ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

মহাকবি শামসুদ্দিন হাফিজ : জীবন ও কর্ম

আব্দুল কাদের শাহ নেওয়াজ | প্রকাশের সময় : ২৬ জুন, ২০২০, ১২:০১ এএম

যাঁদের কবিতায় মুগ্ধ বিশ্ববাসী
তাঁদের অন্যতম হাফিজ সিরাজী
যে নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা ইতিহাসে
চিরঅমর হয়ে আছে পাঠক হৃদয়ে
বিশ্ববিখ্যাত মরমী কবিদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুদ্দিন হাফিজ। যিনি মহা কবি হাফিজ নামে সুপরিচিত। শামসুদ্দিন
হাফিজ সর্বশ্রেষ্ঠ ফারসী গীতিকাব্য রচয়িতা। যার কবিত্ব ও মহত্বের প্রভাব ফেরদৌসী, মাওলানা রুমী ও সাদীর ন্যায়
ফার্সি ভাষাভাষীদের হৃদয়ে এবং ইরানি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। তাঁর রচিত কবিতাগুচ্ছ দিওয়ান সৃষ্টিতত্ত্ব,
প্রেমতত্ত্ব ও দর্শনের খনিরূপে সমগ্র দুনিয়ায় আলোচিত। মুসলিম রেনেসাঁর জোয়ারের সময় সমুদ্র উত্থিত এই রত্ন বিশ্বকে
প্রকম্পিত করেছেন নতুন চিন্তার বীজ দিয়ে। শুধু মুসলিম বিশ্বে নয় বরং সমগ্র বিশ্বে অবাক করা কাব্য সাহিত্যের
অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে অর্জন করেছেন অসাধারণ জনপ্রিয়তা। আর প্রতিভার বিস্ময় মূর্তিতে আর্বিভূত
হয়েছেন বিশ্ব দরবারে।
নাম ও পরিচিতি: প্রকৃত নাম শামসুদ্দিন। পিতার নাম বাহাউদ্দিন সুলগারী। ছোটবেলায় পবিত্র কুরআন মুখস্ত করায় ইরান বাসীরা তাকে হাফিজ নামে ডাকত। তিনি সিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেছেন তাই ঐ দিকে সম্বোধন করে তাকে সিরাজীও বলা হয়। কেউ কেউ আবার তাকে খাজা হাফিজ নামে ডাকত। তবে তিনি বিশ্ববাসীর নিকট মহাকবি শামসুদ্দিন হাফিজ নামেই সুপরিচিত। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও সূফী সাধক ছিলেন।
নামকরণ: বাহাউদ্দিন সুলগারীর ঘরে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এক নবজাতকের আগমন, মনে হচ্ছে তার ঘরে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উদ্ভাসিত হয়েছে। যার আালোকরশ্মি তামাম পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। সত্যিই নিষ্পাপ শিশুটির চেহারা ছিল সূর্যের আলোর ন্যায় সুউজ্জল। একবার তাকালে চোখ ফিরাতে মন চায় না। জন্মের সময় পিতা-মাতার কাছে নবজাতক সন্তানটি ছিল শামস বা সূর্যের ন্যায় উদ্ভাসিত ও তেজোদীপ্ত। তাই পিতা আদর করে নাম রাখলেন শামসুদ্দিন বা দ্বীনের সূর্য। প্রকৃত পক্ষেই তিনি ছিলেন কবি কুলের মাঝে সূর্যের ন্যায় এক অনুপম আলোকবর্তিকা।
জন্ম ও জন্মস্থান: কবির জন্ম সাল সর্ম্পকে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে একথা বলা যায় যে, তিনি খৃস্টীয় চর্তুদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেছেন। আধুনিক পন্ডিতগণ তাঁর জন্মসন সর্ম্পকে গবেষণা করে বলেছেন, তিনি আনুমানিক ১৩১০-১৩৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এ.জে.আর. বারীসহ অধিকাংশ লেখক হাফিজের জন্মসাল ১৩২৬ বলে উল্লেখ করেন। তিনি পারস্যের (বর্তমান ইরান) রাজধানী সিরাজ নগরীর রুকনাবাদ বা মোসল্লা নামক স্থানে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইরানের নিশাপুর (ওমর খৈয়ামের জন্মভূমি) ছাড়া আর কোনো নগর সিরাজ নগরীর মত বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেনি। ইরানের প্রায় সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবির লীলা-নিকেতন সিরাজ নগরীতেই।
উপাধি: কবি শামসুদ্দিন হাফিজ ছিলেন অনন্য অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। বিশেষ করে কাব্য চর্চায় তাঁর ছিল অনুপম নির্মাণ কৌশল। তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হয়ে বিশ্ববাসী তাকে ‘মহাকবি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মহাকবি হিসেবেই তিনি সমগ্র বিশ্বে পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের প্রতি লক্ষ্য করে ইরানবাসীরা তাঁকে আরো অনেক উপাধিতে ভূষিত করেন। ‘লিসানুল গায়েব বা অজ্ঞাতের বাণী এবং তরজুমানুল আসরার বা রহস্যের মর্মসন্ধানী’ তার প্রসিদ্ধ উপাধি। এছাড়াও ‘মুলুকুল ফুজালা, কাশেফুল হাকায়েক, মাজদুবে সালেক, বুলবুলে সিরাজ, তরজুমানুল লিসান, তরজুমানুল হাকিকেহ, শেকরে লাভ, শেকরে জবান, খাজা সিরাজ, খাজা এরফান, খাজা হাফিজ, ফাখরুল মুতাকাল্লেমিন’ উল্লেখযোগ্য।
শৈশবকাল: শামসুদ্দিন হাফিজ অত্যন্ত অল্প বয়সে পিতৃহারা হন। ফলে তাঁর লালন-পালন ও ভরণ-পোষনের দায়িত্ব তাঁর মাতার উপর অর্পিত হয়। পারিবারিক অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। যে কারণে পাঠশালায় গমনের পরির্বতে পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে তিনি রুটির দোকানে কাজ নেন। দিন-রাত রুটির দোকানে কাজ করে তিনি পরিবারের প্রয়োজন মিটাতেন। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের বাংলার বুলবুল কবি কাজী নজরুলের সাথে একান্ত মিল দেখতে পাই। কবি নজরুলও শিশুকালে ইয়াতিম হন এবং জীবিকার জন্য রুটির দোকানে কাজ করেন।
শিক্ষাজীবন: হাফিজের শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর বাবা বাহাউদ্দিনের কাছে। বাবার মুখে পবিত্র কুরআন শুনে শুনে তা শিখার চেষ্টা করতেন হাফিজ। এরই মাঝে তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। ফলে পারিবারিক প্রয়োজনে রুটির দোকানে কাজ নেন। কাজের পাশাপাশি শিক্ষা গ্রহণের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। হাফিজ যে পথ দিয়ে রুটির দোকানে যেতেন ঐ পথেই ছিল একটি মক্তব। আসা-যাওয়ার পথে তাঁর মনে কুরআন শিখার ইচ্ছা জাগ্রে। তিনি মক্তবে ভর্তি হন এবং কাজের পাশাপপশি লেখা পড়ার কাজও চালিয়ে যেতে থাকেন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সমস্ত কুরআন মুখস্ত করার সৌভাগ্য অর্জন করেন এবং লেখাপড়ায় অশেষ কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন। কুরআনুল কারীম হেফজ করার মাধ্যমেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়।
পবিত্র কুরআনে পান্ডিত্য: কাওয়াম উদ্দিন আব্দুল্লাহর (মৃ. ১৩৭০ খৃ.) তত্ত্বাবধানে থেকে কবি হাফিজ পবিত্র কুরআন হিফজ করেন এবং কুরআনুল কারীমের চৌদ্দ কেরাতের উপর বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি তৎকালীন বিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে ইলমুল কিরাত, তাফসীর শাস্ত্র ও পবিত্র কুরআনে সবিশেষ পান্ডিত্য অর্জন করে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি চৌদ্দটি পদ্ধতিতে পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে পারতেন। তিনি এ সম্বন্ধে বলেছেন- “হে হাফেজানে জাহান ছুবন্দে জাম না কারদ। লতায়েফে হুকমী বা নেকাতে কোরআনী।” অর্থাৎ জগতের মাঝে এমন হাফেজ পাবে নাকো খুঁজে। আমার মত যে কুরআনের তত্তে¡ দর্শন বুঝে।
বিভিন্ন শাস্ত্রে পান্ডিত্য: কবি হাফিজ সমসাময়িক যুগের বিখ্যাত আলেমদের কাছে দীর্ঘদিন থেকে ইসলামের বিভিন্ন দিক ইলমুত তাফসীর, ইলমুল হাদিস, ইলমুল ফিকহ বা ইসলামী আইন শাস্ত্র, ইলমুল কালাম বা ন্যায় শাস্ত্রসহ সাহিত্য ও দর্শনতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। দিন দিন যেমন হাফিজের প্রতিভার বিকাশ হতে লাগল সেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহিত্য ও দর্শনে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করেন। আর মরমী সাহিত্যে তাঁর একাধিপত্য ছিল। এমনকি তিনি জ্যোতিষ বিজ্ঞানের জ্ঞানও আয়ত্ব করেছিলেন। তিনি আব্দুল্লাহ সিরাজী ও কাজী এযদুদ্দিন আব্দুর রহমান ইয়াহ্ইয়ার কাছ থেকে দর্শন ও তাসাউফের জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর কাব্য খ্যাতি যেভাবে দেশ ও দেশের বাহিরে ছড়িয়ে পড়ে তেমনি তাঁর দর্শনতত্তে¡র সুখ্যাতিও ছড়িয়ে পড়ে।
বিবাহ: হাফিজ রুটির দোকানে কর্মরত অবস্থায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে রুটি দিতেন। একদিন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে রুটি দিতে গিয়ে ‘শাখে নাবাত’ নামক এক অপরূপ সুন্দরীকে দেখে কবি তাঁর সৌর্ন্দযে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রেমে পড়েন। তার প্রেম কবির হৃদয় রাজ্যে তুমুল জড় সৃষ্টি করে। এসময় কবি রচনা করেন বহু প্রেমের কবিতা ও গজল। তার প্রেমে কবি লিখেছেন - “তোমার ভালোবাসা আমার মন ও প্রাণের কাষ্ঠফলক থেকে কখনো মুছে যাবার নয়। তোমার প্রেমের মাধুরী আমার স্মৃতি হতে কখনো দূরীভূত হবার নয়। তোমার প্রেম আমার মনে প্রাণে এমনভাবে অধিকার করে বসেছে যে, আমার মাথাও যদি কেটে নেয় তথাপি আমার প্রাণ হতে তোমার ভালোবাসা আলাদা হবে না”।
তাঁর এ প্রেম কাব্য পড়ে শাখে নাবাত নিজেই কবির প্রেমে পড়ে যান। কবি একথা জানতে পেরে তাকে দেখেন এবং পছন্দ করে বিয়ে করেন।
কাব্যর্চচা: হাফিজ শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে কাব্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর কাব্যর্চচা ও কবিত্বের সূচনা হয় ২১ বছর বয়সে। তাঁর কবিতায় রয়েছে জ্ঞানের অতুলনীয় রত্মভান্ডার। বিশ্ব প্রকৃতি ও মানব জীবনের গভীর রহস্য তাঁর কবিতার প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠেছে। তাঁর কবিতা এমন এক উন্নততর ভাব স্রােতে প্রবাহিত যে, সে সবের সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। এমনকি তাঁর সঙ্গে পারস্যেরই অপর মহান প্রতিভা শেখ সাদীরও তুলনা চলে না। হাফিজ কাব্য রচনায় সানাঈ ও মাওলানা রুমীর পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তাঁর কবিতায় রয়েছে সা’দীর মানবতাবাদ, আত্তারের মর্মীবাদ, সানাঈর কাসিদার সামাজিক দিক। (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন