের ভিত্তিতে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। মুঘল রাজদরবারের দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ্উল্লাহ সিরাজী হিজরী সন ও সৌর সনের সমন্বয় করে বাংলাসন চালু করেন। ভারতীয় রাজা হিমু বিক্রমাদিত্য উপাধি গ্রহণ করে ভারতে হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে মুঘলদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর তার শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিক্রমাদিত্যকে পরাজিত করে আকবরের ক্ষমতা গ্রহণের তারিখটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সেই দিনটিকেই বাংলাসন গণনার সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।
ইংরেজ আমলেও খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি বাঙালী সমাজে বাংলাসন ও বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রচলন ও প্রভাব অক্ষুন্ন ছিল। মুঘল আমলে প্রবর্তিত বাংলা বর্ষপুঞ্জিতেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়ার প্রেক্ষাপটে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা বর্ষপঞ্জিতে কিছু সংস্কার আনেন। তার সংস্কার অনুসারে এখন প্রতিবছর ১৪ এপ্রিলে বাংলাদেশে ১লা বৈশাখে বর্ষবরণের উৎসব হয়ে থাকে। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং হাজার বছরের রাজনৈতিক বিবর্তনে বাঙালী সংস্কৃতিতে যে বৈচিত্র্য এসেছে সেখানে সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলা, হিজরী এবং ইংরেজি বর্ষপুঞ্জি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সমভাবে গুরুত্ব বহন করছে। আমাদের ভাষার ঐতিহ্য ও ইতিহাস যেমন স্বকীয় অনুপ্রেরণায় দীপ্যমান, তেমনি আমাদের রয়েছে একটি নিজস্ব ক্যালেন্ডার, যা জাতি হিসেবে আমাদের সমৃদ্ধ ও গর্বিত করেছে। এ কারণেও আমাদের জাতীয় জীবনে বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এখনো আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। আমাদের ঋতুবৈচিত্র্য, খাদ্যসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রভাব স্বমহিমায় বিদ্যমান রয়েছে এবং থাকবে। বিশ্বায়নের যুগে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ক্রমে বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর হয়ে উঠলেও ১লা বৈশাখের সংস্কৃতির গুরুত্ব এবং উৎসবমুখর আবাহন বাড়তি জৌলুস লাভ করেছে।
বাংলা নববর্ষ ইতিমধ্যে সার্বজনীন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে গ্রামীণ জনপদে ১লা বৈশাখ উপলক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতা এবং কৃষকের ঘরে নতুন ফসল উঠার এ সময়ে নববর্ষ উদযাপনে বৈশাখী মেলা হয়ে উঠত সব বয়েসী মানুষের আনন্দ উৎসব ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নতুন উপলক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ১লা বৈশাখ আবাহনে যে সব অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে তা নিয়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঢাকার রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ, চারুকলা থেকে বের হওয়া র‌্যালিতে নানা ধরনের প্রতিকৃতি ও মুখোশের প্রদর্শনী, মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং পান্তা ইলিশের পোশাকি আয়োজন নানা ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মুসলমান শাসকদের হাত ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনা হলেও শতকরা ৯০ভাগ মুসলমানের দেশে বাংলা বর্ষবরণকে বিজাতীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্ম করে ফেলার প্রবণতাকে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ মেনে নিতে পারছেনা। যদিও আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নববর্ষ পালনের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকরা তাদের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখেই নিজেদের বর্ষবরণের উৎসব পালন করবে, এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রত্যাশা। একই বাংলাভাষা এবং একই বাংলা পঞ্জিকার দাবীদার হওয়া সত্তে¡ও রাজনৈতিক মানচিত্রের বিভাজনের পাশাপাশি ইতিমধ্যেই ভাষা এবং ক্যালেন্ডার অনুসরণেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের কিছুটা পার্থক্য তৈরী হয়ে গেছে। এমনকি বাংলা বর্ষবরণও একই দিনে হয়না। ১লা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতির কারণে ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধন বন্ধে সরকারী পদক্ষেপে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। সেই সাথে ঢাকায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ইতিপূর্বে যে সব অপ্রীতিকর ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা গেছে তার পুনরাবৃত্তিও কেউ দেখতে চায়না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও আবেগকে অগ্রাহ্য করে কোন দেশের সার্বজনীন জাতীয় উৎসব হতে পারেনা। সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ উপলক্ষে আমাদের পাঠক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন