ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭, ২১ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

হাম-রুবেলা থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হবে

আতিক সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ১৬ মার্চ, ২০২০, ১২:০১ এএম

১৮ মার্চ শুরু হচ্ছে ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের কম বয়সি দেশের সকল শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন। ভাইরাসজনিত একটি মারাত্মক রোগের নাম হাম। এটি একটি জটিল সংক্রামণ রোগ। আক্রান্ত রোগীর হাঁচি, কাশির মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ কেবল যে শিশুদের হয় তা নয়, সব বয়সের মানুষেরই হতে পারে। সাধারণত শিশুদের মাঝে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এতে আক্রান্ত শিশুদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং মৃত্যু ঝুঁকি বেশি হতে দেখা যায়। তারা নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, এনকেফালাইটিস এবং বধিরতার মতো জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। আমাদেরকে বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা দিতে এখন উপায় হিসেবে হামের টিকা দিতে হবে। হামের মতো রুবেলাও একটি ভাইরাসজনিত মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এ রোগটিও হামের মতোই হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে থাকে। এ রোগ এতোটাই মরাত্মক যে, গর্ভবতী মা গর্ভের ৩ মাস সময়ে মা যদি রুবেলায় আক্রান্ত হয় তবে তার গর্ভের সন্তানও এ রোগে আক্রান্ত হবে। এ ক্ষেত্রে গর্ভপাত, গর্ভের শিশুর মৃত্যু হতে পারে অথবা জন্মগত নানা জটিলতা নিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করতে পারে। রুবেলা আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের এমন সন্তান জন্মদানকে কনজেনিটাল রুবেলা সিন্ড্রম বা সিআরএস বলা হয়ে থাকে। রুবেলা নামের এমন মারাত্মক রোগ এবং এর জটিলতা হতে দূরে থাকার একটিই উপায় আর সেটি হচ্ছে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ রুবেলার টিকা দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই রোগের হাত থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’র মাধ্যমে ৯ মাস বয়সি সকল শিশুকে প্রথম ডোজ এমআর টিকা এবং ১৫ মাস বয়সি সকল শিশুদের দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা প্রতিটি ওয়ার্ডে ৮টি নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রদান করে আসছে। এরপরও সরকারের রোগ নিরীক্ষণ তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। যেখানে ২০১৫ সালে হাম রোগে আক্রান্তের হার ছিল প্রতি দশ হাজারে ১.৬ জন। ২০১৭ সালে ২২ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন এবং ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২৫ জন। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চলার পরও আক্রান্তের হার এমন বেড়ে যাওয়া মানেই দেশে বর্তমানে শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এ তথ্য থেকে আরও জানা যায়, হাম-রুবেলায় আক্রান্ত শিশুদের ৮০ ভাগ ১০ বছরের কম বয়সি। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি হাম-রুবেলা থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছরের কম বয়সি সকল শিশুকে এমআর টিকা প্রদান করার জন্য এ ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়েছে। আর এ কারণেই প্রথমবারের মতো ২১ দিন ব্যাপী দেশজুড়ে হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন পরিচালনা করবে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দীর্ঘ ২১ দিনের এই ক্যাম্পেইন ছুটির দিন বাদে ১৮ মার্চ শুরু হয়ে শেষ হবে ৭ এপ্রিল। ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সের নিচের সকল শিশুদের ১ ডোজ এমআর টিকা প্রদান করা হবে। এ ছাড়াও ২ বছর বয়সের নিচের সকল ড্রপ আউট ও লেফট আউট শিশুদের খুঁজে বের করে নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে এমআর টিকার আওতায় আনা হবে এবং এমআর টিকাদান নিশ্চিত করা হবে। ক্যাম্পেইন চলাকালীন সময় রুটিন ইপিআই কার্যক্রম বন্ধ করা হবে না। ২৪ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে কমিউনিটি পর্যায়ে এই ক্যাম্প পরিচালিত হবে। এই নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য সহকারী এবং পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিবার কল্যাণ সহকারী দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতি সপ্তাহে দুই দিন করে মাসে ৮টি ইপিআই কেন্দ্রের মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এরপরও এমআর প্রথম ডোজ টিকার ক্ষেত্রে ৫ ভাগ থেকে ১৫ ভাগ এবং দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে শতকরা ১৫ ভাগ থেকে ২০ ভাগ শিশু ড্রপ আউট থেকে যাচ্ছে। কেবল মাত্র একারণেই ৪ থেকে ৫ বছর এ সময়ে হাম রোগের প্রদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ সব অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা কমাতে প্রতি ৩ বছর অন্তর এ ধরনে দীর্ঘদিনের জন্য ক্যাম্পেইনের কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা অতি প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞজনরা জানিয়েছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, অতীতে এতো দীর্ঘ দিন ধরে ক্যাম্পেইনিং পরিচালনা করা হয়নি। এ ক্যাম্পেইন প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এক নাগারে চলতে থাকবে। তবে স্কুল ক্যাম্পেইন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্কুলের সময়সূচির উপর ভিত্তি করে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
দেশে পোলিও নির্মূল অভিযান সফল হয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশে ইপিআই তথা টিকাদান কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আপাত দৃষ্টিতে সফলতার মুখ দেখলেও এখনো পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছে বলা যাবে না। এ কার্যক্রম জনগণের কাছে প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং এর অগ্রগতি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভালো, যে কারণে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যখাত জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতি ৬ হাজার জনগোষ্ঠির জন্য পরিচালিত হচ্ছে একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক। পোলিও নির্মূলের মতো বিশ্বের সকল দেশ এখন হাম-রুবেলা থেকে তাদের শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি রোধে উদ্যোগ নিচ্ছে। এই রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০৬ সালে ক্যাচ আপ এবং ২০১০ সালে ফলো আপ ক্যাম্পেইন করায় সে সময় হামের প্রকোপ অনেকটাই কমে এসেছিল। হামের টিকার সাথে রুবেলা টিকা সংযোজন করা হয় ২০১২ সালে। হামের টিকার সাথে রুবেলা টিকার সংযোজনে এখন এমআর টিকা দেয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালে হাম রুবেলা দূরীকরণে এমআর ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়েছিল। এই ক্যাম্পেইন পরিচালনার ফলে হাম-রুবেলার প্রদুর্ভাব অনেকটাই কমে এসেছিল। এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত শিশুরা লেখাপড়া করে সেখানেই এই ক্যম্পেইন পরিচালনা করা হবে। যেসব শিশু স্কুলে যায় না তাদের এবং ওই স্কুলে টিকাদানের দিন অনুপস্থিত ছিল এমন শিশুদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেয়া হবে। এ ছাড়াও প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভায় ১টি এবং সিটি করপোরেশন গুলোর প্রতিটি ওয়ার্ডে ১টি করে স্থায়ী টিকদিান কেন্দ্র শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া খোলা থাকবে। দুর্গম এলাকাগুলোতে ক্যাম্পেইন চলাকালে প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি, উপজেলায় ৩টি, পৌরসভায় ২টি এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে অতিরিক্ত টিকাদান কেন্দ্র টিকাদান করবে। এই কর্মসূচিতে দোকান, বাজার, কারখানা, কর্মরত মায়েদের শিশু, বেদে বহরের শিশু, স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে ঘুমায়, জেলখানায় বা হাসপাতালে মায়েদের সাথে থাকে এমন শিশু, পথশিশু, বস্তিতে বসবাস বা পতিতালয়ের শিশুদেরকে এসব অতিরিক্ত টিকাদান কেন্দ্রে এমআর টিকা দেয়া হবে। প্রতিটি টিকাদান কেন্দ্রে ২ জন দক্ষ টিকাদানকারী হিসেবে স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী, পৌর টিকাদানকারী, এনজিও টিকাদানকারী এবং ৩ জন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে স্কুল শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী অথবা পূর্বে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন এমন অভিজ্ঞ সমাজ সেবক স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করবেন।
শহর এলাকাতেও এবং গ্রাম এলাকার মতো করে এই ক্যাম্পেইন চলবে। পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন এলাকা ঘনবসতি রয়েছে এবং স্বাস্থ্য জনবল কম থাকায় বেসরকারি টিকাদানকর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নার্স, প্যারামেডিক্স এবং মেডিকেল কলেজসমূহের শিক্ষনবিশ ডাক্তারদের মহতি এ উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই ক্যাম্পইনের আগে ৯ মাস থেকে ১০ বছরের কম বয়সি সকল শিশুর রেজিসেট্রশন সম্পন্ন করা হয়েছে। নিয়মিত কেন্দ্রের সাব বøক ভিত্তিক শিশুর তালিকা তৈরিতে সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুর টিকাদান সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে টিকাদান কার্ড ব্যাবহার করা হবে। টিকাদান কাজে নিয়োজিত স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীদেরকে রেজিস্ট্রেশনকৃত সকল শিশুকে টিকাদান শেষে টিকাদান কার্ডের ঘর সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে। শিশুর বাবা মাকে টিকাদান কার্ড সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য কর্মীদের অনুরোধ করা হয়েছে। ক্যাম্পেইন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মাঠকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে কিন্ডারগার্টেন, ডে-কেয়ার, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা, উপ- আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অনাথ আশ্রম, এতিমখানা অথবা যেসব প্রতিষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান পরিচালনা করা হয় সেসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নির্ধারিত ফর্মে মাইক্রোপ্ল্যানিং সম্পন্ন করা হয়েছে ইতোমধ্যেই। এই বিশাল কর্মকান্ড সম্পাদনের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠ পর্যায়ে কর্মরত সকল কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীদের দক্ষ করার জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। শিশু রেজিস্ট্রেশন, মাইকিং, পোস্টার, ব্যানারসহ প্রচারণার নানা উপকরন সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা, চিকিৎসা পেশাজীবী, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ, বাজার, হাসপাতাল, সকল গুরুত্বপূর্ণ অফিস এবং জনসমাগমস্থলে প্রচারের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, কিছু কাজ চলছে। এ ছাড়াও মোবাইল মাইকিং এবং স্থানীয় মসজিদ থেকে ওয়াক্ত নামাজের পূর্বে ও পরে এই ক্যাম্পেইন সম্পর্কে প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, এর আগে এমআর অথবা হামের টিকা নিয়েছে অথবা হাম বা রুবেলা রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন শিশুকে উল্লেখিত নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে হলে রেজিস্ট্রেশন এবং হাম রুবেলার টিকা দিতে হবে। এ কথা ভাবলে হবে না যে শিশুটিকে এর আগে টিকা দেয়া হয়েছে তাই আর পুনরায় টিকা দেয়ার প্রয়োজন নেই। শিশুটি ইতোমধ্যেই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল তাই আর টিকা দিতে হবে না, এটাও ঠিক নয়-সে কথা পিতা-মাতা বা শিশুর অভিবাবকদের ভালো করে বুঝিয়ে হাম ও রুবেলা টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। এ জন্যই দেশের জনসমাজকে সচেতন করতে আগে থেকেই মাঠকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। এই ক্যাম্পেইন পরিচালনার মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে যেমন সচেতেনতার সৃষ্টি হবে, তেমনি এ কাজে নিয়োজিত কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের দক্ষতা বাড়বে এবং টিকাদান কার্যক্রম অনেক বেশি জোরদার ও সফলতার মুখ দেখবে, সঙ্গত কারণেই এটা আশা করা যায়।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন