ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ০১ রজব ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

শ্রমজীবী নারীর মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষা

পারভীন রেজা | প্রকাশের সময় : ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদন খাতগুলোর মধ্যে আশির দশকে রাষ্টীয় মালিকানাধীন পাট, সুতা ও বস্ত্র শিল্পগুলো বন্ধ হওয়ায় একমাত্র পোশাক শিল্প খাত ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে বেশিরভাগ শ্রমিকই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: গার্মেন্টস, ইপিজেড, চিংড়ি খাত, বিড়ি কারখানা, চা শিল্প, ধান প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, ইট ভাটা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, ক্ষুদ্র্র ব্যবসায় নিয়োজিত শ্রমিক ইত্যাদি। এসব শিল্পের শ্রমশক্তির অর্ধেকই নারী। এছাড়া এই দুই খাতের বাইরেও রয়েছে কৃষি শ্রমিক ও গৃহ শ্রমিক। এসকল ক্ষেত্রে আর্ন্তজাতিক শ্রমের মানদÐ অনুযায়ী নারী শ্রমিকের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী নারী পুরুষের মধ্যে কোনো মজুরীর বৈষম্য নেই। কিন্তু কর্মরত নারী শ্রমিকরা ব্যাপকভাবে মজুরী বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। মজুরী বৈষম্যসহ ছুটিহীন, অস্বাস্থ্যকর কর্ম পরিবেশ এবং চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা মধ্যে এসব নারী শ্রমিকরা কাজ করে থাকে। সাধারণত নারী শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া তারা শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্যান্য নাগরিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধাও পায় না। ফলে তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। এইসব অমানবিক জীবনযাপনের মধ্য দিয়েও বিভিন্ন শিল্পের নারী শ্রমিকরা তাদের শ্রমের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতির ভিত শক্ত করার েেত্র সক্রিয় ভ‚মিকা রেখে আসছে।

পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক: বাংলাদেশে পোষাক রপ্তানি খাতে অধিংকাশই মহিলা ও শিশু এবং সকলেই দরিদ্রসীমার নীচে বাস করে। এই শিল্প প্রসারের ফলে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পায়। এ শিল্পে বর্তমানে কাজ করে প্রায় ৯০ ভাগ নারী শ্রমিক। কিন্তু এই খাতে শ্রমিকদের সর্বাধিক অবদান থাকলেও তারা তাদের নূন্যতম আইনগত অধিকারসহ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যেমন- ন্যায্য মজুরী, সময় মত মজুরী পাওনা, কাজের সময়কাল, ছুটি, ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ সকল আইনগত অধিকার। তারা যেখানে কাজ করে সেখানে তাদের যে সকল অধিকার আইনে স্বীকৃত এবং সেগুলি লঙ্ঘিত হলে কি পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে সম্পর্কে তারা সচেতন নয়। তাই বিভিন্ন ধরনের কারখানায় দিনের পর দিন তাদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে। নারী শ্রমিকদের শতকরা ৮০ ভাগ গার্মেন্টস কারখানায় যে সমস্যাগুলো বিরাজমান তা হলো- আইন অনুযায়ী সঠিক সময়ে নারী শ্রমিকদের মজুরী পরিশোধ না করা ও মজুরী বৈষম্য করা, শ্রমিকদের মজুরীর সাথে বাসস্থান, পরিবহন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকা, আইন অনুযায়ী বেতনসহ সাপ্তাহিক ছুটি প্রদান না করা, বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ না করা, শ্রমিকদের বাধ্যতামূলকভাবে ওভারটাইম করানো, কর্মক্ষেত্রে পর পর তিন দিন ৫-১০ মিনিট দেরী হলে এক দিনের মজুরী কাটা, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে ছাঁটাই করা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ অন্যান্য ছুটির সুযোগ না থাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন করতে না দেওয়া, মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা থকলেও বাস্তবে অধিকাংশ গার্মেন্টস-এ প্রয়োগ না করা, আইনে থাকলেও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো শিশুপরিচর্যা কেন্দ্রের ব্যবস্থা না থাকা, আগুন লাগাসহ অন্যান্য দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থার পর্যাপ্ত অভাব, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা না থাকা, কাজের সময়কাল, ছুটি, ক্ষতিপুরণ, স্বাস্থ্য সুরাসহ সকল আইনগত ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি। এভাবে সর্বনি¤œœ মজুরীতে নারী শ্রমিকদের কাজের বিনিময়ে দেশের পোষাক শিল্পের মালিকগণ যেমন লাভবান হচ্ছে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ এই খাত থেকেই আয় হচ্ছে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা।

কৃষি কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক: ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও ভ‚মিহীন হওয়ার কারণে নারীকে সামান্য মজুরীর বিনিময়ে কৃষিতে কাজ করতে বাধ্য করে। প্রযুক্তির ব্যবহার সাধারণত পুরুষের হাতেই থাকে। যদিও আইনে কৃষি কাজে নিয়েজিত নারী শ্রমিকদের ‘কৃষি শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে বহিভর্‚ত করেনি তবে স্বনিয়োজিত নারী শ্রমিকদের এই সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেনি। সাধারনত কৃষিকাজে নিয়োজিত এ সকল নারী শ্রমিকদের শুধুমাত্র সহায়তাকারী হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। কৃষিকাজে নিয়োজিত এসকল নারী শ্রমিকদের সাধারণত জমির উপর কোনো মালিকানা নেই, তাদের ঋণ পাবার, উন্নত প্রযুক্তি ও সেবা পাবার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন রাইস মিলগুলোতে অসংখ্য শ্রমিক কাজ করে, এর মধ্যে অনেক নারী শ্রমিক রয়েছে। বর্তমানে আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে মিলগুলিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের বিরাজমান সমস্যাগুলো হচ্ছে- রাইসমিলগুলোতে কাজের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নাই, নারী শ্রমিকদেরকে দৈনিক গড়ে ১৫/১৬ ঘন্টা কাজ করতে হয়, কাজের পরিবেশ পরিস্কার-পরিছন্ন থাকে না, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করার ফলে শ্রমিকরা প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ে, রাইসমিলগুলোতে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত ন্যায্য মজুরী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, মজুরী বৈষম্যের কারণে নারী শ্রমিকদেরকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে অধিক কষ্টদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে থাকে, বয়লার বিস্ফোরন ঘটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে ইত্যাদি। অথচ ১৯৪৮ সালের মানবাধিকার সনদের ২৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রত্যেকেরই বিশ্রাম ও অবসর বিনোদনের অধিকার রয়েছে। কাজের সময় যুক্তিসংগত সীমা ও বেতনসহ নৈমিত্তিক ছুটি ও অধিকারের অন্তর্ভূক্ত। এবং জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধীকার ঘোষণা পত্রে আছে, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা সহ সমান পারিশ্রমিক একই মানের কাজের ক্ষেত্রে একই আচরণ, সেই সাথে কাজের মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবাই সমান আচরণের অধিকারী।

নারী গৃহশ্রমিক: বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ গৃহকর্মী হিসেবে দেশে-বিদেশে বাসাবাড়ীর কাজে নিয়োজিত রয়েছে যাদের বেশিরভাগই হছে নারী ও শিশু। তবে নিবন্ধন না থাকায় তাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। গৃহকর্মের সঙ্গে যুক্তদের সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পেলেও তাদের মজুরি নির্ধারণ ও অন্যান্য অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ এবং আইনী কোন ব্যবস্থা বিদ্যমান নেই। ফলে বিপুল সংখ্যক এ শ্রম জনগোষ্ঠীর শ্রমিক হিসেবে কোন স্বীকৃতি নেই। শ্রমজীবী মানুষের আইনী সুরক্ষা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ বলবৎ রয়েছে। কিন্তু এ আইনে গৃহশ্রম এবং গৃহকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এসব শ্রমিকরা সব ধরণের শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে প্রতি বছর গৃহশ্রমিক নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে তারা কর্মক্ষেত্রে মারা যাচ্ছে। এ ধরণের ঘটনার কোনো আইনগত প্রতিকারও হয় না। আশার কথা, সরকার গৃহশ্রমে নিযুক্ত এ বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরার জন্য গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১০ প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালা গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের নিবন্ধন, কাজের শর্ত ও নিরাপত্তা, শোভন কর্মপরিবেশ, মজুরী ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, নিয়োগকারী ও গৃহকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক রাখা এবং কোন অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা নিরসনে দিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। যত দ্রæত সম্ভব এ নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

নারী শ্রমিকদের জন্য আইন ও ব্যবস্থাপনা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অনুচ্ছেদ ১৪, ১৫, এবং ২০(১)-এ শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মেহনতি মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিককে জনগনের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হতে মুক্তি গ্রহণ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে।’ কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এর তেমন প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাই না। উপরন্তু নারী শ্রমিকের প্রতি নির্যাতন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণের নিশ্চয়তা সহ কর্মের গুণ ও মান বিবেচনা করে মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হলেও প্রায় সকল ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক মৌলিক অধিকার বঞ্চিত মজুরী বৈষম্যের শিকার এবং নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করে থাকে। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কর্ম হচ্ছে কর্মম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়, এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’-এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন। এছাড়া সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারে শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বিশেষ অনুচ্ছেদ হচ্ছে ৩৪ ও ৩৮। ৩৪ অনুচ্ছেদটি শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকবচ। এ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সকল প্রকার জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধ। ৩৮ অনুচ্ছেদে জনশৃংঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সালে ২৭টি পৃথক আইনকে সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’ প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬ এবং গৃহ শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১০ প্রণয়ণ করা হয়েছে। চা শ্রমিকদের জন্য বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর পাশাপাশি বাংলাদেশ চা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৬ প্রচলিত আছে।

আর্ন্তজাতিক শ্রম মান, অন্যান্য সনদ ও নারী শ্রমিক: ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রণীত সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিল’ প্রস্তুতির উম্মেষ ঘটে; ১৯৬৬ সালে আরো তিনটি আন্তর্জাতিক দলিল প্রণীত হয়। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় অন্যান্য মানবাধিকারের সাথে নিজের দেশে সরকারি চাকুরীতে সমান প্রবেশাধিকারসহ কাজের অধিকার, সমপরিমাণ কাজের জন্য সমপরিমাণ মজুরীর অধিকার, বিশ্রাম ও অবসর এইসব অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে; ১৯৬৬ সালে গৃহীত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তির মধ্যেও জবরদস্তিমূলক শ্রম থেকে মুক্তি এবং সরকারি চাকুরীতে সমতার ভিত্তিতে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে অধিকার ভোগ করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে; ১৯৬৬ সালে গৃহীত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির মধ্যে কাজ করার অধিকার, কাজের জন্য সঠিক ও সুবিধাজনক অবস্থা ভোগের অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও তাতে যোগদানের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, সামাজিক বীমা প্রভৃতি ভোগ ও সংরক্ষণের অধিকার, যথাযথ জীবন যাত্রার মান রার অধিকার, সর্বোচ্চ অর্জন দ্বারা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মানরার অধিকারসহ শ্রমিক শ্রেণীর বেশ কিছু অধিকারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে; আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রতিষ্ঠিত হবার পর প্রথম ১৯১৯ সালে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য কিছু আন্তর্জাতিক নীতিমালা গৃহীত হয়। এই নীতিমালাসমূহে নারীকে রাত্রিকালীন কাজ কষ্টসাধ্য শারীরিক কাজ, মাইন খনিতে কাজ ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে। একই সাথে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা রাত্রিকালে দীর্ঘ সময় কাজ করে নারীদের বেশি উপার্জন ও বিপজ্জনক কাজ, যার ক্ষতিপূরণ বেশি অঙ্কের, সে সকল কাজ নারীদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়; আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক গৃহীত কনভেনশনসমূহের বেশ কিছু বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করেছে। বাংলাদেশ শ্রম আইনের আওতায় এ সকল কনভেনশনের আলোকে বিভিন্ন আইন, বিধি-মালা প্রনয়ণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও রক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারী যেন বৈষম্যের শিকার না হয় তার বিধি-বিধানও করা হয়েছে। আইএলও’র সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইএলও সনদ, আন্তর্জাতিক শ্রম মানসমূহ এবং ঘোষণাসমূহের প্রতি সম্মান দেখাতে অঙ্গীকারবদ্ধ; ১৯৯৫-এর সেপ্টেম্বরে বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ আয়োজিত চতুর্থ বিশ্বনারী সম্মেলনের গৃহীত প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশন- এর ১৬৭ ধারায় কর্মে নিয়োগের সুযোগ, উপযুক্ত কাজের পরিবেশ এবং ভ‚মি, মূলধন ও প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণসহ নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেবার কথা বলা হয়েছে। প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশন- এর ১৮০ ধারায় কর্মক্ষেত্রে পেশাগত পৃথকীকরণ ও বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারের নিয়োগকারী, ট্রেড ইউনিয়ন ও নারী সংগঠনসমূহের করণীয় বিষয়ে বলা হয়েছে।

নারী শ্রমিকদের বৈষম্য প্রতিরোধে কতিপয় প্রস্তাবনা: এক. দেশের সংবিধান ও স্বীকৃত আর্ন্তজাতিক সনদসম‚হ অনুসরণপ‚র্বক কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান অংশীদারীত্ব, সমান সুযোগ, সমমর্যাদা এবং সমআচরণ নিশ্চিত করতে হবে। দুই. নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, দারিদ্র দ‚রীকরণ, শ্রমবাজারে নারীর অধিক অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদানের প্রেক্ষিতে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি যে কোনো ধরণের বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। তিন. নারীর জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং নারীবান্ধব কর্মত্রে সৃষ্টি ও মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চার. শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনকে সক্রিয় করা এবং উক্ত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শ্রমিকের জীবনমান বিশেষ করে শ্রমিকের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও তাদের সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ। পাঁচ. শ্রমঘন এলাকায় শ্রমিকের জন্য সরকারি হাসপাতাল ও দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করা। ছয়. প্রতিটি শিল্প কারখানায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাসহ মাতৃত্বকালীন চিকিৎসাসেবা ও শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সাত. নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিবেচনা করা ও সে লক্ষ্যে সকল প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী-অস্থায়ী সকল ধরনের নারী শ্রমিকের জন্য বেতনসহ প্রসূতিকালীন ছুটি ও ছুটি শেষে চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান করা। আট. সকল প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুইটি ও অবসরকালীন ভাতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। নয়. দুর্ঘটনায় আহত বা পেশাগত অসুস্থতায় কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য আইন ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণ। দশ. নিরাপদ কর্মক্ষেত্র শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে একটি পৃথক নীতিমালা তৈরী করতে হবে এবং উক্ত নীতিমালার আলোকে শ্রম আইনের সংশোধন, বাস্তবায়ন, পরিবর্ধন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এগারো. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বার. রাত আটটার পর নারী শ্রমিকদের দিয়ে কারখানার কাজ না করানো। তের. আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নূন্যতম মজুরী প্রতিটি কারখানায় বাস্তবায়ন করা। চৌদ্দ: মাস শেষে সময়মত মজুরী ও ওভারটাইমের টাকা পরিশোধ করা। পনের. শ্রমিকদের নিয়োগ পত্র প্রদান করা এবং চাকুরী চ‚্যতির সময় দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের বিধান সমূহ অনুসরণ করা। ষোল. সুষ্ঠু ও সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা। সতের. নারী ও পুরুষ ভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা। আঠার. মহিলা শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানো। উনিশ. নারী ও পুরুষের জন্য সমান সুযোগের নীতি উন্নয়নে নিয়োগকর্তার আচরণ, ভুমিকা, জবাবদিহিতা ও অন্যান্য বিষয়ের জন্য সরকারের ভ‚মিকা শক্তিশালী করা। বিশ. নারী শ্রমিকের সব রকম বৈষম্য থেকে রা করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, সুনির্দিষ্ট ও রামূলক কাজের শর্তাবলী আইনে থাকলেই হবে না, তা বাস্তবায়িত করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কনভেনশনের আলোকে নারী শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে যে আইনসমূহ প্রণীত হয়েছে, সেগুলোকে বাস্তবে প্রতিফলিত করতে হবে এবং সে সাথে বর্তমান সময়ের আলোকে নারী শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য একদিকে সরকারকে যেমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে তেমনি নিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে নারী শ্রমিকের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা প্রবৃদ্ধির জন্য।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন