ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯ আশ্বিন ১৪২৭, ০৬ সফর ১৪৪২ হিজরী

ধর্ম দর্শন

করোনায় বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা : উত্তরণে পারিবারিক শিক্ষা

ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ | প্রকাশের সময় : ১৭ জুলাই, ২০২০, ১২:০৪ এএম

কোভিড-১৯ প্যানডেমিক বা করোনা ভাইরাস মহামারি গোটা বিশ্বকে নানান দিক থেকে সমস্যার সম্মুখীন করেছে। তন্মধ্যে বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান। জাতির ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে ধীরে ধীরে। কী করা যায় বা উত্তরণের উপায় কী হতে পারে তা নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের মাঝেও রয়েছে সিদ্ধান্তহীনতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এসবের প্রকৃত ভুক্তভোগী হবে তো আমাদের শিক্ষার্থীরা যারা ভবিষ্যত পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিবে। তাই সমাজের সকল স্তর থেকে এ পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখা খুবই জরুরি। 

“সমস্যা আগে না সমাধান আগে” নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সত্যিকার অর্থে প্রত্যেক সমস্যারই সমাধান নিশ্চয়ই আছে। তাছাড়া আমরা যাকে প্রকৃতি বলি এটি অত্যন্ত রহস্যময়। এসব রহস্যের অন্যতম হলো, আমাদের চলার পথে বাঁধা অতিক্রম করতে যে দিক নির্দেশনা দরকার তা সৃষ্টিকর্তা সূক্ষভাবে প্রত্যক্ষ কিংবা অপ্রতক্ষ্যভাবে দিয়ে দিয়েছেন। আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কারনে কখনও কখনও তা আমরা বুঝে উঠতে পারি না কিংবা একটু দেরিতেই বুঝি। অর্থাৎ সমাধান আছে। বর্তমান বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উত্তোরণে তাই অন্যান্য পদক্ষেপের বাইরে আশু সমাধান হলো প্রায় ভুলে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে আবার জাগিয়ে তোলা। আর তা হলো, “পারিবারিক শিক্ষা”।
বস্তুবাদী জীবন ব্যবস্থায় অভ্যস্থ হওয়া আজকের মানব সভ্যতা প্রাচীন অনেক কিছুই ভুলে গেছে, ভুলে যাচ্ছে এবং যাবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু বিষয় আছে যা মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে অনিবার্য। সেরকমই একটি হলো পারিবারিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সত্যিকার অর্থে আমরা মূল্যায়ণ করতে না পারলেও এটি অতি প্রাচীন যা মানব ইতিহাসের শুরু থেকে প্রচলিত এবং আজো আমাদের সকলের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাবা-মা, অভিভাবকগণ যতই অশিক্ষিত মূর্খ কিংবা অপারগ হোকনা কেন প্রকতার্থে তারাই আমাদের প্রথম শিক্ষক। পৃথিবীতে আসার শুরু থেকেই সে শিক্ষা শুরু হয় প্রত্যেকের জীবনে। সবে ভুমিষ্ট হওয়া শিশুটির প্রতিটি ক্ষণ শিক্ষার মধ্যে কাটে। মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক শিক্ষাবিদগণ মনে করেন, শিশুর মনস্তাত্বিক গঠনের অধিকাংশটাই ঘটে পাঁচ বছরের মধ্যে এবং এই ভিত্তি নিয়েই তার ভবিষ্যত বিল্ডিংটির (জীবনের) সৌন্দর্য বর্ধন করে চলে পরবর্তী সকল উপকরণ নিয়ে। তাই, বিজ্ঞজনদের অভিমত হলো, এই ভিত্তি যত মজবুত হবে তার বিল্ডিংটিও ততটাই টেকসই ও সৌন্দর্য করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ৫তলা বিল্ডিং-এর ফাউন্ডেশন করে যেমন ২৫ তলা বিল্ডিং বানানো সম্ভব নয় তেমনি আমাদের সন্তানদের জীবনেও এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে ঘটে। কিছু ব্যতিক্রম আমরা দেখলেও তার পিছনের রহস্য আমাদের হয়ত অজানা রয়ে যায়। এখানেই সৃষ্টিকর্তা তার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ করেন।
প্রকৃতির এই চিরাচরিত নিয়মটির প্রবর্তক আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তাই আমাদের পিতা-মাতাকে আগে শিক্ষা দান করেছেন তারপর তাদেরকে সন্তান দান করেছেন। (দেখুন: সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৩১) বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমরা আরো যে বিষয়টি জানতে পারি তা হলো শিক্ষার এই ধারা জেনেটিকভাবেই আমরা ধারণ করি। যা আমাদের চাল-চলন ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণও করে। বংশগতভাবে আমরা অনেক কিছুই পাই আবার কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করি। তারও সায়েন্টেফিক ব্যাখ্যা আছে। এখন কথা হলো, যত উপাদানই আমার কাছে গচ্ছিত থাকুক না কেন তার ব্যবহার যদি না জানি বা না করি তাহলে তা মূলহীন হবে এটিওতো স্বাভাবিক। শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমাদের তাই ঘটে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ যেহেতু পারিবারিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছেন তাই অবহেলা অনিচ্ছা স্বত্তে¡ও প্রকৃতিগতভাবে কিছু জিনিস আমরা কখনই ভুলতে পারব না। সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো সন্তানের জন্যে পিতামাতার ভালবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতা ইত্যাদি এবং এসবের ফলে তাদের কল্যাণ কামনায় সচেষ্ট হওয়া।
তাই, একজন বাবা ধুমপায়ী হলেও তার সন্তানকে তা থেকে দূরে রাখে। নিজে মূর্খ হলেও সন্তানটিকে শিক্ষিত সফল হবার স্বপ্নে বিভোর থাকার বাসনাটা প্রকৃতির তালে তালে রয়েও গেছে। মনে রাখা দরকার, সন্তান যত শিক্ষিতই হোক না কেন তার পিতা-মাতার শিক্ষাটাকেই সে বেশি বড় করে দেখে। পিতা-মাতার অভ্যাসগুলো, তাদের আচার-আচরণগুলোকে সে নিজের করে নেয়। শুরুতে নিজের অজান্তে, পরবর্তীতে ভাললাগা বা ভালবাসায় এবং শেষ পর্যন্ত চাইলেও তা আর পূর্ণভাবে ত্যাগ করা সম্ভব হয় না। ফলে, শুরুতেই পিতা-মাতা সচেতন না হলে সন্তানদেরকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।
সন্তানদের ভবিষ্যত গঠনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীলতা আমাদেরকে দায়মুক্তি করেছে বলে ধরে নিলেও প্রকৃতার্থে তা হয়ে উঠে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি সন্তান খুব অল্প সময়ই কাটায়। বাকিটা সে বাসাতে পিতা-মাতা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ব্যয় করে। ফলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পারিবারিক শিক্ষাটা কিন্তু তার উপর বেশি প্রভাব ফেলে। তাই সেদিকটাতেও অভিভাবকদেরকে নজর দেয়া প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিয়েছে। লকডাউনের কবলে সন্তান এবং অভিভাবকদের ঘরবন্ধি জীবনে এমনভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে যা বর্তমান পৃথিবীর জীবিত কেউ ধারণাও করতে পারেনি। এতটা সমসয় সন্তানদের সাথে কাটানোর সুযোগ জীবনে আসবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। পজেটিভ অনেক কিছুই ভাবা যায়। সেসব ছাপিয়ে, সন্তানদের শিক্ষা দেয়ার প্রাচীন এই ব্যবস্থাটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছেন অনেকেই। অর্থাৎ সন্তানদের শিক্ষা ক্ষতিটাকে কাটিয়ে উঠতে পরিবারকে প্রতিষ্ঠান আর সে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা পিতা-মাতা অভিভাবকরা হলেই সমাধানটা সহজ হবে বলে মনে হয়। এটিকে “হোম স্কুলিং”ও বলে উন্নত বিশ্বে। এখানে যে কাজগুলো করা যায়, তন্মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো:
শিক্ষা সিলেবাসগুলো দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করে শেষ করে ফেলা যায়। ২৪ ঘন্টার রুটিন তৈরি করে দিন। সেখানে পড়ালেখার পাশাপাশি কিছু ছোটখাটো কাজকে রাখুন। বিনোদনের জন্যেও সময় নির্ধারণ করে দিন। শিক্ষকের ভ‚মিকা অভিভাকরা পালন করুন।
যেসব অভিভাবক সন্তানদের শিক্ষার এই ক্ষেত্রে সাহায্য করতে অক্ষম তারও সন্তানদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে পড়ার টেবিলে বসার ব্যবস্থাটুকু অবশ্যই করতে পারবেন। সেখানে অভিভাবকগণ মোবাইল বা অন্যকোন উপায়ে শিক্ষকদের সাথে কথা বলে যতটুকু পারা যায় সন্তানদেরকে শিক্ষার সাথে, শিক্ষা পরিবেশে রাখতে পারেন। অহেতুক সময় নষ্ট যেন না করে তার প্রতি লক্ষ্য রাখুন। স্মার্ট ডিভাইসে যেন সারাক্ষণ ব্যয় না করে তা নিশ্চিত করুন।
পারিবারিক কাজে তাদের সহযোগিতা নিন। ৩/৪ বছরের সন্তানটিও কিন্তু আপনার আমার অনেক সহযোগিতা করতে পারে। আমার ৪ বছরের ছেলেটি কিন্তু দারুন কাজ করে। সে তার নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে, পড়ার টেবিল পরিস্কার করে, গাছে পানি দেয় আমার এটা সেটা সহযোগিতা করে। সে এগুলো করে অনেক আনন্দও পায়। বিষয়টি এমন নয় যে, তার কষ্ট হচ্ছে বরং তার মধ্যে একটা কনফিডেন্স তৈরি হচ্ছে। কারণ, সে এখন এই কাজগুলো নিজেই করতে পারে। তাছাড়া, তার নিজের কাজগুলো নিজে করার কারণে এগুলো সে নষ্ট হতেও দেয়না। অথচ এই নষ্ট হবার কাজগুলো অনেক সন্তানেরা করে আর অভিভাবকদেরকে গুছিয়ে রাখতে হয়।
তাছাড়া, প্রকৃত মানুষ হবার স্বপ্ন অভিভাবকরাই বুনে দিতে পারে। সময় নিয়ে তাদের সাথে গল্প করুন; বিশেষ করে, ঘুমোনোর সময়। নবি-রাসূল, মনীষী, মোরাল স্টোরি ইত্যাদি তাদেরকে শোনান। তারাও সেরকম জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে, ইনশাআল্লাহ।
সন্তানদের জন্যে দু‘আ করতে ভ‚লবেন না। আল্লাহ শিখিয়ে দিচ্ছেন বলুন, “হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী এবং সন্তান দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।” (আল-কুরআন, সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭৪)
সবশেষ, সন্তান কিন্তু আপনার-আমার। রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠান কী করবে তার জন্যে বসে না থেকে নিজেরা কী করতে পারি তা নিয়ে কেন ভাবিনা? কেন দেরী করি? অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বসে থাকলে কি আমার সন্তানের কোন উপকারে আসবে? তার চেয়ে বরং আমাদের যতটুকু সামার্থ আছে তাই পুঁজি করে সন্তানদের মঙ্গলের জন্যে চেষ্টা করা কি উচিৎ নয়?
সৃষ্টিকর্তাকর্তৃক প্রবর্তিত প্রাচীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ভবিষ্যত কল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়ক হোক, এই প্রত্যাশায়।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন