ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৬ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

ধর্ম দর্শন

আহাদীস ও সুনানে নামাজে পাঞ্জেগানা

এ.কে.এম ফজলুর রহমান মুনশী | প্রকাশের সময় : ১৬ মে, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

(পূর্বে প্রকাশিতের পর)
সকল আম্বিয়ায়ে কেরামের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর যে নির্দিষ্ট মর্তবা এবং বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা হলো তিনি যে শরীয়ত নিয়ে আগমন করেছেন এর আকৃতি-প্রকৃতি শুধু কেবল দৃশ্যমান ও কল্পনা ছিল না এবং তা কোনও প্রকারের অনির্দিষ্ট এবং সংক্ষিপ্তও নয়; বরং তিন আমল ও কর্মকাণ্ডের দ্বারা এর পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ করে দিয়েছেন এবং নিজে তা বাস্তবায়িত করে ও অনুসারী-অনুগামীদের দ্বারা তা কাজে পরিণত করিয়ে এবং এতসংক্রান্ত যাবতীয় দ্বিধা-সন্দেহের মূলোৎপাটন করে দিয়েছেন।
ইসলাম দৈনন্দিন ইবাদতের যে তরীকা পেশ করেছে রাসূলুল্লাহ (সা:) নিজের আমলের মাধ্যমে এর সকল আরকান, আদব ও শর্তাবলী এবং ওয়াক্তসমূহ ও পরিমাণের পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ করে দিয়েছেন এবং এর প্রত্যেক জিনিস সন্দেহমুক্তভাবে কথা ও কাজের অবিচ্ছিন্ন পরিক্রমায় আমাদের নিকট পর্যন্ত পৌঁছেছে। নামাজ কিভাবে পাঠ করা চাই এর মাঝে কি কি দোয়া-কালাম পাঠ করা দরকার, কোন কোন ওয়াক্তে তা আদায় করতে হবে, কোন ওয়াক্তের নামাজ কত রাকাত, এর মাঝে প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা:) মৌখিকভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দান করেছেন। একই সাথে সাহাবীদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। এবং কার্যত : নবুওতের পূর্ণ জিন্দেগীর মাঝে যে হুকুম ও নিয়মতান্ত্রিকতা নামাজের উপর অতিবাহিত হয়েছে এমনকি একদিন দু’দিন নয়, মদীনায় কমসে-কম দশ বছর প্রত্যহ পাঁচবার, সকল মুসলমানের সামনে পরিপূর্ণ আহ্বানের সাথে আদায় করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুরোগে আক্রান্ত হওয়ার সময়ও এর মাঝে ব্যতিক্রম হয়নি এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিয়ম মাফিক এর উপর আমল করা হয়েছে।
মদীনার মসজিদে নবুবী এবং সকল ইসলামী মসজিদসমূহের মাঝে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ঘোষণার আওয়াজ বুলন্দ হয়েছে এবং প্রত্যহ পাঁচবার ইসলামী জাহানের সর্বত্র কালেমার বাণী পাঠ করা হয়ছে এবং এই ফরজ আদায় হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর পর সকল খোলাফায়ে রাশেদীন এবং সকল উন্মতে মুহাম্মাদী যে যেখানে পৌঁছেছে একইভাবে পাঁচবার সফরে ও অবস্থানে সর্বত্র সারা জীবন নামাজ আদায় করেছেন। এমন সুনির্দিষ্ট, খোলাখুলি, অবিচ্ছিন্ন ও সর্বদা প্রচলিত জিনিসের মাঝে কি কাহারো কোন প্রকার সন্দেহ থাকতে পারে? এই সচেতনতা, এই প্রকাশ্য অবিচ্ছিন্নতা, এই উদাত্ত সতর্কতার ব্যবস্থা এজন্য করা হয়েছে, অন্যান্য নবী ও রাসূলগণের পর তাদের অনুসারীরা তাঁদের শরীয়তকে যেভাবে সন্দেহযুক্ত ও অযথার্থ বলে মনে করে এতে সন্দেহ আরোপ করেছে, অনুরূপ বিকৃতি ও সন্দেহ হতে যেন খাতিমুল আম্বিয়া (সা:)-এর শরীয়ত সম্পূর্ণ মাহফুজ ও মুক্ত থাকে। কেননা, যদি এই শরীয়তে সন্দেহ দেখা দেয়, তাহলে দ্বিতীয় কোন নবুওতের ব্যবস্থা নেই যা সংস্কার ও তাজদীদের ব্যবস্থা করতে পারে। সুতরাং এই নিয়মতান্ত্রিকতা ভিত্তিতেই আজ পর্যন্ত সকল উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর এই নামাজ এবং এর প্রয়োজনীয় এবং এতদসংক্রান্ত আরকান, আহকাম ও শর্তাবলী অবিচ্ছিন্ন রেওয়ায়েত দ্বারা মাহফুজ ও কায়েম আছে। নামাজের এই ফরজিয়ত বা আল্লাহর বিধান যার অপরিহার্যতা আল্লাহ তায়ালা ঐ সৌভাগ্য মুহূর্তে প্রদান করেছেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সা:) মি’রাজের চূড়ান্ত সান্নিধ্যের মঞ্চে নীত হয়েছিলেন। হুকুম হলো : রাতে এবং দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তোমার উপর এবং তোমার উম্মতের উপর ফরজ করা হলো, যা পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের বরাবর ফযীলতপূর্ণ। (সহীহ বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ : কিতাবুস সালাত ও কিতাবুল আসরা) কুরআনুল কারীম দ্বারা ও এর যথার্থতা নিরূপিত হয়। এরশাদ হচ্ছে :
অর্থাৎÑযে ব্যক্তি একটি নেকী করবে, তাকে দশগুণ নেকী দেয়া হবে। (সূরা : আনয়াম : রুকু-২০) এজন্য পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ নি:সন্দেহে (৫+১০=৫০) পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সমমান সম্পন্ন। নামাজের ফরজিয়তের পর আল্লাহর ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়ে স্বয়ং নামাজ আদায়ের তরীকা এবং এর পাঁচ ওয়াক্তের শিক্ষাদান করেছেন। এবং এক এক ওয়াক্ত নামাজ আমলীভাবে আদায় করে এর প্রত্যেকটি জিনিস শিক্ষা দিয়েছেন (সহীহ বুখারী ও মুসলিম : আওকাতুস সালাতুল খামস) এবং এই তরীকাই রাসূলুল্লাহ (সা:) স্বীয় অনুসারীদেরকে তালকীন করেছেন এবং এর উপর আমল করিয়েছেন।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা:) ইসলাম পরিব্যাপ্তির সাথে সাথে প্রত্যেক স্থানে আহকামে শরীয়তের তাবলীগ ও ঘোষণার জন্য মুবাল্লিগ মনোনীত করেন। একবার একজন বেদুঈন যে নজদের দূরবর্তী পথ অতিক্রম করে এসেছিল, পবিত্র খেতমতে হাজির হয়ে আরজ করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাসেদ বলেছেন যে দিনে এবং রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ, এটা কি সত্য? ইরশাদ হলো, হ্যাঁ সত্যি। লোকটি আরজ করলো। ঐ সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে পয়গাম্বর করে প্রেরণ করেছেন, প্রকৃতই কি আল্লাহ পাক আপনাকে এ হুকুম দিয়েছেন? এরশাদ করলেন, হাঁ। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
খোদ রাসূলুল্লাহ (সা:) সাহাবীদের বলেছেন, হযরত জিব্রাঈল (আ:) অবতরণ করলেন এবং তিনি আমার ইমামত করলেন। আমি তাঁর সাথে নামাজ পাঠ করলাম। পুনরায় পড়লাম। পুনরায় পড়লাম। পুনরায় পড়লাম। এই কথাগুলো মুখ হতে উচ্চারণ করছিলেন এবং অঙ্গুলী দ্বারা এক, দু’ তিন, চার এবং পাঁচ গুণছিলেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম-একবার তিনি সাহাবীদের খেতাব করে বললেন, যদি কাহারো গৃহের সামনে স্বচ্ছ-সলিলা একটি নদী প্রবাহিত হয় এবং সে এতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তবে কি তার শরীরে কোনরকম ময়লা আবর্জনা থাকবে? সকলেই উত্তর করলেন, না, থাকবে না। এরশাদ হলো, এই উদাহরণই হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের। এর দ্বারা আল্লাহপাক গোনাহসমূহ মিটিয়ে দেন। (সহীহ বুখারী)
নামাজের ওয়াক্তসমূহের নির্দিষ্টকরণ সম্পর্কে বলেছেন, “যখন ফজরের নামাজ পাঠ করবে, তখন ঐ সময় পর্যন্ত পাঠ করবে যেন সূর্যের প্রথম কিরণ বেরিয়ে না আসে। তারপর তারপর যোহরের নামাজ পাঠ করবে, যতক্ষণ না আসরের ওয়াক্ত এসে পড়ে। তারপর আসরের নামাজ পাঠ করবে, তা ঐ সময় পর্যন্ত যে সূর্য লাল হয়ে যায়। তারপর মাগরিবের নামাজ পাঠ করবে, পশ্চিমাকাশের লালিমা শেষ হওয়া পর্যন্ত এর সময়। তারপর এশার নামাজ পাঠ করবে, অর্ধরাত পর্যন্ত এর সময়। (সহীহ মুসলিম)
সাহাবী হযরত আবু বুরজাহ (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ফজরের নামাজে ষাট হতে একশ আয়াত পর্যন্ত কেরাআত পাঠ করতেন এবং যোহরের নামাজ সূর্য ঢলে পড়ার পর আদায় করতেন এবং আসরের নামাজ ঐ সময়ে পাঠ করতেন যে, একজন লোক মদীনার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত গমন করে প্রত্যাবর্তন করত। তখনো সূর্যের প্রাণ বাকী থাকত। মাগরিব সম্পর্কে রাবীর শ্রুত বর্ণনা স্মরণ নেই এবং এশার নামাজ রাতের এক-তৃতীয়াংশে আদায় করতে দ্বিধা করতেন না। (সহীহ বুখারী)
অপর সাহাবী হযরত যাবের (রা:) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) দ্বিপ্রহরে যোহরের নামাজ আদায় করতেন এবং ঐ সময়ে আসরের নামাজ আদায় করতেন, যখন সূর্য বাকী থাকত। সূর্য অস্ত গেলে মাগরিব পড়তেন এবং এশার নামাজ কখনো দেরীতে পাঠ করতেন এবং কখনো তাড়াতাড়ি পাঠ করতেন এবং ফজরে নামাজ অন্ধকারেই আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) যোহর এবং আসরের নামাজের প্রথম দু’রাকায়াতে আস্তে আস্তে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা মিলিয়ে পাঠ করতেন। কখনো কখনো কোন কোন আয়াত শোনাও যেত। মাগরিবে সূরা আল মুরসালাত পড়তেন এবং কখনো সূরা তুর পাঠ করতেন। এশার নামাজে সূরা ইনশাক্কাত এবং তিন পাঠ করতেন। এবং ফজরের নামাজে সূরা তুর পাঠ করতেন। অনুরূপ আরোও অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। শুধু বর্ণনাবলীর উপরই নির্ভরশীল নয়, বরং আজ পর্যন্ত সকল উম্মতে মুহাম্মাদী রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর আমলকে অবিচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করে আছে। এটা দোস্ত এবং দুশমন সকলেরই নিকট অপ্রতিরোধ্য দলিলরূপে বহাল আছে। (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন