ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

সম্পাদকীয়

গার্মেন্ট খাতে অ্যাকর্ডের খড়গ চলছেই

| প্রকাশের সময় : ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০২ এএম

চীন, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশই পশ্চিমা বিশ্বে গার্মেন্টস রফতানি করে থাকে। কোথাও কমপ্লায়েন্সের নামে এমন অ্যাকর্ড বা এলায়েন্সের খবরদারি নেই। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত বিকশিত হলেও আগে কখনো ক্রেতাদের দ্বারা এমন প্রাতিষ্ঠানিক খবরদারির সুযোগ ছিল না। মূলত ২০১৩ সালে সাভারে রানাপ্লাজা ধসে সহস্রাধিক গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে পড়া বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা ইউরোপের ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড এবং আমেরিকার ক্রেতাজোট এলায়েন্সের মাধ্যমে গার্মেন্টস পরিদর্শন ও সার্টিফিকেশনে এক প্রকার সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে অ্যাকর্ড ম্যালায়েন্সের নজরদারির বিরুদ্ধে শুরুতেই বেশিরভাগ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি মালিকদের আপত্তি ছিল। তবে একের পর এক দুর্ঘটনাসহ কর্ম পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিষয়ক অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করতে পারেন নি। তারা ক্রেতাদের প্রস্তাব বা দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কথা ছিল ৫ বছরের মধ্যে এই কনসোর্টিয়াম সবগুলো কারখানা পরিদর্শন করে কম্পায়েন্স তথা নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। চুক্তি অনুসারে ২০১৮ সালের মে মাসেই অ্যাকর্ডের বাংলাদেশে কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ আরো ৬ মাস বর্ধিত করা হয়েছিল। মেয়াদ শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কনসোর্টিয়াম ম্যালায়েন্স বাংলাদেশ ত্যাগ করলেও ইউরোপীয় অ্যাকর্ড নানা ছুতা নাতায় নতুন নতুন বিষয় হাজির করে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের উপর নজরদারি ও হুকুমজারি চালিয়ে যাচ্ছে।

অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কমপ্লায়েন্স পুরণ করতে গিয়ে শত শত কারখানাকে নতুন করে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। কমপ্লায়েন্স পুরণে ব্যর্থ হওয়ায় অ্যার্কড শত শত কারখানার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কমপ্লায়েন্স পুরণ করার পরও নানা অজুহাতে অর্ডার বাতিল, পোশাকের মূল্য কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ, শ্রমিক অসন্তোষ ইত্যাদি কারণে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলেও এ নিয়ে অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যবস্থার উপর বাড়তি শত শত কোটি টাকার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ব্যয়বৃদ্ধি ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হলেও পাশাপাশি পোশাকের মূল্যবৃদ্ধির কোনো উদ্যোগই তারা নেয়নি। অ্যাকর্ড ম্যালায়েন্স ক্রেতাদের পক্ষ হয়ে শ্রমিকের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, মজুরিবৃদ্ধিসহ যাবতীয় কিছু শর্ত পুরণে বাধ্য করলেও পোশাকের ক্রয়মূল্য বৃদ্ধিতে কোনো কার্যকর ভ‚মিকা পালন না করায় অনেক কারখানা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধরনের এক পাক্ষিক নজরদারির ব্যবস্থা বিশ্বের আর কোথাও কোনো সেক্টরে আছে কি না আমাদের তা জানা নেই। চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে উপনীত। এ সুযোগ কাজে লাগাতে উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকদেরকে অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সর নজরদারির সুযোগ বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনেক কারখানা মালিক অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সের খবরদারি মেনে নিতে না পাললেও বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্সসহ মানোন্নয়নে তাদের ভ‚মিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকেও তাদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। তবে ক্রেতাজোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে এমন ব্যতিক্রমী খবরদারির জন্য বিজিএমইএ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোরও দায় আছে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ’র মত পুরো সেক্টরের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে শুধুমাত্র রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করে এসেছে। তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তা, রফতানিকারকদের স্বার্থ এবং পক্রতাদের সাথে দর কষাকষি ও মূল্যবৃদ্ধির জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। রানাপ্লাজা ধসে নিহত এবং আহত হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার এখনো তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপুরণ বা বিচার পায়নি। কোনো কোনো মহল এসব বিষয় নিয়ে এখনো পানি ঘোলা করতে সচেষ্ট আছে। দেশের সব কলকারখানার কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারিদের স্বার্থ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরগুলোর দায়িত্ব। একইভাবে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ দায় এড়াতে পারে না। এসব বিষয়ে তাদের ব্যর্থতার কারণেই বিদেশি ক্রেতাদের কনসোর্টিয়াম একের পর এক নানা শর্ত ও নজরদারির খড়গ তুলে ধরছে। এসব শর্ত পুরণে ব্যর্থতার কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের নজরদারি ইতিমধ্যে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অ্যাকর্ডের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষাপটে শেষ সময়ে এসে সেপ্টেম্বর থেকে তারা দেশের ১৬০০ গার্মেন্টস কারখানায় বয়লার পরিদর্শন শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানা যায়। ইতিপূর্বের কমপ্লায়েন্স রিস্ট্রাকচারিংয়ে কারখানাগুলোকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। অনেক কারখানার ক্ষেত্রেই যা তাদের রফতানি আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন। নতুন করে বয়লার পরিদর্শনের নামে অ্যাকর্ডের সময় বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বয়লারের মান ও নিরপত্তা বিষয়ক বিধি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
MD Zakir Hossain ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ৯:১৫ এএম says : 0
Thank to writer
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন