রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১, ০৭ মুহাররম ১৪৪৬ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

জনশক্তি রফতানিতে সর্বোচ্চ রেকর্ড

| প্রকাশের সময় : ১ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

চলতি বছর ১২ লাখ কর্মী বিদেশে যাবে-নুরুল ইসলাম বিএসসি
শামসুল ইসলাম : জনশক্তি রফতানিতে ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। জনশক্তি রফতানির এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১২ লক্ষাধিক দক্ষ-আধাদক্ষ কর্মী কর্মসংস্থান লাভ করবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দশ সিন্ডিকেটের দখলের পরিবর্তে সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী প্রেরণের সুযোগ পেলে গত বছর জনশক্তি রফতানির চিত্র আরো ভিন্ন হতো। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকলে ২০১৭ সালে কমপক্ষে আরো দ’ুলাখ কর্মী বেশি কর্মসংস্থান লাভ করতো। অভিজ্ঞ মহল এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। প্রতি বছর ২০-২২ লাখ জনবল শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মক্ষম জনবলের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থান লাভ করছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। গত জুন মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসী কর্মীরা ৫,৭৬৮.৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাংলাদেশের ৪১ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ২০১৭ সালে। এ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান নিয়ে ১০ লাখ ৪ হাজার ১শ’৬৩ জন কর্মী বিদেশ গমন করেছে । এর আগে ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশে চাকুরি লাভ করে। গতকাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় রি-হিয়্যারিং কর্মসূচির আওতায় দেশটিতে ৫ লক্ষাধিক অবৈধ কর্মী বৈধকরণের লক্ষ্যে নিবন্ধিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি দিক নিদের্শনা এবং দক্ষ শ্রম ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টায় বিগত ৯ বছরে ( ২০০৯ জানুয়ারি থেকে গতকাল ৩১ ডিসেম্বর) প্রায় ৫২ লাখ কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশ গমন করেছে। যার মধ্যে ২০১৭ সালেই ১০ লাখ অধিক কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত কর্মী গেছে সউদী আরবে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ (সর্বোচ্চ সংখ্যক), মালয়েশিয়ায় ১ লাখ, ওমানে ৯০ হাজার জন এবং কাতারে ৮২ হাজার জন। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত নারী কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার। যার মধ্যে সউদী আরবে গিয়েছে প্রায় ৮৩ হাজার, জর্ডানে ২০ হাজার এবং ওমানে ৯ হাজার জন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কর্মীদের প্রেরিত রেমিটেন্স-এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার । যার মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ৩শত ৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭ সালে কর্মী প্রেরণে সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। বর্তমান সরকারের ২০১৭ সালে শ্রম ক‚টনৈতিক সাফল্য অনেক বেশি ছিল। তবে দীর্ঘ ৯ বছর বন্ধ থাকার পর দশ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত ১০ এপ্রিল থেকে জি টু জি প্লাস প্রক্রিয়ায় মালয়শিয়ার কর্মী গমন শুরু হয়েছে। মালয়শিয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ হাজার কর্মী গেছে (৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত)। ২০১৬ সালের ১০ আগষ্ট সউদী সরকার বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মী গ্রহণের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ২০১৭ সালে সউদী আরবে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ নারী ও পুরুষ কর্মী গমন করেছে। ২০১৭ মার্চ মাসে আইএম জাপান এর সাথে সমঝোতা স্মারক করে বিএমইটি টেকনিক্যাল ইর্ন্টান কর্মী পাঠাতে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, জাপানের সাথে এমওসি, মরিশাসের সাথে কর্মী প্রেরণ সংক্রান্ত চুক্তি এবং রাশিয়ার সাথেও কর্মী প্রেরণ সংক্রান্ত চুক্তি চ‚ড়ান্ত পর্যায় রয়েছে। এসব চুক্তি অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে যাবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কম্বোডিয়া সফরের সময় সেদেশের সাথে দক্ষতা সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি গতকাল বলেন, ২০১৭ সালে আমি ও অন্যান্য কর্মকর্তাগণ যেসব দেশে সফর করেছি সেখানের শ্রমাজার সম্প্রসারণ ও কর্মীদের প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের ব্যাপারে আলোচনা করেছি। সকল আলোচনাই সফল হয়েছে। শ্রম ক‚টনৈতিকতা প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৮ টি দেশে ১৯ টি নতুন শ্রম কল্যাণ উইং খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই লেবানন ও মরিশাসে দুইটি দেশে শ্রম কল্যাণ উইং চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ২৭ টি দেশের মিশনসমূহে ৩০টি শ্রম কল্যাণ উইং অভিবাসন সমর্থিত ক‚টনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে।
প্রবাসী মন্ত্রী বলেন, এ মন্ত্রণালয়ের বড় সাফল্য হলো রেকর্ড সংখ্যাক বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারা এবং এ বছরেই সর্বোচ্চ সংখ্যাক দক্ষ কর্মী চাকুরি লাভ করেছে। বর্তমানে ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৪৮ টি ট্রেডে দেশের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-র মাধ্যমে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম ই-মনিটরিং ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যে কারণে সব কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের মান পূর্বের তুলনায় অনেক ভাল হয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বও পর্যন্ত বিএমইটি’র আওতায় পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও আইএমটি সমূহে দক্ষতা উন্নয়ন (ডিপ্লোমা-ইন-মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, এসএসসি ভোক, ০২ বছর মেয়াদী সার্টিফিকেট ইন মেরিন ট্রেড ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদী কোর্স), হাউজকিপিং কোর্স ও প্রি-ডিপার্চার প্রশিক্ষণ কোর্সে সর্বমোট ৭ লাখ ৪২ হাজার ৫১৬ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের শুরু দিকে রেমিটেন্স এ কিছুটা কমতি ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনা করে রেমিটেন্স কমার কারণ খুঁজে বের করে তার সমাধান করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়, দেশের প্রতিটি জেলায় জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস এবং বিদেশে শ্রম কল্যাণ উইং এর মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিটেন্স প্রেরণের প্রচারের ফলে এখন রেমিটেন্স প্রেরণে গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন থেকে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ১০.৭ এর আলোকে নিরাপদ, নিয়মিত ও দায়িত্বশীল অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে এ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ঢাকাসহ ২৯টি জেলায় বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের সেবা সহজীকরণের লক্ষ্যে ফিঙ্গার প্রিন্ট কার্যক্রম বিকেন্দ্রীয়করণ করা হয়েছে। ফলে উক্ত ২৯টি জেলার কর্মীদের ফিঙ্গার প্রিন্ট কার্যক্রমের জন্য ঢাকায় আসতে হয় না। নিরাপদ ও স্বচ্ছ অভিবাসন নিশ্চিত করণার্থে জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে মহিলা গৃহকর্মী বাছাই করা হচ্ছে। এই নির্বাচিতগণকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হচ্ছে। বিদেশে কর্মরত নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অভিযোগ দ্রæত নিস্পত্তির জন্য জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-তে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অভিবাসী কর্মীদের বাধ্যতামূলক শতভাগ বীমা পলিসি গ্রহণ কার্যক্রম প্রায় চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এর ব্যবস্থাপনায় প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণার্থে (যে কোন অভিযোগও সমস্যা, সমাধান, তথ্য প্রদান, সুযোগ সুবিধাসহ সার্বিক সহযোগিতা) ডিজিটাল হেল্প ডেস্ক সেবা চালু করা হয়েছে। বায়রার মালয়েশিয়া স্ট্যান্ডিং কমিটি’র সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন পাটওয়ারী বাবুল ইনকিলাবকে বলেন, মালয়েশিয়ার অন্যতম শ্রমবাজার দশ সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে না দিয়ে সকলকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেয়া হলে গত বছর আরো দু’ই লাখ কর্মী বেশি বিদেশে চাকুরি লাভ করতো। তিনি সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন